ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

খাবারের পাতে সমাজের মুখ

খাবারের পাতে সমাজের মুখ
×

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:০০

| প্রিন্ট সংস্করণ

সুকুমার রায়ের বিখ্যাত শিশুসাহিত্য ‘হ-য-ব-র-ল’র এক কাল্পনিক চরিত্র দাড়িওয়ালা ছাগল। নিজেকে সে পরিচয় দেয় ‘শ্রী ব্যাকরণ শিং, বি.এ., খাদ্যবিশারদ’ হিসেবে। কোন জিনিস খাওয়া যায়, কোনটি যায় না– তা নিয়ে তার অদ্ভুত সব জ্ঞান। সেই ছাগল মাঝেমধ্যে ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে আলোচনার কেন্দ্রে বসতে চায়। আমাদের সমাজেও ছাগল বা খাসি এখন আলোচনার প্রসঙ্গ হয়ে থাকছে। কেননা, ছাগল এখন হাসির ঘটনার জন্ম দিয়ে আড়াল থেকে সমাজের মুখটি প্রকাশ করছে। 

১৭ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিয়ের অনুষ্ঠানে বরের পাতে ‘আস্ত খাসি’ না দেওয়ায় জাপানপ্রবাসী এক যুবকের বিয়ে ভেঙে যাওয়ার ঘটনা সামাজিক মাধ্যমে বেশ আলোচিত হচ্ছে। আরও কৌতূহলোদ্দীপক, ওই যুবক অল্প সময়ের মধ্যেই অন্যত্র বিয়ে পর্ব সম্পন্ন করেছেন। খাসিসহ খাবারের থালা নিয়ে বিয়ে করার তথ্যও সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। অর্থাৎ প্রথম বিয়েতে যে খাসির অনুপস্থিতি সম্পর্ক ভাঙার কারণ হয়েছিল; দ্বিতীয় বিয়েতে সেই খাসির উপস্থিতিই নতুন সম্পর্কের বিজয় চিহ্ন হয়েছে।

ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ট্রল ও মিম তৈরি হচ্ছে। শত মানুষের শত মত। কিন্তু নিছক কৌতুকের ভিড়ে এক গভীরতর সামাজিক সংকট অনালোচিত রয়ে যাচ্ছে। এখানে আসল বিষয় খাসি নয়। বিষয় হলো পণ্য ও উপঢৌকনের মাধ্যমে সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মানসিকতা। তুচ্ছ বিষয়কে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের নিয়ন্ত্রক বানিয়ে তোলার মানসিক সংকটের প্রসঙ্গ এবং পণ্য প্রদর্শনের কাছে মানুষের আত্মমর্যাদা পরাজিত হওয়ার বার্তা।

বাংলাদেশে পণপ্রথা আইনত নিষিদ্ধ হলেও এর সংস্কৃতি পুরোপুরি বিলীন হয়নি। শুধু দাবির ভাষা বদলেছে। আসবাব, মোটরসাইকেল, গহনা, ফ্ল্যাট; আবার কোথাও দামি খাবার কিংবা বড় আয়োজন– এসবের ভেতর দিয়ে ঠিকই পণপ্রথা বহাল থাকছে। এই বাস্তবতায় একটি আস্ত খাসি নিছক খাবার না থেকে হয়ে উঠেছে বরপক্ষকে ‘সম্মান’ দেওয়ার সক্ষমতার প্রতীক। আমাদের সংস্কৃতিতে অতিথিকে ভালো খাওয়ানো অবশ্যই ইতিবাচক ঐতিহ্য। আপ্যায়নের মধ্য দিয়ে ভালোবাসা ও সম্মান প্রকাশ করা হয়। কিন্তু আপ্যায়ন যখন সামাজিক প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়, তখন সেটি আর আতিথেয়তা থাকে না। কার বিয়েতে কত পদ, কত কেজি মাংস, কত বড় আয়োজন– এসব হিসাব তখন সম্পর্কের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। অথচ আমরা ভুলে যাই একজন গরিব পিতাও তাঁর মেয়ের বিয়ের দিন মেয়েটার মাথার ওপর একটা সুন্দর শামিয়ানা টানাতে চান। কিন্তু সামাজিক প্রদর্শনী সেই ইচ্ছাকে প্রতিযোগিতায় ঠেলে দিচ্ছে। এভাবে ক্রমে ভোগবাদী সংস্কৃতি শক্তিশালী হচ্ছে আরও বেশি। 
আমাদের সামাজিক কাঠামোয় এখনও অনেক ক্ষেত্রে বরপক্ষকে ‘গ্রহীতা’ এবং কনের পরিবারকে ‘দাতা’ হিসেবে দেখা হয়। ফলে বিয়ের শুরুতেই একটি অসম সম্পর্ক তৈরি হয়। তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় বিয়ে ভাঙার ঘটনায় এই খাসি সম্মানের প্রতীক হওয়ার পেছনে দুই পক্ষেরই ভিন্ন মতামত আছে। ছেলেপক্ষ জানিয়েছে, তারা আস্ত খাসি রাখার জন্য কনেপক্ষকে আগেই টাকা দিয়েছিল, কিন্তু তারা আয়োজন করেনি। কেননা, জাপানপ্রবাসী ছেলের বিয়ের ভিডিও দূতাবাসে দেখানোর কোনো একটি প্রয়োজন আছে বলে জানিয়েছে তারা। অন্যদিকে মেয়ের পরিবার বলছে, অনুষ্ঠানের শুরু থেকেই তাদের আয়োজনের সবকিছু নিয়ে ক্রমাগত ভুল ধরছিল ছেলের পরিবার। অর্থাৎ সামাজিক মাধ্যম এবং সংবাদমাধ্যমের বরাতে ‘আস্ত খাসি’ বিষয়ে ট্যাগ লেগে গেলেও এর পেছনে রয়েছে দুপক্ষের ইগোজনিত অবস্থান। 

তুচ্ছ বিষয়ে বিয়ে ভাঙার ঘটনা আমাদের দেশে অবশ্য নতুন নয়। বগুড়ায় বিয়ের গেটে সৌজন্য  টাকা দেওয়া নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডায় বিয়ে ভেঙেছে। দই খাওয়া নিয়ে বিয়ের আসরে মারামারি করে ১৫ জন হাসপাতালে গিয়েছিল লক্ষ্মীপুরে। 

এদিকে খাসি ঘিরে আমাদের সাম্প্রতিক স্মৃতিও বিচিত্র। একটি ছাগল কখনও জনউপদ্রবের আসামি হয়েছে; কোনো খাসি হয়েছে সরকার পরিবর্তনে সহায়ক। এবার একটি খাসি কনে পরিবর্তনের কারণ হয়ে দাঁড়াল। ২০২১ সালে বগুড়ার আদমদীঘিতে ছাগল ফুলগাছ খেয়ে ফেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা করেছিলেন ইউএনও। জনউপদ্রবের অভিযোগ ছাগলের বিরুদ্ধে যে আনা যায় না– সেটা ইউএনও সাহেব বুঝতে পারেননি। ২০২৪ সালে বিশাল আকৃতির একটি খাসি ঘিরে এক তরুণের নিছক বিনোদনমূলক ভিডিও থেকেই প্রমাণ মিলেছিল রাজস্ব কর্মকর্তা পিতার অঢেল সম্পদে পুত্রের বিলাসী জীবনের গল্পের।

সুকুমার রায়ের ছাগল ছিল খাদ্যবিশারদ। আমাদের সমাজের খাসিগুলো অবশ্য খাদ্যবিশারদ নয়; কিন্তু মানুষ তাদের দিয়ে সামাজিক মর্যাদার হিসাব করতে শিখেছে। জাপানপ্রবাসী যুবকের বিয়ের অনুষ্ঠানে খাসি না থাকায় বিয়ে ভেঙে গেল। দ্বিতীয় আয়োজনে খাসি থাকায় বিয়ে হয়ে গেল। বৈবাহিক জীবনে পা রাখার আগেই খাসির চর্বিতে প্রেম আটকে গেলে তা নিয়ে উপহাস হবে বৈ কি। কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা নিজেই জানিয়েছেন, এমন সুপুত্রের সঙ্গে তিনি মেয়ের বিয়ে দেবেন না। এ সংবাদ কন্যাদের জন্য মানসিক ভরসা দিতে পারে। বিপরীতে এত ঘটনা জেনেও আরেক অভিভাবক দুদিনের মধ্যে প্রবাসী পাত্রের হাতে নিজের কন্যাকে সম্প্রদানে আগ্রহী হয়েছেন। বরের পাতে আস্ত খাসিও তুলে দিয়েছেন। এ ঘটনা আবার কন্যাদের আতঙ্কিত করে। সমাজে এখন সংসার পাতার জন্য ভালোবাসা, বোঝাপড়া কিংবা সম্মানের চেয়ে আস্ত খাসিই জরুরি হয়ে উঠেছে। তাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আস্ত খাসি না পেয়ে বিয়ে ভাঙা এবং আস্ত খাসি খেয়ে আরেক বিয়ের ঘটনায় আসল ভাগ্যবান বর, কনে কেউ না; গৃহপালিত নিরীহ প্রাণী খাসি। এই ছাগল– খাসিই আমাদের সমাজের বিভিন্ন সংকট তুলে ধরছে এখন।

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম: সহকারী সম্পাদক, সমকাল 
 

আরও পড়ুন

×