ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

যে সমাজে ছাত্রছাত্রী কথা বলাও অপরাধ

যে সমাজে ছাত্রছাত্রী কথা বলাও অপরাধ
×

কাওসার চৌধুরী

কাওসার চৌধুরী

প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৪৫ | আপডেট: ০৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৪৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

ছেলেমেয়ে একসঙ্গে কথা বলার ‘অপরাধে’ গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার এক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে গাছের সঙ্গে বেঁধে এক কলেজছাত্র ও স্কুলছাত্রীকে নির্যাতন করা হয়েছে; গত ২৮ জুলাই, মঙ্গলবার দুপুরে। এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে অপমান-ক্ষোভে ওই ছাত্রী বিষপানে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। অভিযোগ উঠেছে, হাতিয়াড়া ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক নয়ন গোলদারের নির্দেশে ভ্যানচালক অনিক মণ্ডল, বখাটে সনাতন বিশ্বাসসহ কয়েক যুবক ঘটনাটি ঘটিয়েছেন।

অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করে নয়ন গোলদার বলেন, ‘ওই ছাত্রী ও তরুণকে আপত্তিকর অবস্থায় পেয়ে এলাকার যুবকরা আমার বাড়ির ওপর দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। আমি তাদের দুজনকে স্কুলে নিয়ে অভিভাবকের হাতে তুলে দিই। নির্যাতনের বিষয়টি আমার জানা নেই’ (সমকাল, ২ আগস্ট ২০২৬)।

অথচ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, গত মঙ্গলবার দুপুরে বিদ্যালয়ের অদূরে একটি সেতুর ওপরে ওই ছাত্রী এবং কলেজছাত্র কথা বলছিল। ভ্যানচালক অনিক মণ্ডল এ দৃশ্য দেখেন। পরে তিনি বিষয়টি নয়ন গোলদার ও অন্যদের জানান। এর কিছুক্ষণ পর বখাটে সনাতনসহ কয়েকজন গিয়ে দুই শিক্ষার্থীকে ধরে নয়ন গোলদারের বাড়িতে নিয়ে আসেন। পরে তাদের বিদ্যালয়ে নেওয়া হয়। সেখানে গাছের সঙ্গে দুজনকে বেঁধে রাখা হয়। এ সময় শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয় মানুষের ভিড় জমে। দুজনকে চড়-থাপ্পড় দেওয়া হয় (সমকাল, ২ আগস্ট ২০২৬)।
যা হোক, সামাজিক মাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে প্রতিবাদের কারণে শেষ পর্যন্ত পুলিশ সক্রিয় হয় এবং প্রধান অভিযুক্ত নয়ন গোলদারকে রোববার ভোরে আটক করে। ওই দিন রাতেই নির্যাতনের শিকার তরুণের বাবা বাদী হয়ে কাশিয়ানী থানায় মামলা করেছেন। এতে আটক বিএনপির নেতাসহ ১৪ জনকে আসামি করা হয়েছে (বিডিনিউজ, ৩ আগস্ট ২০২৫)।
কথা হলো, প্রকাশ্য দিবালোকে সেতুর ওপরে দুজন শিক্ষার্থীর কথা বলা আমাদের সমাজে এখন অপরাধ! সমাজের ‘ফেরেশতাসম’ মানুষেরা সে জন্য তাদের ধরে নিয়ে নির্যাতন করেন। অথচ প্রায় প্রতিদিন কোথাও না কোথাও বলাৎকার, শিশু নির্যাতন, দলবদ্ধ ধর্ষণ সমাজের নজরে পড়ে না!

২ আগস্টের সমকালে এই শিক্ষার্থী নির্যাতনের খবরের পাশাপাশি‌ আরেকটি খবর আছে– ‘রাজশাহীতে শিশুকে যৌন হেনস্তা, জামায়াত নেতা গ্রেপ্তার’। রাজশাহীতে ৯ বছর বয়সী শিশুকে যৌন হেনস্তার অভিযোগে পবা উপজেলার বড়গাছী ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের রোকন এবং গ্রাম্য চিকিৎসককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর বড় ভাই একই ওয়ার্ডের জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। এ ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে পবা থানায় একটি মামলাও হয়েছে।   

পাশবিক এসব ঘটনা যে শুধু উল্লিখিত দুটি রাজনৈতিক দলের সদস্য কিংবা নেতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ; তা কিন্তু নয়। এই পাশবিকতা ছড়িয়ে পড়েছে গোটা সমাজে। কমবেশি সারাবছর এসব কদর্য ঘটনা ঘটতে থাকে। ঘটনার পর ‘সালিশ’ হয়। সালিশে কোনো না কোনোভাবে ধর্ষক ও নির্যাতনকারীরা পার পেয়ে যায়। এমনকি আদালত থেকেও আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে অপরাধীরা নিষ্কৃতি পেয়ে সমাজে এসে পুনরায় একই ধরনের অপরাধ সংঘটিত করে। সমাজ এবং আইন তাদের আইনকানুনের জটিলতার কাহিনি শোনায়, আর ভিকটিমরা তারই অভিশাপে হয় চুপ মেরে যান নতুবা আত্মহত্যার মতো অগ্রহণযোগ্য পথ বেছে নেন।

কাশিয়ানীতে যে মেয়েটি অপমান সহ্য করতে না পেরে বিষপান করেছিল মরে যাওয়ার জন্য, তার কি আসলেই অন্য কোনো পথ খোলা ছিল? আমি মোটেও আত্মহত্যার মতো অগ্রহণযোগ্য বিষয়কে উৎসাহিত করছি না। কিন্তু ঘটনার বাস্তবতা কী বলে? 
আমি জানি না, ওই এলাকার ছাত্রীটির পরিবারের সামাজিক অবস্থান কোন স্তরে। খুব শক্তিশালী অবস্থান হলে তো মেয়েটির পরিবারের সঙ্গে গোলদার চক্রের বড় রকমের সাংঘর্ষিক অবস্থা তৈরি হতো। কিন্তু সেই শক্তি মেয়েটির পরিবারের নেই বলেই হয়তো সব অপমান মাথায় নিয়ে অবশেষে মেয়েটি বিষপান করেছিল মৃত্যুকেই মুক্তি মনে করে। আমাদের এই জনপদে এটাই ঘটে থাকে। কারণ বিচার তো শক্তিমানদের জন্য; অসহায়দের জন্য নয়। 

এ ধরনের ঘটনা ঘটলে সব দোষ ওই নারীর ওপরে গিয়েই বর্তায় বিনা ওজরে। আর সমাজপতিদের প্রায় শতভাগই পুরুষ এবং সামাজিকভাবে খুব শক্তিশালী। ফলে পুরুষ শাসিত সমাজে কোনো অপরাধ না করেও ‘গলায় দড়ি’ দিতে হয় কিন্তু নারীকেই। অপরাধী পুরুষরা দিব্যি গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায়। গোলদার চক্রের ক্ষেত্রেও এর কোনো ব্যত্যয় ঘটবে না বলে অনুমান করি।    
নয়ন গোলদারের মতো নেতারা ব্যস্ত আছেন কিশোর-কিশোরী কিংবা তরুণ-তরুণীদের ‘কথা বলা’র অপরাধে শাস্তি প্রদান নিয়ে। অথচ খোঁজ রাখেন না দেশের আর্থসামাজিক দুরবস্থার দিকে। দিন দিন হু-হু করে বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। নিম্নবিত্ত তো দূরের কথা, মধ্যবিত্তদের নাগালের অনেক বাইরে চলে গেছে এসব পণ্যের দাম।
গত রোববার ধানমন্ডির একটি বাজার থেকে কাঁচামরিচ কিনেছি ৩৭০ টাকা কেজি দরে। বাকি পণ্যের উচ্চমূল্যের কথা না-ই বা বললাম। আর পণ্য কিনেই বা কী হবে! চুলাই তো জ্বলে না আজ অনেক দিন। চুলায় গ্যাস নেই সারাদেশে। সমকাল পত্রিকায় দেখলাম ‘নদীর তলদেশে পাইপ কেটে গ্যাস চুরির চেষ্টা’ নিয়ে একটি খবর। আগে শুনতাম সিন্দুক চুরির কথা। পরে শুনেছি, পুকুরচুরিও হয়। এখন দেখছি নদীর তলদেশ পর্যন্ত চুরিচামারি থেকে রক্ষা পাচ্ছে না।   

পরিশেষে একটিই আবেদন, কিশোর-কিশোরী কিংবা তরুণ-তরুণীদের স্বাভাবিক আচরণ, মেলামেশা উদার এবং স্বাভাবিক দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করুন। তাদের সহযোগিতা করুন পড়াশোনার পাশাপাশি উন্নত এবং অগ্রসর জীবনের পথে এগিয়ে যেতে। নইলে যেভাবে বলাৎকার, ধর্ষণ এবং অনাচার চলছে সমাজের বিভিন্ন স্তরে; তার কুফল থেকে সমাজ কিংবা রাষ্ট্র রেহাই পাবে না। রেহাই পাব না আপনি-আমি কেউই। অতএব আসুন, সময় কিছুটা হলেও অবশিষ্ট থাকতে সাবধান হই। নইলে আম-ছালা দুটোই যাবে।
 
কাওসার চৌধুরী: প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও অভিনেতা

আরও পড়ুন

×