অন্যদৃষ্টি
প্রবীণের নেশা কিংবা আসক্তি
হাসান আলী
প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৩৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রবীণরা নানা ধরনের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যান। অবসর গ্রহণ, জীবনসঙ্গীর মৃত্যু, সন্তানের দূরে চলে যাওয়া, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, দীর্ঘস্থায়ী রোগব্যাধি এবং একাকিত্ব অনেকের জীবনকে কঠিন করে তোলে। এসব পরিস্থিতি থেকে সাময়িক স্বস্তি পেতে কেউ কেউ ঘুমের ওষুধ, ব্যথানাশক ওষুধ বা উদ্বেগ কমানোর ওষুধের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। আবার কেউ কেউ মদ, গাঁজা, সিগারেট, বিড়ি, জর্দা, গুল কিংবা অন্যান্য মাদকদ্রব্য ব্যবহার করতে শুরু করেন। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে শুরু হওয়া ওষুধই পরে আসক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
প্রবীণদের মাদকাসক্তির পেছনে বেশ কিছু কারণ কাজ করে। একাকিত্ব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সদস্যরা কর্মব্যস্ত থাকায় অনেক প্রবীণ নিজেকে অপ্রয়োজনীয় বা অবহেলিত মনে করেন। অবসাদ, হতাশা এবং মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তারা মাদকের আশ্রয় নিতে পারেন। দীর্ঘদিনের ব্যথা, অনিদ্রা, উদ্বেগ বা বিষণ্নতার কারণে ব্যবহৃত কিছু ওষুধও ধীরে ধীরে নির্ভরশীলতা সৃষ্টি করে। এ ছাড়া পুরোনো অভ্যাস, বন্ধুদের প্রভাব, সামাজিক পরিবেশ এবং সচেতনতার অভাবও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এগুলোর প্রভাবে প্রবীণ ব্যক্তি শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন, স্মৃতিশক্তি কমে যেতে পারে, পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে, হৃদরোগ ও শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা দেখা দিতে পারে। অনেক সময় আচরণগত পরিবর্তন, রাগ, সন্দেহপ্রবণতা এবং পারিবারিক কলহও বেড়ে যায়। পরিবারের সদস্যরা অসহায় বোধ করেন এবং কী করবেন বুঝে উঠতে পারেন না।
এ সমস্যা থেকে উত্তরণের প্রথম ধাপ হলো সঠিক চিকিৎসা। মাদকাসক্তি কোনো নৈতিক ব্যর্থতা নয়; এটি একটি চিকিৎসাযোগ্য স্বাস্থ্য সমস্যা। তাই প্রথমেই একজন চিকিৎসক বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন প্রয়োজন। তিনি রোগীর ব্যবহৃত মাদক বা ওষুধের ধরন, আসক্তির মাত্রা এবং শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে চিকিৎসা পরিকল্পনা নির্ধারণ করবেন। কিছু ক্ষেত্রে ওষুধ ধীরে ধীরে কমিয়ে আনতে হয়, আবার কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হতে পারে।
কাউন্সেলিং এবং সাইকোথেরাপি চিকিৎসার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ব্যক্তিগত কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে প্রবীণ ব্যক্তি তাঁর মানসিক কষ্ট, একাকিত্ব, ভয় এবং হতাশা নিয়ে কথা বলার সুযোগ পান। কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি নেতিবাচক চিন্তা ও ক্ষতিকর আচরণ পরিবর্তনে সহায়তা করতে পারে। মোটিভেশনাল থেরাপি রোগীকে মাদক ছাড়ার জন্য উৎসাহিত করে। পরিবারভিত্তিক কাউন্সেলিংও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য অর্জন কঠিন।
জীবনযাপনের পরিবর্তনও পুনরুদ্ধারের একটি বড় অংশ। নিয়মিত হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাদ্য গ্রহণ এবং স্বাস্থ্যকর দৈনন্দিন রুটিন মাদক ব্যবহারের আকাঙ্ক্ষা কমাতে সাহায্য করে। সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ, বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো, বই পড়া, বাগান করা, ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকা প্রবীণদের মানসিকভাবে সক্রিয় রাখে। পরিবার যদি তাদের সময় দেয়, কথা শোনে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়, তবে একাকিত্ব অনেকাংশে কমে যায়।
পুনর্বাসন প্রক্রিয়াও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে শুধু মাদক ছাড়লেই সমস্যা শেষ হয় না। ব্যক্তি যেন পুনরায় মাদকের দিকে ফিরে না যান, সেজন্য দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা প্রয়োজন। নিয়মিত ফলোআপ, সহায়ক গ্রুপে অংশগ্রহণ, পারিবারিক সমর্থন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক পুনঃসংযুক্তি। প্রয়োজন হলে বিশেষায়িত পুনর্বাসন কেন্দ্রের সেবাও গ্রহণ করা যেতে পারে।
প্রবীণদের দোষারোপ না করে সমস্যার কারণ খুঁজে বের করা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া জরুরি। প্রবীণ যখন মাদকমুক্ত জীবনে ফিরে আসেন, তখন শুধু তার জীবনই নয়, পুরো পরিবারও নতুন করে স্বস্তি ও শান্তি ফিরে পায়। তাই বার্ধক্যের এই নীরব সংকটকে আর উপেক্ষা নয়; সচেতনতা, চিকিৎসা এবং ভালোবাসার মাধ্যমে গড়ে তুলতে হবে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন।
হাসান আলী: প্রবীণ বিষয়ে লেখক, গবেষক ও সংগঠক
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি