জনস্বাস্থ্য
সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ডেঙ্গু প্রতিরোধ সম্ভব
এ বি এম আব্দুল্লাহ
এ বি এম আব্দুল্লাহ
প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৩৮ | আপডেট: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ১১:২৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
জলবায়ু পরিবর্তনে সারাদেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টির ধরন পাল্টে যাওয়া, অপরিকল্পিত নগরায়ণসহ ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী প্রজননের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ায় এবার বর্ষা মৌসুমের আগেই ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে। টানা বা থেমে থেমে বৃষ্টি, আর্দ্র আবহাওয়া এবং বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পরিষ্কার পানি ডেঙ্গু মশার বংশবিস্তারের উপযুক্ত পরিবেশ। সারাদেশে প্রতিদিন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েই যাচ্ছে। হাসপাতালে ছুটছে মানুষ।
ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহী মশা কোনো ব্যক্তিকে কামড়ালে সেই ব্যক্তি চার থেকে ছয় দিনের মধ্যে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়। আক্রান্ত ব্যক্তিকে কোনো জীবাণুবিহীন এডিস মশা কামড়ালে সেটিও ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহী মশায় পরিণত হয়। এভাবে একজন থেকে অন্যজনে মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু ছড়িয়ে থাকে।
ডেঙ্গু ভাইরাসের রয়েছে চারটি সেরোটাইপ– ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ এবং ডেন-৪।
একবার এক সেরোটাইপ দিয়ে আক্রান্ত হলে দেহে সেটির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। কিন্তু আরেকটা সেরোটাইপ দিয়ে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই ডেঙ্গু জ্বর চারবার হতে পারে। যারা একবার ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে, তাদের দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু হলে জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়।
ডেঙ্গুর উপসর্গের ধরন পাল্টে গেছে। রোগীভেদে রোগের লক্ষণের ভিন্নতা দেখা যায়। বর্তমানে ডেঙ্গুতে যেসব উপসর্গ দেখা দিচ্ছে তা হলো, হঠাৎ জ্বর আসা আবার জ্বর না থাকা, কাশি, শরীর ব্যথা, বমি বা বমি বমি ভাব, অসহ্য পেটে ব্যথা, চোখে ব্যথা, ব্লাড প্রেশার ও প্রস্রাব কম হওয়া, মস্তিষ্কে প্রদাহ, হাত-পা ফুলে যাওয়া, দেহে পানি আসা, পাতলা পায়খানাসহ প্লাটিলেটও অনেক কমে যাওয়া। জ্বরের তীব্রতা, তীব্র শরীর ব্যথা এবং র্যাশ পরিলক্ষিত হচ্ছে না দেখে রোগীরা অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ চিকিৎসা নিতে বিলম্ব করছেন। ফলে কিছু বুঝে ওঠার আগেই কোনো কোনো রোগী হেমোরেজিক ডেঙ্গু বা ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের মতো মারাত্মক জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে আসছেন। শেষ মূহূর্তে ডাক্তারদেরও হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসা দিতে।

আগে ধারণা ছিল, এডিস মশা সকালে ও বিকেলে কামড়ায়। তবে কীটতত্ত্ববিদের সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এডিস মশা দিনে বা রাতে যে কোনো সময় কামড়ায়। রাতের অন্ধকারে কামড়ানোর হার কম। তবে উজ্জ্বল আলোতে রাতেও কামড়াতে পারে। বর্ষাকালে ডেঙ্গুর প্রবণতা বেশি দেখা গেলেও ডেঙ্গু এখন সারাবছরের অসুখ হয়ে গেছে, যদিও শীতে প্রকোপ কম থাকে।
ডেঙ্গু জ্বরের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। এই জ্বর সাধারণত এমনিতেই ভালো হয়ে যায়। তবে জটিলতা এড়াতে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। ডেঙ্গু যেহেতু ভাইরাসজনিত, তাই উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়। জ্বর হলে শুধু প্যারাসিটামল খেতে হবে, অন্য কোনো ব্যথার ওষুধ যেমন অ্যাসপিরিন, ডাইক্লোফেনাক, আইবুপ্রোফেন কোনোক্রমেই খাওয়া যাবে না। এতে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়বে। প্রচুর পানি এবং তরল খাওয়ানো উচিত। খেতে না পারলে বা অন্য কোনো প্রয়োজনে শিরাপথে স্যালাইন বা গ্লুকোজ ইত্যাদি দিতে হবে।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করা যাবে না। যাদের দ্বিতীয়বার বা তৃতীয়বার ডেঙ্গু হয়েছে, তাদের বেশি সতর্ক থাকতে হবে। প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। কিছু কিছু লক্ষণ দেখা দিলে অতিসত্বর ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। যেমন প্লাটিলেটের মাত্রা কমে গেলে; শরীরের যে কোনো অংশ থেকে রক্তপাত হলে; প্রস্রাবের পরিমাণ কমে গেলে; জন্ডিস ও অতিরিক্ত ক্লান্তি বা দুর্বলতা দেখা দিলে; প্রচণ্ড পেটে ব্যথা বা বমি হলে।
এসব ক্ষেত্রে অবহেলা না করে অবশ্যই রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে সব সময় মশারির মধ্যে রাখতে হবে, যাতে কোনো মশা কামড়াতে না পারে। কারণ আক্রান্ত রোগীকে কামড়ানো মশা ডেঙ্গুবাহিত মশায় পরিণত হয়। অন্য সুস্থ মানুষকে কামড়ালে তার ডেঙ্গু জ্বর হতে পারে এবং এভাবেই ডেঙ্গু অন্যদের মাঝে ছড়ায়।
জ্বর হলে তিন দিনের মধ্যেই রক্তের ডেঙ্গু এনএস১ পরীক্ষাটি করাতে হবে। পজিটিভ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিতে হবে। বাচ্চা, বয়স্ক; যারা ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি, লিভার, ক্যান্সার, স্ট্রোক, হার্টের রোগী; যাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এবং অন্তঃসত্ত্বা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধে দুটি বিষয়ে জোর দিতে হবে:
(১) এডিস মশা মেরে ফেলা এবং মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করা। (২) মশার কামড় থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করা:
এডিস মশা ডেঙ্গু জ্বরের বাহক। তাই মশা দমনই ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধের প্রধান উপায়। এ জন্য নিম্নের পদক্ষেপগুলো নিতে হবে:
(১) এডিস মশা সাধারণত পরিষ্কার জমা পানিতে ডিম পাড়ে। তাই বাড়ির যে কোনো স্থানে টিনের কৌটা, মাটির পাত্র, বোতল, নারকেলের খোসা, ক্যান, ফুলের টব, ফুলদানি বা এ ধরনের যে কোনো পাত্রে জমে থাকা পানি এডিস মশার অনুকূল প্রজননস্থল। এসব জায়গা নিয়মিত পরিষ্কার কিংবা নষ্ট করে ফেলতে হবে। কোথাও তিন থেকে পাঁচ দিনের বেশি যেন জমা পানি না থাকে।
(২) ছাদবাগান, ছাদে জমে থাকা পানি এবং সেখানে ব্যবহৃত খোলা ড্রাম, বাড়ির আঙিনা, বারান্দা, গ্যারেজ ইত্যাদি পরিষ্কার করতে হবে। ঘরবাড়ি নিজেকেই পরিষ্কার করতে হবে। নির্মাণাধীন ভবনে যেন তিন থেকে পাঁচ দিনের বেশি পানি জমা না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে অ্যাডাল্ট মশা এবং মশার লার্ভা নির্মূল করার ব্যবস্থা নিতে হবে।
(৩) ঘরের বাইরে পরিত্যক্ত পাত্র, টায়ার, মাটির হাঁড়ি, চিপসের প্যাকেট, ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত গাড়ি ইত্যাদিতে জমে থাকা পানিতে এডিস মশা ডিম পাড়ে। এগুলো ধ্বংস করতে হবে।
(৪) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত, নার্সারি, রেস্টুরেন্ট, দোকানপাট ও তার আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
মশার কামড় থেকে বাঁচা:
(১) দিনে বা রাতে ঘুমালে অবশ্যই মশারি ব্যবহার করতে হবে।
(২) স্কুলগামী ছোট ছেলেমেয়েকে ফুল হাতা জামা; হাফপ্যান্টের পরিবর্তে ফুলপ্যান্ট পরতে হবে। জুতা পরতে হবে, যাতে পা ঢাকা থাকে।
(৩) ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ রাখা, প্রতিরোধক জাল লাগানো, মশার কয়েল বা স্প্রে ব্যবহার করা যেতে পারে।
ডেঙ্গুর কোনো ভ্যাকসিন কিংবা কার্যকরী ওষুধ এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। একমাত্র সচেতনতা ও প্রতিরোধের মাধ্যমেই এর হাত থেকে মুক্তি সম্ভব। যেহেতু এডিস মশা একটি গৃহপালিত মশা, তাই কেবল প্রশাসনের পক্ষে এডিস মশা নির্মূল করা সম্ভব নয়। এ ছাড়া কিছু বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ যেমন– মশার ঘনত্ব পর্যবেক্ষণ, প্রজননস্থল শনাক্তকরণ ও ধ্বংস এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে।
প্রশাসন ও জনসাধারণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় টেকসই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ: চিকিৎসক
- বিষয় :
- জনস্বাস্থ্য