ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নৃ-মুখ

বিশ্ববিদ্যালয়ে তালিকার রাজনীতি চলতেই থাকবে?

বিশ্ববিদ্যালয়ে তালিকার রাজনীতি চলতেই থাকবে?
×

জোবাইদা নাসরীন

জোবাইদা নাসরীন

প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৫৫ | আপডেট: ০৭ আগস্ট ২০২৬ | ১৩:১৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

নানা ধরনের তালিকার খেলা চলছে দেশে। তবে রাজনীতিতে তালিকাকরণ এবং সেটির নানাবিধ প্রয়োগ বরাবরই ছিল এখানে। সব সরকারই এ অস্ত্র কমবেশি ব্যবহার করেছে। ভিন্নমত বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সমর্থকদের তালিকা তৈরি করে চাকরিচ্যুতি এবং বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর রীতি আগেও ছিল, এখনও আছে। সবচেয়ে পরিচিত চর্চা ছিল ওএসডি বা দায়িত্বশূন্য করা অথবা অপেক্ষাকৃত কম সুবিধাজনক স্থানে বদলি করা। তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সীমিত ছিল আমলাদের মধ্যে। 

দেশে বড় কোনো আন্দোলন এবং প্রতিবাদ হলেও রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো নানা কাঠামোতে বিভিন্ন তালিকা তৈরি করে। চব্বিশের অভ্যুত্থানের সময় এ রকম তৈরি করা তালিকা ধরেই মধ্যরাতে বিভিন্ন বাড়ি গিয়ে আন্দোলনকারী অনেককেই ধরপাকড় করেছে পুলিশ। যার কারণে পরে অনেক বাবা-মা সন্তানের সঙ্গে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। ‘পুলিশের তালিকায় নাম উঠলে বিপদ বেশি’, তাই সন্তানকে আগলে রাখার জন্য তারা বেরিয়ে এসেছিলেন। 

গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ওই অসুস্থ ধারার অবসান ঘটার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হয়নি। একদিকে কে কোন ক্ষমতার জায়গায় বসবে সেসব তালিকা সামাজিক মাধ্যমে ঘুরতে থাকে, অন্যদিকে তালিকা করে চলতে থাকে মবের ধাওয়া। এর পাশাপাশি চলে তালিকা পেশ করে অভিযোগনামা। কে, কোন তালিকা তৈরি করছে, কী উদ্দেশ্যে করছে, কেন সেই তালিকা বা অভিযোগ গ্রহণ করতে হবে, সেই বিষয়ে কোনো ধরনের যৌক্তিক পরিসরকে গুরুত্ব খুব একটা দেওয়া হয়নি। অবস্থা এমন হয়েছে, একেকটি হত্যাচেষ্টা মামলার আসামির তালিকায় ২০০-৩০০ জন। অভিযোগকারী সেই তালিকার বেশির ভাগকেই চেনেন না। তারপরের বিষয়গুলো আরও জটিল। সেই হত্যাচেষ্টা এবং হত্যা মামলার অভিযোগের তালিকা থেকে নাম কাটাতে চলে টাকার খেলা। 

দুঃখজনক, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও এ তালিকা ব্যবসা থেকে মুক্ত নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বহু শিক্ষককে আগের সরকারের দোসর আখ্যা দিয়ে তাদের ওপর মব সন্ত্রাস চালানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে তালিকা দিয়ে বলা হয়েছে– অমুক-তমুক শিক্ষক ক্যাম্পাসে ঢুকতে পারবেন না; তাদের বহিষ্কার করতে হবে। সেই ধারা এখনও বন্ধ হয়নি। হালে দেখা যায়, দু-চারজন কোনো অভিযোগ নিয়ে গেলেই তৈরি হয়ে যাচ্ছে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি।  

সর্বশেষ ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল চিহ্নিত শিক্ষক দাবি তুলেছেন– শিক্ষকদের আরেকটি বড় গ্রুপকে নিষিদ্ধ করতে হবে। তারা ২৩১ শিক্ষকের এক তালিকা করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বলেছেন, ‘জুলাই চেতনাবিরোধী’ কর্মকাণ্ডের জন্য তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এর সূত্র ধরে ঢাবি সিন্ডিকেট গঠন করেছে নতুন কমিটি। তালিকা ছোট করে এখন ১২৫-এ আনা হয়েছে। তালিকায় কেন ২৩১ জন; আবার কোন জাদুবলে তা ১২৫-এ নেমে এলো– এ প্রশ্ন উঠেছে। 

সিন্ডিকেট কয়েকজন শিক্ষককে অস্থায়ীভাবে বহিষ্কার এবং অব্যাহতিও দিয়েছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাদেকা হালিমসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষককে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া চার শিক্ষককে একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। 
বলার অপেক্ষা রাখে না, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভয়ের আবহাওয়া বিরাজ করছে। বের হচ্ছে নানা তালিকা। নজর রাখা হচ্ছে কার নাম কোন তালিকায় যাচ্ছে। তালিকা থেকে নাম কাটানোর জন্য অনেকেই ধরনা দিচ্ছেন এর-ওর কাছে। ক্ষমতাচর্চার যে বিশাল সুযোগ, কে হাতছাড়া করতে চায়! প্রতিবাদের স্বরও মৃদু, পাছে আবার রোষানলে পড়ে যান– কোন তালিকায় নাম উঠে যায়!  
পান থেকে চুন খসলেই বিশ্ববিদ্যালয়ে দাপট দেখানো একটি গ্রুপ বিচার চায়, অব্যাহতি চায় শিক্ষকদের। সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক কাবেরী গায়েনের জিজ্ঞাসাকেন্দ্রিক একটি সামাজিক মাধ্যমের পোস্টকে কেন্দ্র করে দাঁড়িয়ে যান কয়েকজন। বিশ্ববিদ্যালয়ও সঙ্গে সঙ্গে আমলে নেয়। চলছে নানা ধরনের রাজনৈতিক ক্যারিকেচার। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, তালিকা নিয়ে বসে আছে একটি অংশ। কখনও সেটি শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিচ্ছে, কখনও ক্ষমতাসীন দলের শিক্ষকরা সেটি নিজেদের মতো রদবদল করছেন। 

১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী চলা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকরা রাজনৈতিক মতাদর্শ ধারণ করে রাজনীতি করতে পারবেন। সেভাবে তারা রাজনীতি করেও আসছেন। তবে এটি সত্য; সেই রাজনীতি অনেকটাই ক্ষমতার পিঠ চুলকানিতেই পরিণত হয়েছে এবং এখনও এটি তা-ই। তাই নিজের দল ছাড়া অন্য দলকে ক্যাম্পাসছাড়া করতে কিংবা দমাতে তারা এ ধরনের তালিকাকরণের রাজনীতিকে বেছে নিয়েছেন, যা একেবারেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা ও মতপ্রকাশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কিন্তু কেউ এগুলো আমলে নিচ্ছেন না। অবস্থা এমন, এগুলো যত বেশি করে চর্চা করা হচ্ছে ততই যেন সবাই ক্ষমতার গদিটি পাকাপোক্ত মনে করছেন। 

তালিকাকরণের রাজনীতির প্রভাব খুব ভয়াবহ। এসব তালিকা সামাজিক মাধ্যমে ঘুরে বেড়ায়। আবার সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় থাকা বিভিন্ন গ্রুপ সেগুলোকে শেয়ার দিয়ে আরও বেশি আক্রমণাত্মক বাক্য এবং দাবি যোগ করে। তখন তালিকায় নাম থাকা ব্যক্তিদের জীবন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায় এবং আসে নানা ধরনের হুমকি। মনে রাখা প্রয়োজন, এক দল তালিকা নিয়ে ঘুরছে মানেই এই নয় যে, তারা নিরাপদে থাকবেন। ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। তবে ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় এটি কেউ বুঝতে পারেন না কিংবা চান না। বিষয়টা ইতিহাসের সেই শিক্ষার মতো– ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না।

জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×