ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষকের ‘শাস্তি’ কী বার্তা দেয়

শিক্ষকের ‘শাস্তি’ কী বার্তা দেয়
×

শহিদুল ইসলাম

শহিদুল ইসলাম

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:২৯ | আপডেট: ২৩ আগস্ট ২০২৬ | ১১:০৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের বিচার বিভাগ যদি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিণত না হয়ে থাকে, তাহলে সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিছু শিক্ষকের বিরুদ্ধে যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে, তা অতি সহজেই বাতিল হয়ে যাবে বলে আমার ধারণা। কারণ তা ১৯৭৩ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক একটি বিবৃতির মাধ্যমে জাতির সামনে তা উপস্থিত করেছে। তার পুনরাবৃত্তি করা প্রয়োজন মনে করছি না।

শুধু একটি কথাই বলব, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনটি শিক্ষকদের যে কোনো রাজনৈতিক দর্শনে বিশ্বাস স্থাপন, তা প্রচার করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের যে কোনো আইনসংগত রাজনৈতিক দলের সদস্য বা সমর্থক হবার অধিকার দিয়েছে। তাই তো বর্তমান সরকারি দল বিএনপির সেন্ট্রাল কমিটির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হয়েও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য ওই পদ লাভ করেছেন। উপাচার্য যদি একটি রাজনৈতিক দলের কর্মকর্তা হতে পারেন, তাহলে শিক্ষকরা পারবেন না কেন?

এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান আইনে রাষ্ট্রপতি, যিনি সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর, তিনিও তাঁর সর্বোচ্চ শক্তিবলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক বা কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করতে পারেন না। এ বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি কেস সবার জানার জন্য পেশ করতে চাই।

প্রফেসর বদরুদ্দীন উমরের কথা সবাই জানেন। আচার্য মোনায়েম খান উপাচার্য প্রফেসর মু. শামসুল হককে নির্দেশ দিয়েছিলেন উমর সাহেবকে চাকরিচ্যুত করতে। শামসুল হক জানতেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন মেনে উমর সাহেবকে চাকরিচ্যুত করা যাবে না। এ কথা জানালে মোনায়েম খান বলেছিলেন– ‘আপনিই তাঁকে চাকরিচ্যুত করুন।’ উত্তরে উপাচার্য বলেছিলেন– বিশ্ববিদ্যালয় আইন তাঁকে সে ক্ষমতা দেয়নি। শামসুল হক উমর সাহেবকে ভীষণ পছন্দ করতেন। তিনি উমর সাহেবকে ডেকে মোনায়েম খানের কথা বলার পর উমর স্যার নিজেই চাকরি ছেড়ে ঢাকায় চলে এসেছিলেন। এ কাহিনি কমবেশি সবাই জানেন। পাকিস্তান আমলেও সর্বশক্তিমান চ্যান্সেলর মোনায়েম খানের পক্ষে সম্ভব হয়নি বদরুদ্দীন উমরকে চাকরিচ্যুত করা।

এর চেয়েও ভয়াবহ ঘটনার জন্ম দিয়েছিলেন ১৯৮৩ সালে রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলর হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তিনি আরবি বিভাগের অধ্যাপক মুজিবুর রহমানকে কোনো এক কারণে চাকরিচ্যুত করেছিলেন ৯২(ক) ধারা প্রয়োগ করে। কিন্তু ১৯৭৩ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী তাঁর সে অধিকার ছিল না। তাই শিক্ষক সমিতির কার্যকরী পর্ষদ সঙ্গে সঙ্গে তার প্রতিবাদ করে অধ্যাপক মুজিবুর রহমানকে স্বপদে পুনর্বহালের দাবি জানায় এবং তিন দিন পর শিক্ষক সমিতির জরুরি সাধারণ সভা আহ্বান করে। 

এখানে আরেকটি কথাও উল্লেখ করা প্রয়োজন। ১৯৭৯ সালে ইসলামপন্থি বলে পরিচিত এক দল শিক্ষক উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল বারি সাহেবের পরোক্ষ সমর্থনে মূল শিক্ষক সমিতি থেকে বের হয়ে আলাদা শিক্ষক সমিতি গড়ে তোলেন। তারা সমিতির বার্ষিক ১২ টাকা চাঁদা দেওয়া বন্ধ করে দেন। মূল শিক্ষক সমিতির সাধারণ সভায় যোগদান থেকেও তারা বিরত থাকতেন।

অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের অপসারণের খবর পেয়ে ওই দলটি শহীদুল্লাহ কলা ভবনের ১৫০ নম্বর কক্ষে সাধারণ সভা আহ্বান করে। কিন্তু সন্ধ্যা পর্যন্ত তাদের কোরাম না হওয়ায় নেতৃবৃন্দ সন্ধ্যার পর জুবেরী ভবনে আসেন এবং অধ্যাপক এফ আর খান ও আমাকে ডেকে নিয়ে একসঙ্গে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের প্রস্তাব দেন। আমরা দুজন তখন শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। ’৮৩ সালে বারি সাহেব বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলেন না। তারা আবার মূল শিক্ষক সমিতিতে ফিরে এলেন এবং তিন দিন পরের সাধারণ সভায় যোগদান করে একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এক পর্যায়ে শিক্ষকরা ক্লাস নেওয়া বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। এক মাস তিন দিন পর রাষ্ট্রপতি তাঁর আদেশ প্রত্যাহার করেন এবং অধ্যাপক মুজিবুর রহমান পুনরায় বিভাগে যোগ দেন। সেদিনের জয়লাভের পেছনের শক্তি ছিল ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় আইন ও শিক্ষকদের ঐক্য।

দুঃখজনক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকরা আজ দলগতভাবে তাদের সহকর্মী শিক্ষকদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। আমাদের সময়ও শিক্ষকরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থক ছিলেন এবং বিভিন্ন নির্বাচনে পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেন। উল্লেখ্য, অধ্যাপক মুজিবুর রহমান ইসলামী গ্রুপের সদস্য ছিলেন। তাই ইসলামী ছাত্রশিবির তাঁর প্রতি অনেকটাই নমনীয় ছিল। তারপরও সব শিক্ষক তৎকালীন রাষ্ট্রপতির বেআইনি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন।

নির্বাচন বা গণঅভ্যুত্থান যেভাবেই ঘটুক, রাজনৈতিক পট পরিবর্তন একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। কিন্তু এর পরিপ্রেক্ষিতে ভিন্নমত দমন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকোচনের নীতি এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষক সমাজের মধ্যে যে আতঙ্ক, ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতার সংস্কৃতি সৃষ্টি করা হলো; ভবিষ্যতের জন্য তা একটি অশুভ দৃষ্টান্ত হিসেবে থেকে যাবে।

শহিদুল ইসলাম: সাবেক অধ্যাপক, 
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
 

আরও পড়ুন

×