ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সন্তান হত্যা

মাতৃত্বের মহিমা বনাম মানসিক সংকট

মাতৃত্বের মহিমা বনাম মানসিক সংকট
×

প্রতীকী ছবি

দীপা দত্ত

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ | ১০:৫৯

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার মীরওয়ারিশপুর ইউনিয়নে গত ১৭ আগস্ট ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা আমাদের হৃদয়কে বিদীর্ণ করেছে। মাত্র ১৪ দিন বয়সী নবজাতককে ঘরের ভেতর বৃষ্টির পানি জমিয়ে রাখা একটি প্লাস্টিকের ড্রামে চুবিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এই নিষ্ঠুর ও নির্মম অপরাধের দায়ে পুলিশ ১৯ বছর বয়সী মা ফাতেমা বেগমকে গ্রেপ্তার করেছে। ঘটনার পর সংবাদমাধ্যমে মায়ের যে অবয়ব দেখা গেছে, তা স্বাভাবিক যে কোনো অপরাধীর চেয়ে একদম আলাদা। তাঁর চোখে অপরাধবোধ নয়, ছিল শূন্য দৃষ্টি। তিনি যেন এই পৃথিবীর বাস্তবতার সঙ্গে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন।
সন্তান নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে ফাতেমা অসংলগ্ন আচরণ করতে থাকেন। তিনি কখনও দাবি করেন, কেউ তাঁর মাথায় আঘাত করে সন্তানকে নিয়ে গেছে; আবার কখনও বলেন, তাঁর শিশুকে ‘জিনে’ নিয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত পুলিশের কাছে তিনি স্বীকার করেন, জন্মের পর থেকে শিশুটি অতিরিক্ত কান্নাকাটি করত; তাঁকে একটুও ঘুমাতে দিত না। টানা ১৪ দিন চোখের পাতা এক করতে না পেরে তীব্র ক্ষোভ, ক্লান্তি আর মানসিক ভারসাম্যহীনতা থেকে তিনি এই কাণ্ড ঘটিয়েছেন।

নিষ্পাপ শিশুর এমন অকাল ও নিষ্ঠুর মৃত্যু কাম্য নয়। কোনো যুক্তি বা পরিস্থিতি দিয়েই শিশুর জীবন কেড়ে নেওয়াকে সমর্থন করা যায় না। একই সঙ্গে এই ট্র্যাজেডির পেছনে লুকিয়ে থাকা মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণগুলো এড়িয়ে গেলে আমরা সমস্যার গভীরে পৌঁছাতে পারব না। এটি শুধু বিচ্ছিন্ন ফৌজদারি অপরাধ নয়, বরং আমাদের পারিবারিক কাঠামো ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক উদাসীনতার চিত্র।

আমাদের সমাজব্যবস্থায় মাতৃত্বকে সবসময় অতিপ্রাকৃতিক ও মহিমান্বিত রূপ দেওয়া হয়। সেই মহিমার নিচে চাপা পড়ে যায় মানুষের স্বাভাবিক বেঁচে থাকার আকুতি। ‘মা’ মানেই অসীম ধৈর্য, ‘মা’ মানেই নিজের সব কষ্ট চেপে রেখে সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর এক অতিমানবী– এ ধারণা আমরা যুগ যুগ ধরে লালন করছি। কিন্তু সন্তান গর্ভে ধারণ এবং প্রসবের পর একজন নারীর শরীর ও মনে যে কত বড় পরিবর্তন আসে, তা নিয়ে কোনো বাস্তবসম্মত আলোচনা হয় না। একটি শিশু জন্ম নেওয়ার পর পরিবারের সবার মনোযোগ গিয়ে পড়ে নবজাতকের ওপর। শিশুটি ঠিকমতো খাচ্ছে কিনা, ঘুমাচ্ছে কিনা, তার ওজন বাড়ছে কিনা– সবাই এসব নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। অথচ যে মা নিজের জীবন বাজি রেখে সন্তান জন্ম দিলেন, তাঁর শারীরিক ও মানসিক অবস্থা কেমন, সেই খোঁজ নেওয়ার মানুষ খুব কম থাকে। প্রসব-পরবর্তী সময়ে একজন মায়ের জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টি ও বিশ্রামের পাশাপাশি যে মানসিক সমর্থন প্রয়োজন, তা বেশির ভাগ পরিবারেই উপেক্ষিত।

কেউ যখন টানা ১৪ দিন ঘুমাতে পারে না, তখন বাস্তব আর স্বপ্নের ভেতরের দেয়াল চুরমার হয়ে যায়। মস্তিষ্কের কোষগুলো তখন আর যুক্তি বোঝে না। চোখের সামনে তখন মেঘ জমে, কুয়াশা জমে। সেই কুয়াশায় ঘেরা মস্তিষ্ক হয়তো তখন নিজের সন্তানকে সন্তান হিসেবে দেখে না। হয়তো অন্য কোনো ভয়াবহ অবয়ব দেখে। হয়তো মনে করে, এই কান্নার আওয়াজ থেকে মুক্তি পাওয়ার একটাই উপায়– সবকিছু শান্ত করে দেওয়া।

আইনের চোখে এই শিশুহত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার হওয়া আবশ্যক। তবে অপরাধীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর পাশাপাশি আমাদের সেই পরিবেশটিরও বিচার করতে হবে, যা একজন মাকে এমন চরম পর্যায়ে নিয়ে গেল। এই মা নিজেও একজন ভুক্তভোগী, যিনি তাঁর অসুস্থ মস্তিষ্কের শিকার। তাই শাস্তির পাশাপাশি তাঁর মনস্তাত্ত্বিক মূল্যায়ন এবং সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি।

এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে হলে আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আমূল পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। প্রসব-পরবর্তী মানসিক সমস্যা কোনো কাল্পনিক বিষয় বা নাটক নয়, বরং এটি এক গুরুতর হরমোনাল ও নিউরোলজিক্যাল সমস্যা– এই সত্য পরিবারকে মেনে নিতে হবে। গর্ভাবস্থা থেকেই মা এবং তাঁর স্বামীকে এ বিষয়ে কাউন্সেলিং করা উচিত। সন্তান জন্ম দেওয়া এবং তাকে বড় করার দায়িত্ব কেবল মায়ের একার নয়। এটি স্বামী ও স্ত্রীর যৌথ দায়িত্ব। 

পানির ড্রামে ডুবে যাওয়া নিষ্পাপ শিশুকে আমরা যেমন বাঁচাতে পারিনি, তেমনি তার মায়ের ভেতরে জমে ওঠা তীব্র মানসিক হাহাকার ও অসুস্থতাকেও সময়মতো চিহ্নিত করতে পারিনি। পরিবার যদি সময়মতো সেই মায়ের পাশে দাঁড়াত; তাঁকে একটু বিশ্রামের সুযোগ করে দিত এবং ন্যূনতম সহানুভূতি দেখাত, তবে হয়তো এই নির্মম ঘটনা আমাদের দেখতে হতো না।  মাতৃত্বের এই দেবীর আসন থেকে নামিয়ে মায়েদের একটু সাধারণ মানুষ হিসেবে ভাবি। রক্ত-মাংসের মানুষ, যার পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেলে সেও ভেঙে পড়ে। 

দীপা দত্ত: সংবাদকর্মী

আরও পড়ুন

×