ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

উন্নয়ন

‘এ খাঁচা ভাঙবো আমি কেমন করে’

‘এ খাঁচা ভাঙবো আমি কেমন করে’
×

মামুন রশীদ

মামুন রশীদ

প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৪৩ | আপডেট: ০৬ আগস্ট ২০২৬ | ১১:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ খুব কম। গত কয়েক দশকে আমরা অর্থনীতি, অবকাঠামো, প্রযুক্তি এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখেছি। একটি সময় যে বাংলাদেশকে সম্ভাবনার দেশ হিসেবে দেখা হতো, আজ সেই বাংলাদেশ বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। এই অগ্রগতি আমাদের জন্য গর্বের বিষয়। একই সঙ্গে একটি প্রশ্ন বারবার আসে– আমরা কি শুধু উন্নয়নের সংখ্যাগুলো বাড়াচ্ছি; নাকি এমন একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রও তৈরি করছি, যেখানে প্রতিষ্ঠান, ন্যায় ও জবাবদিহি সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে?

উন্নয়নের অর্থ শুধু বড় প্রকল্প, জিডিপি প্রবৃদ্ধি কিংবা দৃশ্যমান পরিবর্তন নয়। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সফল হয়, যখন একজন সাধারণ নাগরিক রাষ্ট্রের ওপর আস্থা রাখতে পারেন। যখন একজন উদ্যোক্তা নিয়ম মেনে ব্যবসা করতে পারেন। যখন একজন তরুণ যোগ্যতার ভিত্তিতে নিজের ভবিষ্যৎ তৈরি করতে পারেন এবং যখন একজন মানুষ বিশ্বাস করেন, আইন সবার জন্য সমান।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, আমরা অনেক সময় সমস্যাগুলো বুঝি, আলোচনা করি, কিন্তু পরিবর্তনের জায়গায় গিয়ে থেমে যাই। কারণ ব্যক্তি, সম্পর্ক, গোষ্ঠী এবং স্বার্থের বিভিন্ন স্তর আমাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। আমরা অনেক সময় জাতীয় স্বার্থের চেয়ে তাৎক্ষণিক সুবিধাকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেলি। এভাবেই একটি অদৃশ্য খাঁচা তৈরি হয়, যেখানে আমরা নিজেরাই আটকে যাই।

রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে তার প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর। সংসদ, সরকার, বিচার বিভাগ, সংবাদমাধ্যম এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান যত বেশি কার্যকর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হবে, রাষ্ট্র তত বেশি শক্তিশালী হবে। কিন্তু যখন ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানকে ছাড়িয়ে যায়, যখন নিয়মের চেয়ে পরিচিতি ও প্রভাব বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে, তখন উন্নয়নের ভিত দুর্বল হতে শুরু করে।

আমরা বিভিন্ন খাতে একই ধরনের বাস্তবতা দেখতে পাই। গণপরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, প্রশাসনিক সেবা, বন্দর ব্যবস্থাপনা কিংবা ব্যবসার পরিবেশ– সব ক্ষেত্রেই উন্নতির সুযোগ রয়েছে। সমস্যা অজানা নয়। বরং সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আমরা কি সমস্যার মূল জায়গায় গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান করতে পারছি?

একটি দেশের সবচেয়ে বড় বাধা তখনই তৈরি হয়, যখন ছোট ছোট স্বার্থ বড় জাতীয় স্বার্থকে বাধাগ্রস্ত করে। কোনো খাতের পরিবর্তন যদি কিছু মানুষের সুবিধার সঙ্গে সংঘর্ষ তৈরি করে, তখন সংস্কার কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু একটি উন্নত রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হলে আমাদের অবশ্যই স্বল্পমেয়াদি সুবিধার বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে গুরুত্ব দিতে হবে।

তরুণ প্রজন্ম বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা। তারা পরিবর্তন চায়, নতুন কিছু তৈরি করতে চায় এবং বিশ্বমানের প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চায়। কিন্তু তাদের জন্য এমন একটি পরিবেশ প্রয়োজন, যেখানে যোগ্যতা, দক্ষতা, উদ্ভাবন ও সততার মূল্য থাকবে। যদি একজন তরুণ মনে করেন, এগিয়ে যাওয়ার জন্য দক্ষতার চেয়ে অন্য কোনো বিষয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তাহলে তার আস্থা কমে যাবে।

ব্যবসার ক্ষেত্রে একই বিষয় প্রযোজ্য। একজন উদ্যোক্তার সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত তার চিন্তা, উদ্ভাবন, দক্ষতা ও পরিশ্রম। একটি সুস্থ অর্থনীতিতে সফলতা নির্ভর করবে প্রতিযোগিতা ও সক্ষমতার ওপর; প্রভাব বা পরিচিতির ওপর নয়। উদ্যোক্তাদের জন্য এমন পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন, যেখানে তারা নিশ্চিন্তে বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারেন।

একইভাবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন ছাড়া কোনো অর্থনৈতিক অগ্রগতি স্থায়ী হতে পারে না। একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার মানুষ। তাই আমাদের দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি; গবেষণাকে উৎসাহিত এবং পেশাগত উৎকর্ষকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করতে হবে।

আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এ দেশের মানুষ। আমাদের মানুষের পরিশ্রম, সৃজনশীলতা ও অভিযোজন ক্ষমতা অসাধারণ। এখন প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে এসব সম্ভাবনা পূর্ণভাবে বিকশিত হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু উন্নয়নের নয়; উন্নয়নের মানের। আমরা কি এমন একটি বাংলাদেশ রেখে যেতে চাই, যেখানে উন্নয়ন থাকবে কিন্তু আস্থা দুর্বল থাকবে? নাকি এমন একটি বাংলাদেশ তৈরি করতে চাই, যেখানে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, দায়িত্বশীল নেতৃত্ব এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সবচেয়ে বড় সম্পদ হবে?

খাঁচা ভাঙার শুরু হবে আমাদের চিন্তা ও দায়িত্ববোধের পরিবর্তন থেকে। যখন ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান বড় হবে; যখন সুবিধার চেয়ে দায়িত্ব এবং স্বল্পমেয়াদি লাভের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া হবে, তখনই আমরা সত্যিকার অর্থে একটি শক্তিশালী বাংলাদেশ গড়ে তোলার পথে এগিয়ে যেতে পারব।

মামুন রশীদ: অর্থনীতি বিশ্লেষক 
 

আরও পড়ুন

×