অন্যদৃষ্টি
কৃষিক্ষেত্রে স্মার্ট কৃষক কার্ড
নিয়াজ মো. ফারহাত রহমান
প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:১৩ | আপডেট: ১২ আগস্ট ২০২৬ | ০২:৫০
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশে প্রতিটি বপন মৌসুম শুরু হয় আশার সঙ্গে। কিন্তু সেই আশার সঙ্গে থাকে গভীর অনিশ্চয়তাও। কৃষকরা শুধু জমিতে বীজ বপন করেন না। তারা বপন করেন ঝুঁকি, দুশ্চিন্তা ও অজানা ভবিষ্যৎ। সময়মতো বৃষ্টি হবে তো? কাটার আগেই বন্যা এসে ফসল ভাসিয়ে নিয়ে যাবে না তো? শৈত্যপ্রবাহ কি কোমল চারাগাছকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে? তাপপ্রবাহ ফসলের ফুল ফুটতে বিঘ্ন ঘটাবে না তো?
বছরের পর বছর বাংলাদেশের কৃষি এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই পরিচালিত হয়ে এসেছে। এখন সেই বাস্তবতা ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করেছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির সমন্বয়ে তৈরি হচ্ছে একটি নতুন কৃষি বাস্তবতা, যেখানে কৃষক অনুমান নয়; তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন; ঝুঁকি আগেভাগেই শনাক্ত করতে পারছেন এবং উৎপাদন ও আয় বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছেন।
এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আবহাওয়ার পূর্বাভাসভিত্তিক কৃষি পরামর্শ সেবা। এই সেবার মাধ্যমে কৃষক আগাম জানতে পারছেন বৃষ্টিপাতের ধরন, তাপমাত্রার পরিবর্তন, বন্যার আশঙ্কা, পোকামাকড়ের আক্রমণ এবং ফসলভিত্তিক করণীয়।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য কৃষকের কোনো ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি বা জটিল অবকাঠামোর প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু সহজবোধ্য, ব্যবহারযোগ্য তথ্য সময়মতো কৃষকদের কাছে পৌঁছানো।
তবে এত অগ্রগতির পরও একটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে, সঠিক তথ্য সঠিক সময়ে সঠিক কৃষকের কাছে পৌঁছানো। এখানেই স্মার্ট কৃষক কার্ড একটি যুগান্তকারী সমাধান হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। এটি কেবল একটি ডিজিটাল কার্ড নয়; বরং একটি সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থার ভিত্তি। প্রতিটি কৃষকের জন্য একটি একক ডিজিটাল পরিচয় তৈরি করে তার অবস্থান, ফসল, মৌসুম এবং তথ্য ও কৃষি পরামর্শ সরাসরি তার কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে। উদাহরণস্বরূপ, হাওর অঞ্চলের একজন কৃষক আগাম বন্যার সতর্কতা পেয়ে ফসল রক্ষার ব্যবস্থা নিতে পারবেন। আবার বরেন্দ্র অঞ্চলের একজন কৃষক বৃষ্টির পূর্বাভাস অনুযায়ী সেচ পরিকল্পনা করতে পারবেন। এ ধরনের নির্ভুল, সময়োপযোগী ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক পরামর্শ তখনই সম্ভব, যখন কৃষকের তথ্য এবং আবহাওয়ার তথ্য একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে যুক্ত থাকবে।
সহজভাবে বলতে গেলে, স্মার্ট কৃষক কার্ড বিজ্ঞান ও মাঠের মধ্যে একটি কার্যকর সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারে। এটি গবেষণাগারে উদ্ভাবিত উন্নত প্রযুক্তিকে কৃষকের হাতে ব্যবহারযোগ্য রূপে পৌঁছে দিতে সক্ষম। একই সঙ্গে এটি একটি ফিডব্যাক লুপ তৈরি করবে, যেখানে কৃষকের অভিজ্ঞতা ও তথ্য ভবিষ্যতের পূর্বাভাস ও পরামর্শকে আরও উন্নত করবে।
এইভাবে ধীরে ধীরে একটি বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থা গড়ে উঠবে যেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে তথ্যের ভিত্তিতে, ঝুঁকি আগেই মোকাবিলা করা হবে এবং দেশের প্রত্যেক কৃষক সময়মতো ব্যক্তিকেন্দ্রিক পরামর্শ পাবেন। আজকের বিশ্বে খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং টেকসই উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এ ধরনের উদ্যোগ আর বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজনীয়তা।
স্মার্ট কৃষক কার্ড এবং পূর্বাভাসভিত্তিক কৃষি পরামর্শ– এ দুই উদ্যোগ একসঙ্গে বাংলাদেশের কৃষির ভবিষ্যৎকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা, সমন্বিত বাস্তবায়ন এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এই উদ্যোগ বাংলাদেশের কৃষিকে শুধু উৎপাদনশীলই নয়, বরং টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং জলবায়ু সহনশীল এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। তখন কৃষকের জন্য কৃষি আর অনিশ্চয়তার খেলা হবে না বরং হবে জ্ঞান, প্রযুক্তি ও আত্মবিশ্বাসের এক নতুন অধ্যায়।
ড. নিয়াজ মো. ফারহাত রহমান: প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তন গবেষক, এগ্রোমেট ল্যাব, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), গাজীপুর
[email protected]
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি