অন্যদৃষ্টি
মানবেতর পেশা, করুণ পরিণতি
ইফতেখারুল ইসলাম
প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৫৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বরের সেনপাড়ায় ম্যানহোলে নেমে কাজ করার সময় ওয়াসার কর্মী শামীমের (৪৭) করুণ মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ‘সড়ক দুর্ঘটনা’ নয়। এটি কাঠামোগত অবহেলা এবং রাষ্ট্র ও নগর কর্তৃপক্ষের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার এক চরম প্রতিচ্ছবি। ব্যস্ত সড়কের মাঝখানে ম্যানহোলের ঢাকনা খুলে একজন শ্রমিক কাজের জন্য নিচে নামবেন; আর সেখানে কোনো ট্রাফিক, সতর্কতামূলক ব্যারিকেড, প্রতিফলক সংকেত বা রিফ্লেক্টিভ সাইন থাকবে না– এটি শুধু দায়িত্বজ্ঞানহীনতা নয়; বরং একজন নাগরিকের জীবনকে চরম ঝুঁকিতে ঠেলে দেওয়ার নামান্তর। ম্যানহোল থেকে মাথা তুলতেই অনাকাঙ্ক্ষিত গাড়িচাপায় শামীমের মৃত্যুর ঘটনাটি আমাদের নগরায়ণ, কাজের পরিবেশ এবং নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রের দায়ের দৈন্যদশাকে আরও একবার উন্মোচিত করল।
একটি আধুনিক ও সভ্য নগরে যে কোনো ধরনের সড়ক সংস্কার বা ম্যানহোলের কাজের জন্য কঠোর নিরাপত্তা প্রটোকল বজায় রাখা বাধ্যতামূলক। সেখানে নিবেদিত নিরাপত্তাকর্মী থাকার কথা, যিনি দূর থেকে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করবেন এবং চালকদের সতর্ক করবেন। কিন্তু আমাদের দেশে ওয়াসার মতো সেবা সংস্থাগুলোর ক্ষেত্রে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে কোনো ন্যূনতম সুরক্ষাসামগ্রী বা রেড ফ্ল্যাগ ছাড়াই একজন শ্রমিককে ব্যস্ততম সড়কে নামিয়ে দেওয়া হয়। প্রশ্ন জাগে, ২৫ বছর ধরে সংস্থায় সেবা দেওয়া একজন অভিজ্ঞ কর্মীকে কেন এভাবে অরক্ষিত অবস্থায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হলো? সংস্থাটির কি কোনো নিরাপত্তা নির্দেশিকা বা তদারকি টিম ছিল না?
এই দুর্ঘটনার প্রাথমিক দায় অবশ্যই ঢাকা ওয়াসা এবং স্থানীয় সিটি করপোরেশন এড়াতে পারে না। এখানে নগর ব্যবস্থাপনায় ওয়াসা, সিটি করপোরেশন এবং ট্রাফিক পুলিশের মধ্যে সমন্বয়ের তীব্র অভাব স্পষ্ট। ব্যস্ত রাজপথে যখন ম্যানহোল খুলে কাজ চলে, তখন সিটি করপোরেশন বা ওয়াসার উচিত ছিল ট্রাফিক বিভাগের কাউকে সেখানে যুক্ত করা কিংবা কাজের স্থানকে যথাযথ ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে নেওয়া। কিন্তু প্রতিবারের মতো এবারও সেবা সংস্থাগুলো নিজেদের দায় এড়িয়ে কেবল গাড়িচালকের ওপর কিংবা ‘দুর্ঘটনা’ শব্দের আড়ালে প্রশাসনিক ব্যর্থতা ঢাকতে চাইবে। কিন্তু কাজের স্থানে প্রাথমিক নিরাপত্তা বলয় তৈরি না করার দায় সরাসরি সংস্থাগুলোর ওপরেই বর্তায়।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। অথচ রাষ্ট্র তার সেবা সংস্থাগুলোর মাধ্যমে একজন সাধারণ শ্রমিকের জীবন রক্ষার ন্যূনতম প্রটোকল বাস্তবায়নে ব্যর্থ। রাষ্ট্র যখন একজন শ্রমজীবী মানুষকে তার নিরাপদ কর্মপরিবেশের সুরক্ষা দিতে পারে না, তখন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। শ্রমিকের সস্তা জীবনের কোনো মূল্য যেন এই ব্যবস্থার কাছে নেই; মৃত্যুর পর সামান্য কিছু আর্থিক ক্ষতিপূরণ বা
একটা তদন্ত কমিটি গঠন করেই দায়িত্ব শেষ করা হয়।
দীর্ঘদিন ধরে পত্রপত্রিকায় রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতা নিয়ে বহু লেখালেখি হলেও দশকের পর দশক এর কোনো পরিবর্তন হয়নি। সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো বহু প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও সংস্কার প্রশ্নে যথেষ্ট আন্তরিক নয়। অথচ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মেনে চললেই শামীমের মতো অসংখ্য মানুষের জীবন এভাবে শেষ হয়ে
যেত না।
ওয়াসা, সিটি করপোরেশনসহ যে কোনো সংস্থাকে উন্মুক্ত স্থানে কাজ করার ক্ষেত্রে কঠোর কিছু নিরাপত্তা প্রটোকল মেনে চলা বাধ্যতামূলক করতে হবে। সতর্কতামূলক ব্যারিকেড বা নিরাপত্তা সংকেত ছাড়া কাজ করানোকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে, যেহেতু এরই মধ্য দিয়ে প্রাণ হারানোর মতো ঘটনা ঘটেছে। তদন্তের মাধ্যমে কেবল অজ্ঞাত গাড়িচালকের শাস্তি নয়; বরং যেসব কর্মকর্তা বা তদারককারীর অবহেলার কারণে নিরাপত্তা বলয় ছাড়াই শ্রমিককে কাজে নামানো হয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধেও প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। যে শামীম ২৫ বছর ধরে ওয়াসায় কাজ করছেন, তাঁর পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এ ধরনের কাজে নিরাপত্তা সংকেত নিশ্চিত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ইফতেখারুল ইসলাম: সহসম্পাদক, সমকাল
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি
- ইফতেখারুল ইসলাম