অন্যদৃষ্টি
অর্থবছর পরিবর্তনের লাভ-ক্ষতি
শেখ আশরাফুজ্জামান
প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ | ১০:৫৭
বাংলাদেশে দীর্ঘকাল অর্থবছর ১ জুলাই থেকে পরবর্তী বছর ৩০ জুন পর্যন্ত পরিচালিত হয়ে আসছে। হঠাৎ অর্থবছর ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ করার সিদ্ধান্ত নিছক একটি তারিখ পরিবর্তনের বিষয় নয়। এর সঙ্গে রাষ্ট্রের বাজেট প্রণয়ন, রাজস্ব আহরণ, সরকারি ব্যয়, উন্নয়ন প্রকল্প, হিসাবরক্ষণ, অডিট, কর নির্ধারণ, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন এবং জাতীয় অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান ইত্যাদির সঙ্গে যুক্ত। সুতরাং এমন মৌলিক পরিবর্তন করতে হবে চিন্তাভাবনা করেই।
সরকারের ২০২৬-২৭ বাজেট সংক্রান্ত নথিপত্রেও বর্তমান অর্থবছর কাঠামো অনুযায়ী বাজেট প্রণয়ন ও মধ্যমেয়াদি বাজেট পরিকল্পনা করা হয়েছে। ফলে অর্থবছরের কাঠামো পরিবর্তন মানে শুধু পরবর্তী বাজেটের তারিখ পরিবর্তন নয়; বরং চলমান আর্থিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর একটি বড় পুনর্বিন্যাস।
অর্থবছর পরিবর্তনের পেছনে অবশ্যই সুস্পষ্ট অর্থনৈতিক যুক্তি থাকতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন অর্থবছর প্রচলিত। কিন্তু কোনো দেশের জন্য কোন সময়টা সবচেয়ে কার্যকর হবে তা নির্ভর করে তার রাজস্ব আহরণের সময়সূচি, কৃষি ও শিল্প উৎপাদনের মৌসুম, সরকারি ব্যয়ের ধরন, বৈদেশিক বাণিজ্য, ব্যবসায়িক হিসাবচক্র এবং অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ওপর। শুধু অন্য কোনো দেশের অর্থবছরের সঙ্গে সামঞ্জস্য করার জন্য বাংলাদেশে অর্থবছর পরিবর্তন করা হলে সেটি যথেষ্ট কারণ হতে পারে না।
বর্তমান ব্যবস্থায় মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো একটি নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুসরণ করে বাজেট প্রাক্কলন ও বাস্তবায়ন করে। অর্থবছরের সময় পরিবর্তন করলে বাজেট প্রণয়ন, সংশোধিত বাজেট, মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো, উন্নয়ন বাজেট– সবকিছুর সময়সূচি নতুন করে সাজাতে হবে।
বিশেষ করে এডিপির ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে মোট বাজেট ব্যয়ের বাস্তবায়ন ছিল প্রায় ৬০ শতাংশ এবং এডিপি বাস্তবায়ন ছিল মাত্র ৪০.৭ শতাংশ। যেখানে বিদ্যমান কাঠামোতেই উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নের বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে, সেখানে হঠাৎ অর্থবছরের সময় পরিবর্তন করলে প্রশাসনিক সক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থবছর পরিবর্তনের সঙ্গে করবর্ষ ও রাজস্ব প্রশাসনের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আয়কর, ভ্যাট, কাস্টমস, উৎসে কর, অগ্রিম কর, কর রিটার্ন, কর নিরীক্ষা– সবকিছুর সময়সূচি পুনর্নির্ধারণ করতে হবে।
বাংলাদেশের অধিকাংশ কোম্পানি ৩০ জুন বা ৩১ ডিসেম্বর তারিখে তাদের আর্থিক হিসাব বন্ধ করে থাকে। অর্থবছর পরিবর্তনের ফলে সরকারি অর্থবছর এবং কোম্পানির আর্থিক বছর– এই দুইয়ের মধ্যে সামঞ্জস্যের নতুন প্রশ্ন তৈরি হবে। কোম্পানিকে কি ৩১ মার্চে হিসাব বন্ধ করতে বাধ্য করা হবে? নাকি কোম্পানি তার নিজস্ব অ্যাকাউন্টিং ইয়ার বজায় রাখবে? যদি ৩১ মার্চকে নতুন সরকারি অর্থবছরের শেষ তারিখ করা হয়, তাহলে সমন্বয় কীভাবে হবে? এই প্রশ্নগুলোর আগে সমাধান না করে সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হলে ব্যবসায়ীদের কমপ্লায়েন্স কস্ট উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতা– রাজস্ব আহরণের চাপ, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের দুর্বলতা– সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে এখন সরকারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীলতা, পূর্বানুমেয়তা ও দক্ষতা বৃদ্ধি করা। এই সময়ে অর্থবছরের মতো একটি মৌলিক কাঠামোর পরিবর্তন যদি পরিকল্পনা ও মূল্যায়ন ছাড়া করা হয়, তাহলে সেটি কাঙ্ক্ষিত সংস্কারের পরিবর্তে প্রশাসনিক ও ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা বাড়াতে পারে।
অর্থবছর পরিবর্তনের বিরুদ্ধে আপত্তি নয়। আপত্তি হলো কেন পরিবর্তন, কী লাভ, কী খরচ, কী ঝুঁকি– এসব প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে পরিবর্তন করা। সরকার চাইলে অর্থবছর পরিবর্তন করতেই পারে। তার আগে জনগণ, ব্যবসায়ী সমাজ এবং পেশাজীবীদের সামনে একটি পরিষ্কার হিসাব দেওয়া উচিত। বর্তমান ব্যবস্থার সমস্যা কী; নতুন ব্যবস্থার সুবিধা কী; পরিবর্তনের অর্থনৈতিক মূল্য কত এবং এ পরিবর্তনের ঝুঁকি কে বহন করবে?
শেখ আশরাফুজ্জামান, এফসিএ: চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি