মানবসম্পদ
উচ্চশিক্ষায় শিল্প-একাডেমিয়া সংযোগ
মো. কামাল উদ্দিন
প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৪০
| প্রিন্ট সংস্করণ
শিল্প-একাডেমিয়া সংযোগ বলতে বোঝায় প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধান, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং শিল্প বা বাণিজ্যিক প্রয়োগের জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তরের উদ্দেশ্যে শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং উচ্চশিক্ষা বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে জ্ঞান, জনবল ও প্রযুক্তির বিনিময়। একাডেমিয়াকে দেখা হয় জ্ঞান ও উদ্ভাবনের উৎস হিসেবে; শিল্পকে দেখা হয় সেই জ্ঞানকে বাজারজাত পণ্য, প্রক্রিয়া বা সেবায় রূপান্তরের মাধ্যম হিসেবে। শিল্প-একাডেমিয়া লিংকেজ তৈরির ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প ও সরকারকে তিনটি পরস্পর সংযুক্ত বৃত্ত হিসেবে দেখতে হবে। উদ্ভাবন সৃষ্টিতে একে অপরের ভূমিকা অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় বাণিজ্যিকীকরণে যুক্ত হয়; শিল্প প্রশিক্ষণ দেয়; সরকার নীতিনির্ধারণ ও অর্থ জোগানের ভূমিকা নেয়। শিল্প-একাডেমিয়া লিংকেজ তৈরিতে তিনটি ক্ষেত্রকে প্রাধান্য দিতে হবে। যেমন জ্ঞান, উদ্ভাবন ও ঐকমত্য। যেখানে গবেষণা ও গবেষণাবহির্ভূত উভয় পক্ষই প্রযুক্তি হস্তান্তর, যৌথ নেতৃত্ব ও নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে পারস্পরিক যোগাযোগ করতে পারবে। অর্থাৎ এটি কোনো একক কর্মকাণ্ড নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেওয়া একটি সম্পর্ক।
শিল্প-একাডেমিয়া সংযোগের ধরন বিভিন্ন রকম হতে পারে। যেমন অনানুষ্ঠানিক পরামর্শ, প্রকাশনার মাধ্যমে জ্ঞান বিনিময়, যৌথ গবেষণা চুক্তি, লাইসেন্সিং, পরামর্শ, সম্মেলন, ইন্টার্নশিপ, কর্মী বিনিময়, ল্যাব ব্যবহার, প্রযুক্তি হস্তান্তর, যৌথ পাঠ্যক্রম, চুক্তিভিত্তিক গবেষণা, পেটেন্ট, উদ্ভাবন ও বিজ্ঞান পার্ক। সুতরাং শিল্প-একাডেমিয়া সংযোগ শুধু গবেষণা চুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর মধ্যে রয়েছে পাঠ্যক্রম প্রণয়ন, সমবায়ভিত্তিক শিক্ষা ও ইন্টার্নশিপ, দুই খাতের মধ্যে কর্মী বিনিময়, যৌথ প্রশিক্ষণ বা ডিগ্রি কর্মসূচি, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও লাইসেন্সিং, বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ইনকিউবেটর ও বিজ্ঞান পার্ক এবং পরামর্শক সেবা। তবে দুই পক্ষের আগ্রহের পার্থক্য থাকতে পারে। যেমন বিশ্ববিদ্যালয় খুঁজে গবেষণা তহবিল, শিল্প-সুবিধা ও শিক্ষার্থীদের ভালো কর্মসংস্থান, আর শিল্প খুঁজে বিশেষায়িত দক্ষতা, সাশ্রয়ী গবেষণা এবং প্রশিক্ষিত জনবল। এ দুই লক্ষ্যের মধ্যে সমন্বয় সাধন করাই বাংলাদেশের জন্য মৌলিক চ্যালেঞ্জ। এ সমন্বয় সাধন করার জন্য শিক্ষা ও শিল্প মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারকে একাডেমিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য তৈরিতে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, হংকং, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে শিল্প-একাডেমিয়া সংযোগ প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার, শক্তিশালী আঞ্চলিক উদ্ভাবন-ব্যবস্থা এবং স্নাতকদের উন্নত কর্মসংস্থানের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে যুক্ত থেকে সুফল পেয়েছে। এ ছাড়াও সিলিকন ভ্যালি থেকে শুরু করে সুইডেন, ইথিওপিয়া ও ব্রাজিল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প-সরকারের মিথস্ক্রিয়া আঞ্চলিক পুনরুজ্জীবন কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এতে প্রতিষ্ঠানগুলো পায় অত্যাধুনিক গবেষণাগার ও বিশেষায়িত জ্ঞান ব্যবহারের সুযোগ। আর বিশ্ববিদ্যালয় পায় গবেষণা তহবিল, বাস্তব সমস্যা নিয়ে কাজ করার সুযোগ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ভালো কর্মসংস্থান। এসব দেশে সরকারি নীতিও কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণায় বিনিয়োগকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য করছাড়, প্রতিযোগিতামূলক উদ্ভাবন অনুদান এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর-সংক্রান্ত নির্দিষ্ট নিয়মকানুন যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ায় শিল্প-একাডেমিয়া সংযোগের ক্ষেত্রে সহযোগিতার সংখ্যা ও উৎপাদন মান বাড়িয়েছে।
বাংলাদেশে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর শিক্ষা দর্শনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন শিল্প-একাডেমিয়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপনে। এ নিয়ে সরকার কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্যই তৈরি হচ্ছে। কারণ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে শিল্প-একাডেমিয়া সংযোগের এজেন্ডাকে দেখতে হবে দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন প্রেক্ষাপটে। যেখানে বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী, তরুণ জনসংখ্যার আধিক্য এবং তৈরি পোশাক রপ্তানি খাতের ওপর উচ্চ নির্ভরতা; পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সেবা খাত। এখানে উল্লেখ্য, দারিদ্র্য হ্রাস ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বাংলাদেশের অগ্রগতি সত্ত্বেও নিম্নমানের শিক্ষা এবং শ্রমশক্তির দক্ষতার ঘাটতি এখনও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের পথে বড় বাধা। এই বাধা দূর করতে পারে ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপন।
গত ১২ জুন বাংলাদেশের আটটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ আমরা মোট ১৬ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি অস্ট্রেলিয়া অ্যাওয়ার্ড-এর আওতায় অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষা প্রশিক্ষণের ১৫ দিনের জন্য সেখানে অবস্থান করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম সরাসরি পর্যবেক্ষণ করি। তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম ডেভেলপমেন্টে শিল্পের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পের চাহিদার আলোকে কারিকুলাম তৈরি করা হয়। শিক্ষার্থীদের অ্যাসেসমেন্টের ৪০ শতাংশ থাকে ব্যবহারিক, যা শিল্প ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সরাসরি সংযোগের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। শিক্ষার্থীরা তাদের কোর্সের অংশ হিসেবে ব্যবহারিক কাজের মাধ্যমে শিল্পে ভূমিকা রাখে। এভাবেই শিক্ষার্থীদের বাস্তব জ্ঞানের আলোকে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে তৈরি করা হয়।
সংযোগের অভাবে শিক্ষার মান ও শ্রমবাজারে স্পষ্ট প্রভাব লক্ষণীয়। বাংলাদেশে উন্নত প্রযুক্তি ও ডিজিটাল দক্ষতায় উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে স্নাতকদের টেকসই কর্মসংস্থানের জন্য নির্দিষ্ট দক্ষতা-উন্নয়ন কর্মসূচি, শিল্প-একাডেমিক সংযোগ এবং কাঠামোগত পুনঃদক্ষতায়ন প্রয়োজন।
ড. মো. কামাল উদ্দিন: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ ও সাবেক উপ-উপাচার্য
(প্রশাসন), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- মানবসম্পদ