মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল
কেবল উত্তরপত্র মূল্যায়নে নয়, সমস্যার গোড়ায় হাত দিন
মাহফুজুর রহমান মানিক
মাহফুজুর রহমান মানিক
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:২৫ | আপডেট: ১২ আগস্ট ২০২৬ | ১০:৩০
| প্রিন্ট সংস্করণ
পাস-ফেল উভয়ই পরীক্ষার ফলাফল হলেও পাস করার জন্যই সবাই পরীক্ষা দেয়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সব আয়োজন পাস করানোর জন্যই। কোনো বিষয়ে ১০০ নম্বরে ৩৩ পাওয়া খুব কঠিন নয়। এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা এখন প্রথম পাবলিক পরীক্ষা। এর আগে ৯টি ক্লাস উত্তীর্ণ হয়ে আসতে হয়। দুই বছর ধরে একটি বিষয় পড়ার পর শিক্ষার্থীরা প্রি-টেস্ট ও টেস্ট পরীক্ষা দেয়। এরপর এসএসসি ও সমমানের চূড়ান্ত পর্বে অবতীর্ণ হয়। সে জন্যই প্রশ্ন উঠছে, এতটি ধাপ অতিক্রম করার পরও শিক্ষার্থীরা কেন ফেল করে?
গত সোমবার প্রকাশিত মাধ্যমিকের চূড়ান্ত পরীক্ষার পাসের হার সংগত কারণেই আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ ১৯ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী ফেল করেছে এবার। ১৮ লাখ শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় সাত লাখ ফেল করা মানে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রতি তিনজনের একজনেরও বেশি শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। ২০০৮ সাল থেকে এসএসসির ফলে যে উল্লম্ফন আমরা দেখছিলাম, তা ২০২৪ সাল পর্যন্ত ছিল। গত বছর এসে সেখানে ছেদ পড়ে। এবার পাসের হার গতবারের চেয়েও কম। ২০২৪ সালে পাসের হার ছিল ৮৩ শতাংশ; গত বছর ৬৮ শতাংশ; আর এবার ৬২ শতাংশ শিক্ষার্থী এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে।
ফেলের সংখ্যা বেশি বলেই সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, মন খুলে গান গাওয়া যায়, নম্বর দেওয়া যায় না। প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিনও বলেছেন, এবার নির্মোহভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও এটাই বলা হয়েছে, অতীতের মতো ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখার প্রবণতার চেয়ে সত্যিকার মূল্যায়ন হয়েছে। সত্যিকার মূল্যায়নে যদি এত শিক্ষার্থী ফেল করে থাকে, তবে সমস্যা আসলে কোথায়?
সমস্যা কেবল উত্তরপত্র মূল্যায়নে নয়; আরও গভীরে। প্রথম কথা হলো, আমাদের শিক্ষা হয়ে গেছে পরীক্ষাকেন্দ্রিক। শিক্ষার উদ্দেশ্য যেখানে লার্নিং বা শেখা, সেখান থেকে আমরা দূরে সরে গেছি। শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে কতটা শিখছে, এর চেয়ে আমরা দেখছি, পরীক্ষায় কত নম্বর পাচ্ছে। আবার শিখন পদ্ধতি এখন মুখস্থনির্ভর। যে শিক্ষার্থী যতটা মুখস্থ করতে পারে এবং তা পরীক্ষার খাতায় যতটা তার প্রতিফলন ঘটাতে পারছে, সে-ই ভালো করছে। এখানেও তার শিখন উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। সুতরাং এখানে সিস্টেমের সমস্যা। এই সমস্যা পাবলিক পরীক্ষায় এসে ধরা পড়লেও তার সূচনা হয় আসলে প্রাথমিকে। প্রাথমিকের দুর্বল ভিত্তি নিয়ে যে শিক্ষার্থী ওপরের দিকে ওঠে, সে অন্যান্য শ্রেণিতে নানাভাবে পার পেলেও এসএসসিতে এসে আর যেনতেনভাবে পাস করতে পারে না।
প্রাথমিকের অধিকাংশ শিক্ষার্থীই যে রিডিং পড়তে পারে না, তা বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের গণিত ও ইংরেজিতে দুর্বলতার চিত্রও গবেষণায় বারবার উঠে আসছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন ইউনিট গত জুনে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিদ্যালয় পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দিয়েছে– সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী বাংলা ভাষার ই, ঈ, উ, ঊ, স, শ এবং ঙ সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারে না। ঠিকমতো যুক্ত বর্ণও পড়তে পারে না এবং তাদের গণিত ও ইংরেজিতে দুর্বলতা চোখে পড়ার মতো।
এ বছরও এসএসসি ও সমমানের ফল বিশ্লেষণ করে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীরা অকৃতকার্য হয়েছে বেশি। মঙ্গলবার দৈনিক সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদনের শিরোনামও বিষয়টি স্পষ্ট করছে– ‘শিখন ঘাটতিসহ নানা সংকট, ১৯ বছরে সর্বনিম্ন পাস’। সুতরাং পাসের হার বাড়াতে হলে প্রাথমিক স্তর থেকেই নজর দিতে হবে। শিক্ষার্থী অর্জন-উপযোগী যোগ্যতা কিংবা প্রান্তিক যোগ্যতা অর্জন করতে পারছে না কেন– তার উত্তর খুঁজে সেখানে কাজ করতে হবে। আমাদের শিক্ষকদের যোগ্যতার প্রশ্ন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি শিক্ষার্থীদের শিখন-শেখানোর পদ্ধতিতেও সমস্যা রয়ে গেছে। সমস্যা আছে মূল্যায়নেও।
এসএসসির গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষায় শতভাগ না হলেও কাছাকাছি সংখ্যক শিক্ষার্থীর পাস করা অসম্ভব নয়। সে জন্য ব্যবস্থায় হাত দিতে হবে। শিক্ষা নিয়ে অতীতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা কম হয়নি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, শ্রেণিকক্ষে শিশুবান্ধব শিখন এখনও আমরা নিশ্চিত করতে পারিনি। সে জন্য নতুন শিক্ষাক্রম জরুরি হয়ে পড়েছে। উন্নত বিশ্ব থেকে হুবহু কপি করে নয়, বরং বাংলাদেশের বাস্তবতা আমলে নিয়েও শিক্ষাক্রম সাজাতে হবে।
পাবলিক পরীক্ষার খাতা সঠিকভাবে মূল্যায়নের বিষয়টি সরকার নিশ্চিত করছে। এটা ভালো উদ্যোগ। কিন্তু কেবল খাতা মূল্যায়ন আর পরীক্ষায় নকলের তোড়জোড় করে মূল সমস্যার সমাধান হবে না। এখানে পাবলিক পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়েও ভাবা যেতে পারে। সমকালে ৩ জুলাই প্রকাশিত ‘অকৃতকার্য কমাতে চাই পরীক্ষাব্যবস্থার সংস্কার’ শিরোনামের লেখায় বুয়েটের অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রাজ্জাক কিছু প্রস্তাব করেছেন। যেমন সিলেবাসকে ছোট ছোট মডিউলে ভাগ করে দেওয়া, সব পরীক্ষা দুই বছর শেষে না নিয়ে ছয় মাস পরপর নেওয়ার ব্যবস্থা করা ইত্যাদি। এভাবে পরীক্ষা পদ্ধতি নমনীয় হতে পারে। পরীক্ষায় দুয়েক বিষয় ফেল করলেও এইচএসসিতে ভর্তি এবং রিপিট পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
শিক্ষার্থীদের অকৃতকার্য হওয়ার পেছনে তার বিষয়ের দুর্বলতা কিংবা প্রস্তুতি ঘাটতি যেমন থাকতে পারে, তেমনি শারীরিক অসুস্থতা কিংবা মানসিক চাপও অস্বাভাবিক নয়। পরীক্ষার বিষয়কে সহজ করার কথা থাকলেও কঠিন করে ফেলছি। পরীক্ষাকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা লাগানো, নকল নিয়ে অযথা ভীতি তৈরি ইত্যাদিও শিক্ষার্থীকে মানসিকভাবে অপ্রস্তুত করতে পারে। তাদের আস্থায় নিয়েই শিক্ষার্থীবান্ধব ব্যবস্থা জরুরি।
এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় সর্বোচ্চসংখ্যক শিক্ষার্থীকে কীভাবে পাস করানো যায়, সে ব্যবস্থা জরুরি। শিক্ষার্থীর ভিত্তি শক্ত করে মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করে এসএসসি ও সমমানের পাস করার পর কোনো শিক্ষার্থী ঝরে পড়লেও তার জীবন পরিচালনায় তেমন কোনো সমস্যা হবে না।
মাহফুজুর রহমান মানিক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, সমকাল
[email protected]
- বিষয় :
- মাহফুজুর রহমান মানিক
- শিক্ষা
- এসএসসি
- পরীক্ষা