জন্মদিন
ইনাম আল হকের পাখির ডানা
মহসিনুল হক
প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:১৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
পৃথিবীর সাত মহাদেশের বুকে পায়ের চিহ্ন এঁকেছেন। পাখির ডানায় স্বপ্ন দেখেছেন। মরুভূমি থেকে বরফের রাজ্য পর্যন্ত নিজের কৌতূহল আর প্রকৃতিপ্রেমকে সঙ্গী করেছেন। তিনি ইনাম আল হক। আজ তিনি ৮২ বছরে পা রাখলেন।
তিনি পাখি বিশেষজ্ঞ-অভিযাত্রী-আলোকচিত্রী। কিন্তু এসব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে তিনি এক নিসর্গসন্তান, মানবতার আবহমান পথিক। তাঁর জীবন কেবল সময়ের গতিপথ নয়; বরং এক উদার অন্বেষার আখ্যান। তিনি এখনও ছুটে চলেন বছরের অনেকটা সময়জুড়ে। যেন কোনো অদৃশ্য ডাক তাঁকে টানে। সেই টানে তাঁর ছুটে চলা।
ইনাম আল হকের সঙ্গে পরিচয় ২০২৪ সালে। সূত্র ভ্রমণ যুবরাজ তারেক অণু। সে সময় অ্যান্টার্কটিকা যাওয়ার স্বপ্ন কেবল অঙ্কুরিত! অজানা কোনো স্বপ্নের মতো! সেই স্বপ্নকে বাস্তবের মাটিতে নামাতে গিয়ে বাংলাদেশ থেকে প্রথম অ্যান্টার্কটিকা অভিযাত্রী ইনাম আল হকের সঙ্গে সরাসরি পরিচয়। বার্ড ক্লাবে তাঁকে দেখেছি দূর থেকে। তবে ডিসেম্বর ২০২৪-এ একই জাহাজে ২১ দিন একসঙ্গে কাটানোর সুযোগ হয়েছিল। সেই যাত্রা আমার কাছে হয়ে ওঠে শিক্ষার মহাকাব্য।
ওই ২১ দিনে আমি যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি শেখার চেষ্টা করেছিলাম, তা হলো বিনয়। মানুষ কী পরিমাণ বিনয়ী হতে পারে; যারা তাঁর সংস্পর্শে এসেছেন, তারাই জানেন। ছোটবেলা থেকে তিনি শিখেছেন পৃথিবীকে দেখতে, মানুষকে দেখতে, আর নিজেকে দেখতে। ঠিক যেন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখা। কিন্তু কখনও আত্মমুগ্ধ নন; বরং অন্যকে বুঝতে শিখেছেন।
ইনাম আল হকের আরেকটি অধ্যায় আমি লক্ষ্য করেছি, যা হয়তো অনেকের অজানা। এই জীবনে তিনি কখনও কারও নিন্দা করেছেন বলে মনে হয় না। কাউকে গালি দেওয়া তাঁর চরিত্রের মধ্যে পড়ে না। কারও সম্পর্কে বিরূপ সমালোচনাও আমি শুনিনি। এত দীর্ঘ জীবনে তাঁর মুখ দিয়ে একটি বাজে শব্দ বা গালি বেরিয়েছে– এমন দৃষ্টান্ত কেউ দেখাতে পারবেন বলে আমার মনে হয় না। যে কোনো বয়সী মানুষ এবং শিশু ও নারীর প্রতি তাঁর রয়েছে অপরিসীম শ্রদ্ধা।
একদম ছোটবেলা থেকে তিনি মানুষ-প্রকৃতি এবং প্রকৃতির সকল সৃষ্টিকে অকৃত্রিমভাবে ভালোবেসে যাচ্ছেন। তিনি ভালোবেসেছেন পশু-পাখি, গাছপালা, নদী-পাহাড়, এমনকি শূন্য মরুভূমিকেও। কারণ তিনি জানেন, এই বিশ্বের প্রতিটি সৃষ্টির মধ্যেই আছে এক অনন্য সৌন্দর্য, অমোঘ বার্তা।
আজকের তরুণ প্রজন্ম ইনাম আল হকের কাছে যদি কিছু পেতে চায়, তবে তা হলো এই একটি শিক্ষা– ‘বিনয়’। একজন মানুষ বিনয়ী হলে তিনি সহনশীল হবেন এবং তাঁর মাঝে থাকবে পৃথিবীর সকলের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা।
আমরা সমবেত কণ্ঠে প্রার্থনা জানাই– ইনাম আল হক শতায়ু হোন। তাঁর থাকুক আলোর মতোই অফুরন্ত প্রাণশক্তি। তিনি যেন আমাদের মাঝে বেঁচে থাকেন এক জীবন্ত কিংবদন্তি হিসেবে। যাঁর দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই আলো কেবল দূরের কোনো নক্ষত্র নয়। আলো থাকতে পারে এক মানুষের হৃদয়েও।
ইনাম আল হকের পথচলা অম্লান হোক; তাঁর দৃষ্টি হোক আরও প্রখর। তাঁর আপনার অস্তিত্ব হোক আমাদের জন্য প্রেরণার প্রদীপ। জন্মদিনে তাঁকে শুভেচ্ছা জানাই।
মহসিনুল হক: প্রাবন্ধিক ও সাহিত্য আলোচক
- বিষয় :
- জন্মদিন