ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সংস্কৃতি কার, সিদ্ধান্ত নেবে কে?

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সংস্কৃতি কার, সিদ্ধান্ত নেবে কে?
×

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:২০ | আপডেট: ২৫ আগস্ট ২০২৬ | ১০:১০

| প্রিন্ট সংস্করণ

সাধারণ মানুষের মন্তব্য ব্যক্তিগত মত, একই মন্তব্য মন্ত্রীর মুখে উঠলে সরকারের নীতির ইঙ্গিত হয়ে ওঠে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলাকাটা এ রকম যে, গান-বাজনা-সিনেমা বহু বছর ধরে তাদের মধ্যে নিষিদ্ধের মতো আরকি। ওখানকার পরিস্থিতি আলাদা’ (ইত্তেফাক, ২২ আগস্ট ২০২৬)। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন মন্তব্য নিছক আঞ্চলিক সংস্কৃতির বর্ণনায় সীমিত থাকে না; সংস্কৃতির রাজনীতি এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণের বিষয়কেও সামনে নিয়ে আসে। প্রশ্নও ওঠে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গান-বাজনা বা সংস্কৃতিচর্চা নিষিদ্ধ কে করেছে? ‘বহু বছর’ বলতে তিনি কোন সময়কে বোঝাতে চাইছেন?
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পর প্রশ্ন জাগে– ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ কি নিজেদের বিশেষ সংস্কৃতি অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে! মন্ত্রী বরং নিজেই যেন সেই নৈতিক অনুমোদন দিলেন!

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সংস্কৃতিকে ‘বিচ্ছিন্ন’ আখ্যা দেওয়ার চেষ্টায় মনে হলো, রাষ্ট্র এখন নাগরিকের সংস্কৃতিচর্চার পরিসর নিশ্চিত করার চেয়ে মানুষের রুচি নির্ধারণে ব্যাকুল। অথচ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কেউ গান শুনবেন, কেউ শুনবেন না; কেউ সিনেমা দেখবেন, কেউ দেখবেন না– এই বহুত্বই স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হওয়ার কথা। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অন্যের অধিকার লঙ্ঘন না করে মানুষ নিজের সাংস্কৃতিক পছন্দের চর্চা করতে পারে। 

যেমন সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশ লাইন্সের অনুষ্ঠানে উচ্চ স্বরে গান বাজানোর ঘটনা পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে বিঘ্ন ঘটাচ্ছিল। এই ঘটনা শুনে প্রথমেই মনে হবে, এটা অন্যায়। শব্দদূষণ করে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ নষ্ট করার অধিকার কারও নেই। কিন্তু ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের দাবির প্রথমটি বলে দিল, শুধু উচ্চশব্দই একমাত্র প্রসঙ্গ নয়। ১৮ আগস্ট রাতের ঘটনার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রশাসন আলোচনা করতে চেয়েছে। ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদ’ বেশ কয়েকটি দাবি জানিয়েছে তখন। সেখানে হামলাকারীর শাস্তি, আহতদের ক্ষতিপূরণের মতো বিষয় থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু তাদের প্রথম দাবি, ভবিষ্যতে পুলিশ লাইন্সে গান না বাজানোর লিখিত প্রতিশ্রুতি দিতে হবে এবং এসপিকে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। এই দুটি শর্ত কী বার্তা বহন করে, পাঠক নিজেই ভেবে নেবেন। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে ইঙ্গিত মিলতে পারে, কার রুচি রাষ্ট্রের রুচি হয়ে উঠবে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সম্প্রতি বিভিন্ন অজুহাতে সংস্কৃতিচর্চা ও ঐতিহ্যে আঘাত এসেছে। দুই দফায় সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতাঙ্গনে (ওস্তাদ আলাউদ্দিন একাডেমি বা স্মৃতি জাদুঘর) ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে একজন মাদ্রাসাছাত্রের মৃত্যুর খবরকে কেন্দ্র করে ঘটে প্রথম হামলার ঘটনা। ২০২১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের প্রতিবাদে হেফাজতে ইসলামের বিক্ষোভ কর্মসূচি চলাকালে নতুন করে নির্মিত সেই সংগীতাঙ্গনে আবারও হামলা হয়। যেন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর স্মৃতি ধ্বংস করতে পারলেই তাদের বার্তা পৌঁছে দেওয়া যাবে। বিশ্ববিখ্যাত সেই সঙ্গীতজ্ঞের সুর যেন পৌঁছাতে পারেনি তাঁর নিজের জন্মস্থানে। 

বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতির সমৃদ্ধ মাধ্যম পুতুলনাচের আঁতুড়ঘর ব্রাহ্মণবাড়িয়া। কৃষ্ণনগর, কাজীপাড়া ও নবীনগর এলাকায় ঐতিহ্যগতভাবে অনেক পুরোনো ও বিখ্যাত পুতুলনাচের দল রয়েছে। এই ব্রাহ্মণবাড়িয়ারই ধন মিয়ার ‘রয়েল বীণা অপেরা’ দেশজুড়ে নাম করেছিল। যাত্রাশিল্পী থেকে সার্কাস দলের শিল্পী– এ বিনোদন শিল্পের বিখ্যাত অনেকেরই জন্মস্থান ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। 

‘তিতাস একটি নদীর নাম’ গ্রন্থের রচয়িতা অদ্বৈত মল্লবর্মণ, শিকড়সন্ধানী কবি আল মাহমুদের জন্মস্থানও ব্রাহ্মণবাড়িয়া। এই জেলায় উনিশ শতকের শেষে জন্মগ্রহণ করেছেন ‘ফকরে বাঙাল’ বা বাংলার গৌরবখ্যাত ইসলামী পণ্ডিত ও শিক্ষাবিদ আল্লামা তাজুল ইসলাম, মাওলানা সিরাজুল ইসলামসহ (রহ.) অনেকে। একই সময়ে জন্ম হয়েছিল ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁরও। একই ভূমি থেকে প্রকাশিত হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন পথের যাত্রী।

বৈচিত্র্যময় সেই সহাবস্থানের এই ভূমিতে একুশ শতকে এসে সিনেমা প্রদর্শন স্থগিত করতে হয়; পুলিশ লাইন্স আর কখনও গান বাজাবে না– এমন দাবি আসে। এসব দায় কি জনপ্রতিনিধিরা এড়িয়ে যেতে পারেন? তাদের একটি মন্তব্য কতখানি তাৎপর্য বহন করে, তারা জানেন? কোনো এলাকায় গান-বাজনা বা সিনেমার চর্চা কম থাকলেই ধরে নেওয়া যায় না– সেখানকার মানুষ সংস্কৃতিবিমুখ। সংস্কৃতি শুধু মঞ্চের গান বা সিনেমায় সীমিত নয়। লোকগান, পালাগান, বিয়ে ও সামাজিক অনুষ্ঠানের গান, ধর্মীয় সংগীত, কবিতা, গল্প, মেলা, আঞ্চলিক ভাষা– সবই সংস্কৃতি।

হতে পারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পুলিশ লাইন্সের সাম্প্রতিক ঘটনা স্মরণ করেই কথাটি বলেছেন। তাঁর আক্ষেপও হতে পারে। কেননা, এই বিতর্ক শুরু হতে হতেই সিলেটের বিয়ানীবাজারের সোনাই নদীতে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ বন্ধের দাবিতে সোচ্চার হয়েছে ‘তৌহিদী জনতা’। আশার কথা, প্রশাসন এখনও নৌকাবাইচের পক্ষে। 

বাংলাদেশ এখন এমন সময় পার করছে, যখন ‘সংস্কৃতি’ শব্দটিই রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে ফিরে এসেছে। সংস্কৃতি আসলে কার? কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের? শুধু ধর্মীয়ভাবে সংজ্ঞায়িত সংস্কৃতির? কেবল শহুরে মধ্যবিত্তের? নাকি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার লোকশিল্পী, সিলেট-চট্টগ্রামের আউলিয়াদের দর্শন, পার্বত্যাঞ্চলের জনগোষ্ঠী, ঢাকার চলচ্চিত্রকর্মী, গ্রামের পালাগানের শিল্পী– সবার সম্মিলিত সংস্কৃতিই এ দেশের বৈশিষ্ট্য? 
বলার অপেক্ষা রাখে না, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য নাগরিকের সাংস্কৃতিক অধিকারের গভীর সংকটই নির্দেশ করেছে। রাষ্ট্র কীভাবে ধীরে ধীরে অনানুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা এবং গোষ্ঠীগত আধিপত্যকে ‘স্থানীয় বাস্তবতা’ হিসেবে স্বাভাবিকীকরণ করে– এর উদাহরণ হয়ে থাকবে এই বক্তব্য। 

অদ্বৈত মল্লবর্মণ ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসে লিখেছিলেন, ‘যে পথ চিনিয়া চলে তার পথ একটি, আর যে দিশাহারা হইয়া চলে তার পথ শত শত।’ রাজনীতির সংস্কৃতি আর সংস্কৃতির রাজনীতি নিয়ে গণতান্ত্রিক সরকার শত পথে পা দিয়ে নিজে বিভ্রান্ত হবে না এবং দেশের মানুষকেও বিভ্রান্ত করবে না– এই প্রত্যাশা খুব বেশি নয়। পুনরায় মনে করিয়ে দিতে চাই, নাগরিকের স্বাধীন সাংস্কৃতিক পরিসরটি নিরাপদ রাখার দায়টি রাষ্ট্রের।

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম: সহকারী সম্পাদক, সমকাল
 

আরও পড়ুন

×