ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

উচ্চশিক্ষা

সমাজের প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়, পাবিপ্রবি এবং আমার স্বপ্ন

সমাজের প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়, পাবিপ্রবি এবং আমার স্বপ্ন
×

অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত মোহা. শামীম

আবুল হাসনাত মোহা. শামীম 

প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ১৯:৫৬

বিশ্ববিদ্যালয় চার দেয়ালের মাঝে আটকে থাকা কোনো জ্ঞানকেন্দ্র বা প্রাণহীন ডিগ্রি তৈরির কারখানা নয়। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি। জ্ঞান-শাখার একীভূত বিশ্বে নতুন নতুন পথ আর পরিক্রমা সামনে আসছে ক্রমশ। সকল প্রকার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে আমাদের আজ গভীরভাবে ভাবতে হচ্ছে, গবেষণায় আত্মনিমগ্ন হতে হচ্ছে অহর্নিশ এবং স্বল্প সময়ের মধ্যেই অন্যান্য জাতি-রাষ্ট্রের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার উপায় বের করতে হচ্ছে।
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পাবিপ্রবি) উপাচার্যের দায়িত্ব পেয়ে আমি বিশ্ববিদ্যালয়টিকে কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চাই না। আমি একে মানবতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক অনন্য তীর্থস্থান হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজে হাত দিয়েছি। আমি চাই, আমাদের এই বিদ্যাপীঠ কেবল সনদধারী গ্র্যাজুয়েটই তৈরি করবে না, বরং জন্ম দেবে একদল আলোকিত ও সংবেদনশীল মানুষের, যারা সমাজের প্রতিটি স্তরে ইতিবাচক পরিবর্তনের রূপকার হবে। এ ক্ষেত্রে প্রজন্মের সাথে প্রজন্মের মায়াবী সেতুবন্ধ তৈরি করা বিশেষভাবে জরুরি।
শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে সামাজিক দায়বদ্ধতার বীজ বপন করতে আমি ‘স্বেচ্ছাসেবী ক্লাস কার্যক্রম’ নামে একটি পন্থা চালু করতে চাই। অভিনব হলেও সমাজ গঠনে বিষয়টি নিঃসন্দেহে দারুণভাবে কাজ করবে। নিকট অতীতে আমার নিজ গ্রামে একটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা এবং পরিচালনার মাধ্যমে আমি এর প্রমাণ পেয়েছি।
একবার চোখ বন্ধ করে ভাবুন তো দৃশ্যটি– পাবিপ্রবির উচ্ছল ও মেধাবী তরুণ শিক্ষার্থীরা যখন হাসিমুখে গিয়ে দাঁড়াবে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে! গণিত, বিজ্ঞান বা ইংরেজির মতো যেসব বিষয় শিশুদের মনে অহেতুক ভয়ের জন্ম দেয়, আমাদের শিক্ষার্থীরা পরম মমতায় যখন সেই ভয় দূর করে দেবে, তখন প্রজন্মের সাথে প্রজন্মের কী এক অভূতপূর্ব ও মায়াবী সেতুবন্ধ তৈরি হবে!
এই উদ্যোগ কেবল শিশুদের শিক্ষার ভিতই মজবুত করবে না, বরং আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আত্মিক উত্তরণ‌ও ঘটাবে। তারা শিখবে, কীভাবে নিজের অর্জিত জ্ঞান দিয়ে অন্যের মুখে হাসি ফোটানো যায়। আমার এই স্বপ্নের শুরুটা হবে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো ঘিরে। কারণ, প্রাথমিক স্তর হলো একটি জাতির শিকড়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভিত্তিভূমি এবং সুনাগরিক নির্মাণের প্রথম ও প্রধান স্তর।
একটি দেশের মূল চালিকাশক্তি হলো তার দক্ষ ও শিক্ষিত মানবসম্পদ। আর একটি শিশুর ভাষা, বিজ্ঞানমনস্কতা, সামাজিক শিষ্টাচার ও নৈতিক মূল্যবোধের প্রথম স্ফুরণ ঘটে এই প্রাথমিক স্তরেই। শিকড় যত মজবুত হবে, মহিরুহ ততটাই বিশাল আর শক্তিশালী হবে। আমরা চাই, আমাদের তরুণদের হাত ধরে শিশুদের সেই শিকড়টি পরম যত্নে সিঞ্চিত হোক।
আমাদের ছেলেমেয়েদের মধ্যে যে জিনিসটির অভাব দেখা যায়, তা হলো নৈতিকতা।‌ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন ‘মানুষ করে তোলাই শিক্ষা’। ভালো মানুষ হওয়ার অসংখ্য ক্রাইটেরিয়ার মধ্যে উদাহরণ হিসেবে সালাম দেওয়ার প্রসঙ্গটি ধরা যাক! সালাম প্রদান হলো মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার প্রথম ও প্রধান পদক্ষেপ। কাজেই প্রাথমিক স্তর থেকেই ছেলেমেয়েদের ঘরে-বাইরে সালাম দেওয়া প্র্যাকটিস করাতে হবে, সরি ও ধন্যবাদ বলা শেখাতে হবে। বড়দের শ্রদ্ধা এবং ছোটদের স্নেহ করার বিষয়ে সচেতন করতে হবে। একটা কথা মনে রাখতে হবে, শিশুরা যা দেখে তাই অনুসরণ করে, আর যা শেখে তাই জীবনভর বহন করে। একজন মানুষের বিনয়ী হওয়াটা খুবই জরুরি। আর এর ভিত্তি রচিত হয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। 
‘এক পাবনা, এক ভাবনা’ এই সুগভীর দর্শনের আলোকে আমি পাবিপ্রবি-কে স্থানীয় সমাজের স্পন্দনের সাথে একাত্ম করে দিতে চাই। এটি হবে এমন এক ‘মডেল বিশ্ববিদ্যালয়’, যেখানে জ্ঞান, গবেষণা এবং জনসেবা একসাথে চলবে।
আমাদের শিক্ষার্থীরা যখন ল্যাবরেটরির গণ্ডি পেরিয়ে সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের সাথি হবে, নিজেদের অর্জিত জ্ঞান সমাজের কল্যাণে বিলিয়ে দেবে, তখনই সার্থক হবে আমাদের শিক্ষা। আসুন, আমরা এমন একটি আগামীর স্বপ্ন দেখি, যেখানে পাবিপ্রবি শুধু দেশের নয়, বরং মানবতার সেবায় এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে সগর্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।

অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত মোহা. শামীম: উপাচার্য, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×