তৃতীয় মেরু
গঙ্গা ব্যারাজের নথি নিয়ে গোপনীয়তার হেতু কী
শেখ রোকন
শেখ রোকন
প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ | ১১:০২ | আপডেট: ২৪ আগস্ট ২০২৬ | ১১:০৩
শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্ক (বেন) আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় রিভারাইন পিপলের পক্ষে যোগ দিয়েছিলাম আলোচক হিসেবে। বহুল আলোচিত গঙ্গা বা পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প নিয়ে সাম্প্রতিক আয়োজনগুলোর মধ্যে এ সভার বিশেষত্ব ছিল, আয়োজকরা চেষ্টা করেছেন বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মতের মানুষকে যথাসম্ভব অভিন্ন টেবিলে আনতে। বেসরকারি পর্যায়ের প্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে তারা সফল হলেও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো দৃশ্যত সাড়া দেয়নি। প্রকল্পটি প্রণয়নকালে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তার মধ্যে যে তিন-চারজন সভায় যোগ দিয়েছিলেন, তারাও বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত।
প্রশ্ন অবশ্য অন্যত্র। গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্প নিয়ে বিশেষজ্ঞ, অধ্যাপক, গবেষকদের মধ্যে যে মতভিন্নতা বা মতৈক্য, সেটা কীসের ভিত্তিতে? কারণ হালে ‘পদ্মা ব্যারাজ’ নামে সরকারি নথিপত্রে পরিচিতি পাওয়া ছয় দশক পুরোনো এই প্রকল্পের হালনাগাদ নথিপত্র কার্যত আলোচকদের কারও কাছে ছিল না। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপকদ্বয় জাপানভিত্তিক এশীয় প্রবৃদ্ধি গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. মো. খালেকুজ্জামানও স্বীকার করলেন, তাদের বিশ্লেষণ মূলত ব্যারাজটির ‘সর্বশেষ’ সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষার ‘এক্সিকিউটিভ সামারি’ পর্যালোচনার ভিত্তিতে প্রস্তুত। বিশেষজ্ঞ আলোচকদেরও বেশিরভাগ স্বীকার করলেন, তারা সেই নির্বাহী সারসংক্ষেপও দেখেননি। তাহলে প্রকল্পটি নিয়ে এত আলোচনা-পর্যালোচনা হচ্ছে কীসের ভিত্তিতে?
দুই.
চলতি বছরের ১৩ মে ‘একনেক’-জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় ‘পদ্মা ব্যারাজ’ প্রকল্প অনুমোদিত হওয়ার পর আমরা অনেকেই দাবি তুলেছিলাম, প্রকল্পটির নথিপত্র আলোচনা-পর্যালোচনার জন্য উন্মুক্ত করা হোক। তাহলে বিশেষজ্ঞরা তথ্যসমৃদ্ধ মতামত দিতে পারবেন। অন্যথায় যা কিছু আলোচনা, সবই হবে কার্যত অনুমাননির্ভর। তাতে লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি।
ওই সময় সমকালেই প্রকাশিত এক নিবন্ধে ‘অতীব গোপনীয়তার বিপদ’ সম্পর্কে সতর্ক করে লিখেছিলাম, “দেশের শীর্ষস্থানীয় একজন নদী বিশেষজ্ঞ আমাকে বলেছেন, তিনিও গঙ্গা ব্যারাজের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন বা বিস্তারিত প্রকল্প পরিকল্পনার নথি দেখেননি। প্রশ্ন হচ্ছে, গঙ্গা ব্যারাজ সংক্রান্ত নথিপত্র যেভাবে ‘অতীব গোপনীয়’ করে রাখা হয়েছে, তাতে কার লাভ হচ্ছে? গঙ্গা বা পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের নথিগুলো বরং দেশীয় বিশেষজ্ঞ বা বুদ্ধিজীবী, এমনকি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দিলে খোলামেলা আলোচনা ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে প্রকৃত পরিস্থিতি ও প্রয়োজন স্পষ্ট হতো। বিপুল অর্থ ব্যয়ে বিস্তীর্ণ ঝুঁকির এই প্রকল্প নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠাও সহজ হতো” (গঙ্গা ব্যারাজ: কারিগরি বিধান এবং কূটনৈতিক বিধেয়, ১৮ মে ২০২৬)।

তিন মাস পরও পরিস্থিতি তথৈবচ। ইতোমধ্যে প্রকল্পটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওয়েবসাইটে ২০২৬ সালের জুলাই মাস থেকে ‘চলমান’ হিসেবে তালিকাভুক্তও হয়েছে। চলতি অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে এ প্রকল্পের জন্য অর্থ বরাদ্দও হয়েছে, ধারণা করা যায়। কারণ খোদ অর্থমন্ত্রী তাঁর বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন– ‘দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে মেগাপ্রকল্প পদ্মা ব্যারাজ। আগামী ৭ বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে’ (সমকাল, ১১ জুন ২০২৬)। কিন্তু গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন কিংবা বিস্তারিত প্রকল্প প্রস্তাবের নথিপত্র নিয়ে এখনও নজিরবিহীন গোপনীয়তা রক্ষা করা হচ্ছে।
তিন মাস আগের নিবন্ধে দেশের যে শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞের কথা লিখেছিলাম, বর্তমান নিবন্ধ লেখার সময় তাঁর কাছে আবারও জানতে চেয়েছি নথিপত্র পেয়েছেন কিনা? উত্তরে যা বললেন, সেটা আরও হতাশাজনক। স্বয়ং মন্ত্রী মৌখিকভাবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়ার পরও সেই নথি এখনও ওই বিশেষজ্ঞের কাছে পৌঁছেনি।
এর মানে এই নয়, প্রকল্পটির নথিপত্র সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের বাইরে কারও কাছেই পৌঁছায়নি। অন্তত সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষার নির্বাহী সারসংক্ষেপ যে বেসরকারি পর্যায়েও কেউ কেউ পেয়েছেন বা সংগ্রহ করতে পেরেছেন, এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই। তাহলে এই অহেতুক গোপনীয়তার অর্থ কী? অতীতে দেখা গেছে, এ ধরনের নথি দেশের ভেতরে ও বাইরে যাদের লাভবান করতে পারে, তাদের হাতে ঠিকই পৌঁছে যায়। গঙ্গা বা পদ্মা ব্যারাজের নথিপত্রের ক্ষেত্রেও যে একই ঘটনা ঘটেনি, সেই নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে?
বাপা-বেনের মতবিনিময় সভায় দুটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের অন্তত দুজন অবসরপ্রাপ্ত শীর্ষ কর্মকর্তা বললেন, গঙ্গা বা পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের নথিপত্র প্রণয়নে তারা যুক্ত ছিলেন এবং এগুলো জাতীয় স্বার্থ ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড রক্ষা করে প্রণীত। এমনকি দেশে এ পর্যন্ত যত মেগাপ্রকল্প প্রণীত হয়েছে, এই ব্যারাজের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রক্রিয়া সেগুলো থেকে অনেক অগ্রসর। ষাটের দশক থেকে যেহেতু দফায় দফায় সম্ভাব্যতা যাচাই হয়েছে এবং তাতে অনেক দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও বিশেষজ্ঞ জড়িত ছিলেন; এ প্রকল্পের মান ও উৎকর্ষ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। এমন বক্তব্য আসলে আরও মৌলিক প্রশ্নের অবতারণা করে; প্রকল্পটি যদি এতই সুচারু হবে, এর নথিপত্র নিয়ে এত গোপনীয়তার হেতু কী?
তিন.
এটা সত্য, গঙ্গা বা পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের সঙ্গে কেবল কারিগরি ও প্রতিবেশগত বিষয় নয়; ভূ-রাজনৈতিক বিষয়ও জড়িত শুরু থেকেই। দেখা যায়, ১৯৬২-৬৩ সালে প্রথম জরিপটি হয়েছিল তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের পক্ষে। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৩, ১৯৬৯, ১৯৮৪, ১৯৮৯ সালে যেসব সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা হয়, তাতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফরাসি প্রতিষ্ঠান ও বিশেষজ্ঞরা জড়িত ছিলেন। ২০০২ ও ২০১০ সালে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যেমে প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই ও সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষায় রাজবাড়ীর পাংশ ও পাবনার সুজানগর ব্যারাজের দুই প্রান্ত হিসেবে চূড়ান্ত হলেও ‘ভূ-রাজনৈতিক বিবেচনায়’ ২০১৪ সালে ভারতকে প্রকল্পের সারসংক্ষেপ হস্তান্তর করা হয়। ২০১৫ সালের জুন মাসে তৎকালীন পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ জাতীয় সংসদে বলেন, ভারতের সহযোগিতায় গঙ্গা ব্যারাজ করতে হবে। কিন্তু ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঢাকা সফরে পানিসম্পদ খাতে আগ্রহ ব্যক্তর পর সেই উদ্যোগে ভাটা পড়ে। আবার ২০১৭ সালের এপ্রিলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর থেকে ফিরে গঙ্গা ব্যারাজের ‘ভুল সমীক্ষা ও ডিজাইন’ নাকচ করার কথা বলেন। ২০১৭ সালে চীনের পাশাপাশি জাপানও ব্যারাজ প্রকল্পে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করে। অন্যদিকে ২০১৮ সালে নেদারল্যান্ডসের কারিগরি সহায়তায় প্রণীত ও চূড়ান্ত ব-দ্বীপ পরিকল্পনাতে গঙ্গা ব্যরাজ প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সর্বশেষ ২০২১ সালের মার্চ মাসে তৎকালীন পানিসম্পদ সচিব ভারত সফর শেষে দেশে ফিরে বলেন, গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্প ভারতের সঙ্গে যৌথভাবে হবে।
প্রকল্পটির দীর্ঘ ইতিহাসের নাতিদীর্ঘ বর্ণনায় দেখা যাচ্ছে, ব্যারাজটি নিয়ে ভূ-রাজনৈতিকভাবে বিভিন্ন পক্ষের আগ্রহ কেবল নয়; প্রতিযোগিতাও রয়েছে। আর বাংলাদেশের মতো দেশের ক্ষেত্রে এ ধরনের ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা সামলানোরও প্রায় অব্যর্থ অস্ত্র হচ্ছে নথিপত্র ‘পাবলিক’ করে দেওয়া। এর মধ্য দিয়ে যেসব মহল গোপনে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করতে চায়, তাদের উদ্দেশ্য ভেস্তে যায়। উপরন্তু জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল মেগা প্রকল্প নিয়ে অনুমাননির্ভর পক্ষ-বিপক্ষ বিতর্কের বদলে তথ্যনির্ভর আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠাও সহজ হবে।
শেখ রোকন: লেখক ও নদী গবেষক
[email protected]
- বিষয় :
- শেখ রোকন