অন্যদৃষ্টি
ডিজিটাল উপনিবেশবাদ
তাফি ম্যাকা
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:২০
| প্রিন্ট সংস্করণ
আমাজন সম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকায় দেশটির বৃহত্তম ও নির্দিষ্ট এলাকাভিত্তিক ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান হেরোটেলের মাধ্যমে ২০২৭ সাল নাগাদ তাদের লিও স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা চালুর ঘোষণা দিয়েছে। আফ্রিকায় এ ধরনের প্রথম চুক্তি এটি; যার মাধ্যমে ফাইবার বা ফিক্সড ওয়্যারলেস নেটওয়ার্কের আওতার বাইরে থাকা বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ইন্টারনেটের আওতায় আনা হবে। ৫৫০টিরও বেশি শহরে ৩ লাখ ৫০ হাজারের বেশি গ্রাহককে সেবা দেয় হেরোটেল। এর ফলে আমাজন এমন সব কৃষি অঞ্চল ও গ্রামীণ জনপদে ঢোকার সুযোগ পাচ্ছে, যেখানে দূরত্ব, ভৌগোলিক অবস্থান ও কম জনসংখ্যার কারণে প্রথাগত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা বেশ ব্যয়বহুল।
আমাজন এমন একটি বাজারে প্রবেশ করছে, যা ইতোমধ্যে স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের মাধ্যমে বদলে যেতে শুরু করেছে। ইলন মাস্কের স্পেসএক্স পরিচালিত স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা ‘স্টারলিঙ্ক’ মার্চ পর্যন্ত প্রায় ৯ হাজার স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ১৬৪টি দেশ ও অঞ্চলের ১ কোটি ৩ লাখ গ্রাহককে সেবা দিচ্ছে।
তবে স্যাটেলাইট সেবা অনুন্নত ও অনগ্রসর অঞ্চলে ইন্টারনেট সংযোগ পৌঁছে দিতে পারলেও দরিদ্র পরিবারগুলো এর খরচ বহন করতে পারবে কিনা, তা এখনও অনিশ্চিত। উপরন্তু এসব সেবার মাধ্যমে যারা অনলাইনে যুক্ত হবেন, তারা হয়তো শেষ পর্যন্ত সেই বিদেশি করপোরেশনগুলোর ওপরেই নির্ভরশীল হয়ে পড়বেন, যাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে তাদের অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনের অপরিহার্য অবকাঠামো।
আমাজন এবং স্পেসএক্স উভয়ই যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা অবকাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ২০২৫ থেকে ২০২৯ অর্থবছরের মধ্যে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সম্ভাব্য ২৮টি মিশনের জন্য স্পেসএক্স ৫ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের জাতীয় নিরাপত্তা-বিষয়ক একটি চুক্তি পেয়েছে। অন্যদিকে আমাজন ওয়েব সার্ভিসেস মার্কিন প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে স্পর্শকাতর ক্লাউড সেবা প্রদান করে থাকে। ফলে তাদের অবকাঠামো ইতোমধ্যে মার্কিন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে একসূত্রে গাঁথা। দরিদ্র দেশগুলোতে তাদের হাতে নেটওয়ার্কের মতো মৌলিক ব্যবস্থার দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া মানে তাদের অর্থনীতি, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং দৈনন্দিন জীবনে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ক্ষমতার বিস্তার ঘটানো।
বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট সুবিধার বাইরে থাকা ২২০ কোটি মানুষের ৯৬ শতাংশই বাস করেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। পুরো আফ্রিকায় মাত্র ৩৬ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন; গ্রামীণ এলাকায় তা ২১ শতাংশ। ফিক্সড ব্রডব্যান্ডের খরচ নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে একজন মানুষের গড় মাসিক আয়ের চার ভাগের এক ভাগের চেয়েও বেশি।
বিপদ কিন্তু এতে নয় যে, আমাজন লিওর মাধ্যমে সবকিছুর মালিক হয়ে যাচ্ছে। আসল সংকট তৈরি হয় তখন, যখন কোনো একটি বিদেশি করপোরেশন এমন সব ডিজিটাল অবকাঠামো নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, যার ওপর কোনো দেশের সরকার ও ব্যবসা সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। যেমন–ইন্টারনেট সংযোগ, ক্লাউড স্টোরেজ, তথ্য বিশ্লেষণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। দেশের ডেটা বিদেশে চলে যাবে, সেখানে প্রক্রিয়াজাত হয়ে বাণিজ্যিক তথ্যে রূপ নেবে এবং শেষমেশ দামি সেবা হয়ে দেশে ফিরে আসবে। যখন গ্লোবাল সাউথ শুধু ব্যবহারকারী ও বাজার হিসেবে ব্যবহৃত হবে আর মালিকানা, মুনাফা ও মূল নিয়ন্ত্রণ থাকবে যুক্তরাষ্ট্রে, তখন এই ইন্টারনেট সংযোগ আসলে ডিজিটাল উপনিবেশবাদে পরিণত হয়।
আমাজন লিও এবং স্টারলিঙ্ক অবশ্যই সরকার ও প্রথাগত অপারেটরদের অধীনে পেছনে পড়ে থাকা সমাজকে ইন্টারনেটে যুক্ত করতে সাহায্য করতে পারে। তবে সেই ইন্টারনেট সংযোগ যেন মানুষের স্বাধীনতা প্রসারিত করে; বিদেশি করপোরেশনের হাতে ক্ষমতা তুলে না দেয়। গ্লোবাল সাউথের ডিজিটাল ভবিষ্যৎ যেন কোনোভাবেই জেফ বেজোস, ইলন মাস্কের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত না হয়।
তাফি ম্যাকা: আলজাজিরার কলাম লেখক; আলজাজিরা থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি