সমকালীন প্রসঙ্গ
সংসদে বিল নিয়ে আলোচনায় অনাগ্রহ কেন
ফাইল ছবি
আবু তাহের খান
প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ | ১৯:০৮
এক কথায় বলতে গেলে বলা যায়, জাতীয় সংসদের মূল কাজ হচ্ছে আইন প্রণয়ন। আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হচ্ছে ওইসব বিল নিয়ে সংসদে আলোচনা ও বিতর্ক করা। কিন্তু লক্ষ্য করা যাচ্ছে, চলতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ কেন যেন এসব বিল নিয়ে আলোচনায় একেবারেই আগ্রহ দেখাচ্ছে না। গত ১২ মার্চ সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হওয়ার পর থেকে এর প্রথম ও দ্বিতীয় অধিবেশনে এ পর্যন্ত যতগুলো বিল উত্থাপিত ও পাস হয়েছে, অধিকাংশের ওপরই বিস্তারিত আলোচনা তো দূরের কথা, ন্যূনতম পর্যায়ের কোনো আলোচনাও হয়নি।
বাজেট সংক্রান্ত অর্থ বিল ছাড়া বাকি প্রায় সব বিলই পাস হয়েছে সম্পূর্ণ আলোচনাবিহীনভাবে। যেগুলোর ওপর আলোচনা হয়েছে, সেগুলোর বেশির ভাগেরই আলোচনার ব্যাপ্তিকাল ছিল দুই থেকে ২৯ মিনিট। প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন, সংসদ শুধু বিল নিয়ে আলোচনা থেকেই বিরত থাকছে না; অনেক জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও তাদের মনোযোগ আকর্ষণে ব্যর্থ হচ্ছে। জনগণ চাইছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ৯ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (এআরটি), বিদেশি কোম্পানির কাছে বন্দর ইজারাদান, সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তানের সামরিক জোটে বাংলাদেশের যোগদান, জ্বালানি আমদানি নীতি ইত্যাদি নিয়ে সংসদে আলোচনা হোক। কিন্তু সরকার সেদিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না।
এই যদি হয় বিলের ব্যাপারে জাতীয় সংসদের দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ, তাহলে তাকে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা তো বলা যায় না। তা ছাড়া এটি সংসদীয় ব্যবস্থার আওতাধীন সংসদ না হয়ে যদি রাষ্ট্রপতি কিংবা রাজা, বাদশাহ বা আমির শাসিত ব্যবস্থার আওতাধীন সংসদও হতো, তাহলেও তো সেখানে কোনো বিল উত্থাপিত হলে সেটি নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন হতো। কিন্তু বর্তমান জাতীয় সংসদ সেসবের ধারেকাছেও যাচ্ছে না। বিষয়টি তাহলে একটি মানহীন অকার্যকর সংসদের বৈশিষ্ট্য ও চিত্রকেই তুলে ধরছে না কি? তদুপরি যে জনগণ ভোট দিয়ে এ সংসদ গঠন করল, এটি তাদের প্রতি অবজ্ঞা, উপেক্ষা ও তাচ্ছিল্য প্রদর্শনেরও শামিল নয় কি? জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের মূল চুক্তি হচ্ছে এর সংবিধান। আর সে সংবিধানের ১৪৫(ক) অনুচ্ছেদ নিরন্তর তাগাদা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত উপরোক্ত বাণিজ্য চুক্তি রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে সংসদে উপস্থাপনের জন্য। কিন্তু সরকার এ ব্যপারে অন্তর্বর্তী সরকারের চেয়েও বেশি নিশ্চুপ।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি আয়োজিত নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনকে তিন হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয় করতে হয়েছে। আর এখন সংসদ পরিচালনায় প্রতিদিনের ব্যয় হচ্ছে প্রায় দুই লাখ টাকা। তো এর সবই প্রত্যক্ষ ব্যয়। এগুলোর সঙ্গে যুক্ত পরোক্ষ ব্যয় যোগ করা হলে এ পরিমাণ নিঃসন্দেহে আরও বড় আকার ধারণ করবে। শুনতে রূঢ় শোনালেও এটিই সত্য, এই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উভয় ব্যয়ের পুরোটারই জোগান দিতে হচ্ছে এ দেশের খেটে খাওয়া ক্ষমতাহীন দরিদ্র সাধারণ মানুষকে। অথচ সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত করের পয়সায় গঠিত এ সংসদ তাদের প্রত্যাশা কতটা পূরণ করছে?
বিল নিয়ে সংসদে যদি আলোচনা না-ই হবে, তাহলে আর সংসদের অধিবেশনগুলোকে অহেতুক প্রলম্বিত করার মাধ্যমে ব্যয় বাড়িয়ে ও সময়ের অপচয় কেন?
কোনো বিল মন্ত্রণলায় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে (বেশ কিছু কমিটি এখন পর্যন্ত গঠিতই হয়নি) না পাঠিয়ে এবং এ সংক্রান্ত কমিটিগুলোকে অন্য কোনো কাজ না দিয়ে যেহেতু এগুলোকে অকার্যকর করে রাখা হয়েছে, সেহেতু সংসদ সদস্যরাও নিজেদের মতো করে অঢেল সময় কাটানোর সুযোগ পাবেন। আর সেই সুযোগে তারা নিজেদের প্রয়োজনমতো ব্যবহারের জন্য ইতোমধ্যে যে ৫০ কোটি বরাদ্দ পেয়েছেন, সেটির দেখভালে আরও বেশি মনোযোগ দিতে পারবেন, যদিও এ বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়টি সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদের সঙ্গে পরিপূর্ণভাবে সাংঘর্ষিক।
সংসদের অধিবেশন এক-দুই দিনের মধ্যে সীমিত করে ফেলা এবং সব বিল কোনো আলোচনা ছাড়াই একযোগে হাত তুলে পাস করে ফেলার একটিই সমস্যা এবং তা হচ্ছে, এতে আমলাতন্ত্রের ওপর সরকারের নির্ভরতা আরও বেড়ে যাবে। সরকারের আমলা নির্ভরতা তো এ দেশে সেই ১৯৭২ সাল থেকেই চলে আসছে এবং দিন যত এগিয়েছে, সে নির্ভরতা হ্রাস পাওয়ার পরিবর্তে আরও জোরদার হয়েছে। তাতে ধীরে ধীরে দুর্বল হয়েছে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক-গণতান্ত্রিক চর্চা। এবং আশঙ্কা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে এ ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ অচিরেই একটি পরিপূর্ণ আমলানির্ভর ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাষ্ট্রের রূপ পরিগ্রহ করবে। কিন্তু সে রকম একটি বাংলাদেশের জন্যই কি এ দেশের মানুষ মাঠে-ঘাটে, দেশে-বিদেশে, ঝাড়ে-জঙ্গলে, নদীতে-সমুদ্রে, মরুভূমিতে এভাবে নিরন্তর পরিশ্রম করে যাচ্ছে?
সব মিলিয়ে সরকারের কাছে তাই অনুরোধ, নিয়ম-বিধি ও রীতিনীতি মেনে সংসদকে কার্যকর করুন। বিল, জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি, আন্তর্জাতিক চুক্তি ইত্যাদি নিয়ে সংসদে আলোচনা করুন, সংসদীয় কমিটিগুলোকে কার্যকর করুন এবং সর্বোপরি জন-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সংগতি রেখে সংসদীয় কার্যক্রম সুসংহত করুন। অগত্যা যদি তা করতে না-ই চান, তাহলে অন্তত জনগণের করের বোঝা লাঘব করার জন্য হলেও ওপরের প্রস্তাবমতে সংসদের অধিবেশনগুলোকে সংক্ষিপ্ত করে নিয়ে আসুন, যাতে এ অনুৎপাদনশীল সংসদের পেছনে অহেতুক অর্থ ব্যয় থেকে রাষ্ট্র রক্ষা পায়।
আবু তাহের খান: আর্থসামাজিক বিশ্লেষক