ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রাণিসম্পদের বায়বীয় প্রকল্প

রাষ্ট্রীয় সম্পদের নয়ছয় কতদিন

রাষ্ট্রীয় সম্পদের নয়ছয় কতদিন
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৩১

| প্রিন্ট সংস্করণ

ময়মনসিংহের ত্রিশালে দুধ সংগ্রহ ও সংরক্ষণে ডেইরি হাব ও ভিলেজ মিল্ক কালেকশন সেন্টার (ভিএমসিসি) স্থাপনের নামে দুই কোটি ৬১ লক্ষ টাকা আত্মসাতের যেই অভিযোগ উঠিয়াছে, তাহা খতাইয়া দেখিয়া উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। শুক্রবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদন অনুসারে, প্রাণিসম্পদ খাতে নূতন উদ্যোক্তা তৈরি, পশুপাখির উৎপাদনশীলতা ও সর্বোপরি খামারিদের ভাগ্যোন্নয়নের লক্ষ্যে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর গৃহীত এক প্রকল্পের অধীনে ২০১৯ সালে ত্রিশালে ডেইরি হাবস ও ভিএমসিসি স্থাপনের কাজ আরম্ভ করেন কথিত উদ্যোক্তা আতিকুল্লাহ বাহার। বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ অর্থায়নে এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে গৃহীত এই প্রকল্পের শর্তানুসারে, আধুনিক ল্যাব টেস্টের যন্ত্রাংশ ক্রয়ে সরকার ম্যাচিং গ্রান্টের মাধ্যমে মোট খরচের ৫০ শতাংশ (অনধিক দুই কোটি ৬১ লক্ষ টাকা) আর্থিক সহায়তা ও অনুদান দেয়। বাকি অর্থ উদ্যোক্তা স্বীয় তহবিল হইতে বহন করিবার কথা। কিন্তু কয়েক ধাপে মেয়াদ বাড়াইয়া প্রকল্পটির কাজ চলতি বৎসরের মার্চে শেষ হইলেও বাস্তবে কোনো কাজই হয় নাই। প্রকল্পের মাধ্যমে প্রান্তিক খামারিদের উৎপাদিত দুধ ন্যায্যমূল্যে সংগ্রহ এবং সংরক্ষণের কথা থাকিলেও স্থানীয় খামারিরা এই বিষয়ে কিছুই জানেন না। সরেজমিন পরিদর্শনের ভিত্তিতে প্রতিবেদক জানাইয়াছেন, কয়েকটি স্থানে দুধ সংগ্রহ কেন্দ্র স্থাপনের সাইনবোর্ড ঝোলানো এবং কথিত ল্যাব স্থাপনের নামে কিছু যন্ত্রপাতিও রাখা হইয়াছিল। তবে প্রতিদিন ৫০০ হইতে এক সহস্র লিটার দুধ সংগ্রহ করিবার কথা থাকিলেও এই ধরনের কোনো কার্যক্রম চালানো হয় নাই। আতিকুল্লাহ বাহার সমকালের নিকট প্রকল্পের দুই কোটি ৬১ লক্ষ টাকাই পাইয়াছেন বলিয়া স্বীকার করিয়া ত্রিশাল উপজেলার বৈলর, রাগামারা, বগারবাজার ও উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়সংলগ্ন চারটি স্থানে দুধ সংগ্রহ কেন্দ্র স্থাপন করিবার দাবি করিলেও বাস্তবে সেইগুলির কোনো অস্তিত্ব নাই। এমনকি স্থানীয় দুগ্ধ খামারিরা উক্ত প্রকল্প সম্পর্কে কিছু শোনেনও নাই বলিয়া জানাইয়াছেন।

অধিকতর উদ্বেগের বিষয় হইল, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাও প্রকল্প সম্পর্কে কিছু জানেন না দাবি করিয়া ইহার দায়দায়িত্ব সম্পূর্ণ অস্বীকার করিয়াছেন। তাঁহার মতে, প্রকল্পটি জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার মাধ্যমে সরাসরি পরিচালনা করিয়াছে প্রকল্পটির প্রধান কার্যালয়। অন্যদিকে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ ওয়াহেদুল আলম প্রতিবেদককে যাহা বলিয়াছেন তাহার সারমর্ম হইল, উক্ত বিষয়ে তিনিও কিছুই জানিতেন না; এমনকি প্রকল্পের খোঁজ লইতে অনেকবার উদ্যোক্তা বাহারকে ফোন করা হইলেও বাহার তাঁহার ফোনই গ্রহণ করেন নাই। আর ত্রিশালের দায়িত্বে থাকা উপপ্রকল্প পরিচালক হিরণ্ময় বিশ্বাস প্রতিবেদকের ফোন ধরেন নাই, খুদেবার্তারও কোনো উত্তর দেন নাই। অর্থাৎ সাইনবোর্ডসর্বস্ব উক্ত প্রকল্পের নামে জনগণের কষ্টার্জিত যেই অর্থ লোপাট হইল, তাহার দায় স্বীকারের জন্য প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে কাহাকেও পাওয়া যাইতেছে না। 

আমরা জানি, ‘প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প’ তথা এলডিডিপির অধীনস্থ প্রকল্প শুধু ত্রিশালেই গৃহীত হয় নাই, দেশের বহু স্থানে ইহার কার্যক্রম চলিয়াছে। আলোচ্য তিক্ত অভিজ্ঞতার পর প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পাশাপাশি মন্ত্রণালয়েরও দায়িত্ব হইয়া পড়িয়াছে অন্য প্রকল্পসমূহের ব্যাপারে খোঁজখবর করা। স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনিবার পাশাপাশি তছরুপকৃত অর্থ উদ্ধার করা। মনে রাখিতে হইবে, প্রতিবেদন অনুযায়ী, ত্রিশালে যিনি উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি ইতোপূর্বে উপজেলার বামনাখালী গ্রামে তাহার মামারবাড়িতে মামাকে অংশীদার দেখাইয়া গরুর খামারের শেড নির্মাণ করিয়া মোটা অঙ্কের ব্যাংক ঋণ গ্রহণ করিয়াছিলেন। পরিশোধ না করায় ঋণখেলাপি হিসাবে তাহাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হইয়াছিল। অর্থাৎ উদ্যোক্তা বাছাই করিবার প্রক্রিয়ায়ও বড়সড় ছিদ্র ছিল। অতএব অনুরূপ জালিয়াতির শিকার যে অন্য এলডিডিপি প্রকল্পও হয় নাই, তাহার নিশ্চয়তা কেহ দিতে পারে না। উপরন্তু, ভুয়া প্রকল্প দেখাইয়া অর্থ আত্মসাতের ঘটনা শুধু প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে নহে, অন্য বহু সরকারি দপ্তরে ইতোপূর্বে ঘটিয়াছে। 
 

আরও পড়ুন

×