সুশাসন
বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে চাই শৃঙ্খলা, দক্ষতা ও জবাবদিহি
মামুন রশীদ
মামুন রশীদ
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৩০ | আপডেট: ১৩ আগস্ট ২০২৬ | ১১:৩৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও পরামর্শকদের অভিমত– প্রবৃদ্ধি দুই অঙ্কে নিতে হলে অবকাঠামোতে বড় ধরনের অগ্রগতি প্রয়োজন। আমাদের অভ্যন্তরীণ ভোগ ব্যয় ও পরিবহন যোগাযোগ বেড়েছে। তবে অবকাঠামো বলতে শুধু রাস্তাঘাট ও সেতু বোঝায় না। এর মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্র, গ্যাসলাইন, বন্দর, ট্রাক-লরি-পণ্য পরিবহন, আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থা। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি পায়রা বন্দরকে কার্যকর করা, আরও বড় সেতু নির্মাণ এবং সড়ক, রেল ও নগর পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি।
পেশাগত জীবনের বড় একটি সময় অর্থায়নের সঙ্গে যুক্ত থাকায় বড় প্রকল্পের পরিকল্পনা, অর্থায়ন, বাস্তবায়ন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। প্রকল্প গ্রহণের সময় যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা বাস্তবে কতটা অর্জিত হয়েছে, জনগণ কতটা উপকৃত এবং দুর্নীতি ও অপচয় কতটা নিয়ন্ত্রণ করা গেছে– এসব পর্যালোচনারও সুযোগ হয়েছে।
বঙ্গবন্ধু সেতুর অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যমুনার নদী শাসন ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। নদীর গতিপথের পরিবর্তন, মূল সেতু নির্মাণ, সংযোগ সড়ক, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ– সবকিছু সামলাতে হয়েছে। কিন্তু এই প্রকল্প দেখিয়েছে, বড় অবকাঠামোর সুফল শুধু আর্থিক রিটার্ন দিয়ে বিচার করা যায় না। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষকরা আগে যোগাযোগ সমস্যার কারণে পণ্যের ন্যায্য দাম পেতেন না। টমেটো, আলু, বেগুনসহ অনেক পণ্য নষ্ট হতো পরিবহন সংকটে। সেতু নির্মাণের পর বাজারে প্রবেশাধিকার বেড়েছে; কৃষক উপকৃত হয়েছেন এবং উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের মঙ্গা অনেকটাই কমেছে। পরে রেল সংযোগ যুক্ত হওয়ায় সুফল আরও বেড়েছে। অর্থাৎ সামাজিক ও অর্থনৈতিক রিটার্নও বড় প্রকল্পের মূল্যায়নের অংশ।
কর্ণফুলী সার কারখানা প্রকল্প আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। বিদেশি মুদ্রার সিন্ডিকেশনে দেশীয় কয়েকটি ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক ব্যাংক অংশ নিয়েছিল। জাপানের একটি প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে। সরকারি প্রতিষ্ঠান, দাতা গোষ্ঠী, প্রকৌশলী, অর্থ কর্মকর্তা ও ব্যাংকারদের সমন্বয়ে জটিল একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা তৈরি হয়। এ প্রকল্পের সার কৃষকদের উপকার করেছে এবং বাংলাদেশকে রপ্তানি বাজারেও প্রতিষ্ঠিত করেছে।
মেঘনা ও গোমতী সেতু এখন দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ জীবনরেখা। এসব প্রকল্প থেকে বোঝা গেছে, দক্ষ ও সময়নিষ্ঠ ঠিকাদার কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ভৈরব সেতু থেকে আমরা শিখেছি রপ্তানি ঋণ নিশ্চয়তার গুরুত্ব। বিদেশি নিশ্চয়তার বিপরীতে অর্থায়ন করা হলে দেশের ঝুঁকি কমে এবং দীর্ঘ মেয়াদে তুলনামূলক কম সুদে অর্থায়নের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
মেঘনাঘাট ও হরিপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের অভিজ্ঞতাও শিক্ষণীয়। কার্যকর বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি, সময়মতো গ্যাস সরবরাহ এবং রাজনৈতিক ঝুঁকি বীমা অর্থায়নকে সহজ করেছিল। ফলে তুলনামূলক কম দামে দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হয়েছিল। উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তায় অবকাঠামো অর্থায়নের একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ইডকলও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
বড় প্রকল্পের অর্থায়ন কাঠামো নির্ধারণের সময় একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার, শুধু অর্থের জোগান নিশ্চিত করলেই প্রকল্প সফল হয় না। অর্থ কোথা থেকে আসছে; সুদের হার ও পরিশোধের সময় কতটা; মুদ্রার ঝুঁকি কতটা; রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক ঝুঁকি কে বহন করবে; প্রকল্পের আয় দিয়ে ঋণ পরিশোধ সম্ভব হবে কিনা– এসব প্রশ্ন শুরুতেই বিবেচনায় নিতে হবে। নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্প হলে এক প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি যেন অন্য প্রকল্পের অর্থ সংকট তৈরি না করে, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হয়।
আন্তর্জাতিক অর্থ লগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান যুক্ত থাকলে অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের সুশাসন ও স্বচ্ছতা বাড়ে। আন্তর্জাতিক মানের ঠিকাদাররা তখন কাজ করতে আগ্রহী হয় এবং ক্রয় ও অর্থ ব্যবস্থাপনায় নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। তবে বিদেশি অর্থায়ন মানেই যে সব সমস্যা দূর হবে, তা নয়। চুক্তির শর্ত, বাস্তবায়ন তদারকি, কাজের গুণগত মান এবং ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত আমাদেরই। নিয়মিত স্বাধীন নিরীক্ষা ও অগ্রগতি মূল্যায়ন থাকতে হয়।
অন্যদিকে কিছু প্রকল্পের ব্যর্থতা আমাদের সতর্ক করে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কিছু উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। শেষ পর্যন্ত সেগুলো নির্ধারিত সময়ের আগেই ব্যবহারের অনুপযোগী হওয়ায় তা বিক্রি করতে হয়েছে। আবার অন্য একটি উড়োজাহাজ সংগ্রহের প্রক্রিয়া তুলনামূলক ভালো হয়েছে। মোদ্দাকথা, প্রকল্প গ্রহণের আগে বাস্তবসম্মত সম্ভাব্যতা যাচাই অপরিহার্য।
বন্দর, রেল, সড়ক, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পণ্য পরিবহনকে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প হিসেবে দেখলে চলবে না। এগুলোকে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। একটি সেতু নির্মাণের পর যদি সংযোগ সড়ক দুর্বল থাকে; একটি বন্দর তৈরি হলেও যদি সড়ক ও রেল যোগাযোগ না থাকে; অথবা শিল্পাঞ্চলে বিদ্যুৎ থাকলেও গ্যাস ও সরবরাহ ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যাবে না। তাই প্রকল্পের নকশায় পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।

অতীতে সরকারি কর্মকর্তা, অর্থ বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী, উন্নয়ন সহযোগী এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সমন্বিত ভূমিকা অনেক প্রকল্পকে এগিয়ে নিয়েছে। বর্তমান প্রকল্পগুলোতেও রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে দক্ষ, সৎ ও অভিজ্ঞ মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে।
এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন প্রকল্প বাস্তবায়নে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি। ব্যয় যেন অকারণে না বাড়ে; ঠিকাদার যেন সরকারকে জিম্মি করতে না পারে এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় অদক্ষ প্রতিষ্ঠান যেন কাজ না পায়; এগুলো নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্পের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ক্রয় প্রক্রিয়া, হিসাবরক্ষণ ও নিরীক্ষা শক্তিশালী করতে হবে। আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা, রপ্তানি ঋণ সংস্থা ও রাজনৈতিক ঝুঁকি বীমার ব্যবহারও প্রয়োজন অনুযায়ী বাড়ানো যেতে পারে।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ক্রমেই কঠিন হচ্ছে। তাই আর্থিক রিটার্নের পাশাপাশি পরিবেশ, সামাজিক প্রভাব, জনগণের কল্যাণ ও দারিদ্র্য বিমোচনের বিষয় বিবেচনা করতে হবে। রূপপুরের মতো জটিল প্রকল্পে আন্তর্জাতিকভাবে অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানগুলোর কারিগরি সহায়তা নেওয়া জরুরি ছিল।
বড় প্রকল্পকে শুধু সরকারি প্রকল্প হিসেবে দেখলে চলবে না। দেশজ মেধা, দক্ষ প্রকল্প পরিচালক, প্রকৌশলের শিক্ষক, সড়ক ও রেল বিভাগের অভিজ্ঞ প্রকৌশলী, পেশাজীবী, সনদপ্রাপ্ত হিসাববিদ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করতে হবে। বিদেশি ব্যাংকে কর্মরত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের নিয়ে একটি জাতীয় টাস্কফোর্সও গঠন করা যেতে পারে। শুধু সরকারি কর্মকর্তা দিয়ে দ্রুতগতির বড় প্রকল্পের সব জটিলতা সামলানো কঠিন। আমাদের প্রয়োজন দক্ষতা, স্বচ্ছতা, আর্থিক শৃঙ্খলা, পরিবেশ সচেতনতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্ত। তাহলেই অবকাঠামো প্রকল্পগুলো শুধু দৃশ্যমান উন্নয়ন নয়; টেকসই প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের শক্ত ভিত্তি হয়ে উঠবে।
মামুন রশীদ: অর্থনীতি বিশ্লেষক
- বিষয় :
- মামুন রশীদ