ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শ্রদ্ধাঞ্জলি

পানি নিয়ে কথা ও কাজের মানুষ

পানি নিয়ে কথা ও কাজের মানুষ
×

ডা. খায়রুল ইসলাম

শেখ রোকন

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:২৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

গত শুক্রবারের অলস সকালটি আরও অগম্য করে তুলেছিল ঝুম বৃষ্টি। এর মধ্যে ঘুম থেকে জেগে ফেসবুক ফিডে ডা. খায়রুল ইসলামের মৃত্যু সংবাদ যেন চারদিক অসাড় করে তুলেছিল। জানালার ওপাশে সফেদ বৃষ্টির মায়াবী পর্দায় যেন সিনেমার ফ্ল্যাশব্যাকের মতো ভেসে উঠছিল নানা স্মৃতি। কাজের নয়; কথার।

খায়রুল ইসলাম কেবল দেশের পানি ও স্যানিটেশন খাতের উন্নয়নে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করেননি; দেশের বাইরেও এই খাতে অবদান রেখেছেন। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ওয়াটার এইডের প্রথমে বাংলাদেশ পরিচালক হিসেবে এবং পরে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর বন্ধু, সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ীরা সামাজিক মাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে লিখেছেন তাঁর সঙ্গে কাজের অমূল্য অভিজ্ঞতা। নানা ক্ষেত্র ও মাত্রায় সবার অভিজ্ঞতার অভিন্ন নির্যাস– খায়রুল ভাই ছিলেন সজ্জন, সদালাপী, একই সঙ্গে কাজপাগল ও আড্ডাবাজ। অভিজ্ঞতায় দেখেছি, ছিলেন খাদ্যরসিক; লোকজনকে খাওয়াতেও পছন্দ করতেন।

খায়রুল ভাইকে কাছ থেকে যারা দেখেছেন, তারা সাক্ষ্য দিচ্ছেন, কোনো কাজ নিয়ে গেলে তিনি যথাসম্ভব চেষ্টা করতেন। যার মধ্যে সম্ভাবনা দেখেছেন, সেটাকে কাজে রূপান্তর করতে চাইতেন। তিনি নিজেও প্রথাগত চিকিৎসকের পরিচয়ে আবদ্ধ থাকেননি। জনস্বাস্থ্য, বিশেষত পানি ও স্যানিটেশন খাতে দেশের ভেতরে ও বাইরে নানা উদ্ভাবনী ধারণার জন্ম দিয়েছেন। 
পানি ও স্যানিটেশন খাতে ধনী-দরিদ্র বা কেন্দ্র-প্রান্ত বৈষম্য নিয়ে খায়রুল ভাই চিন্তাভাবনা করতেন। যেমন সমকালে প্রকাশিত এক নিবন্ধে লিখেছিলেন– ‘পানি ও স্যানিটেশনে বৈষম্য একটি বড় বিষয়। যেমন ঢাকার গুলশানে বসবাসকারী মানুষ যতটা পানি ব্যবহার করে থাকে; বস্তিবাসী ততটা পারে না। বৈষম্যের দ্বিতীয় বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপকূলীয় এলাকার মানুষ, যারা জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বিপর্যস্ত, তাদেরকে জীবন বাঁচানোর জন্য পানি কিনতে হয়। সাতক্ষীরার আশাশুনি, কয়রা কিংবা শ্যামনগরের মানুষকে এক হাজার লিটার পানি কিনতে হয় ৫০০ টাকা দিয়ে। অথচ একই দেশের নাগরিক ঢাকায় বসে সেই পানি ক্রয় করে ১৫ টাকা ২০ পয়সায়’ (আত্মতুষ্টি নয়, বাস্তবতা অনুধাবন জরুরি; ২১ মার্চ ২০২৩)।

পড়াশোনা ও কর্মসূত্রে গবেষক তো ছিলেনই; দারুণ লিখতেন। সংবাদমাধ্যমের কলাম থেকে সামাজিক মাধ্যমের পোস্ট; খায়রুল ভাইয়ের নিজস্ব ভাষাভঙ্গি গড়ে উঠেছিল। কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামানের সঙ্গে যৌথভাবে তাঁর লেখা ‘মুক্তিযুদ্ধের চিকিৎসা ইতিহাস’ বইটি আমার প্রিয় সংগ্রহগুলোর একটি। সাম্প্রতিককালে কথা হলেই বলতেন, অবসরের পর আরও বেশি লেখালেখি করবেন। 
মৃত্যু সংবাদে দেখছি, চলতি মাসেই ওয়াটারএইড, দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালকের পদ থেকে অবসর নেওয়ার কথা ছিল ডা. খায়রুল ইসলামের। কিন্তু তিনি যে জীবন থেকেই অবসর নেবেন– কে ভেবেছিল! কতই আর বয়স হয়েছিল! বয়স যতটুকু হয়েছিল; তারুণ্য ও তৎপরতা দিয়ে সেটাও যেন পিছিয়ে দিতে পেরেছিলেন।

খায়রুল ভাইয়ের সঙ্গে আমি কখনও কাজ করিনি; কিন্তু কথা কম হতো না। বলা বাহুল্য, নদী ও পানি নিয়ে। কখনও কখনও লেখা পড়ে প্রশংসা করতেন, পরামর্শ দিতেন, দ্বিমত করতেন। গতবছর ২৯ জুন ‘পানি আইন: আগার আলাপ ও গোড়ার গলদ’ শীর্ষক নিবন্ধ লিখেছিলাম সমকালে। খায়রুল ভাই তখন সম্ভবত বিদেশে। নিবন্ধটিতে পানি আইন প্রণয়নকালীন কিছু সমালোচনা ছিল। তিনি ওই প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন। সে প্রসঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠিয়েছিলেন রাতে।

খায়রুল ভাইয়ের বিদেহী আত্মার কাছে ক্ষমা চেয়ে ব্যক্তিগত মেসেজটি উদ্ধৃত করছি– “পানি আইন নিয়ে আপনার লেখাটা পড়লাম। বিদ্যমান আইনে পানিকে মানবাধিকার হিসেবেই গণ্য করা হয়নি। সে সময় মানবাধিকার শব্দটি শেষ পর্যন্ত ছিল। সংসদে উপস্থানের আগ মুহূর্তে সে সময়কার সচিব আর আইন সচিব মিলে শব্দটা বদলে ‘সর্বাধিকার’ বলে একটা শব্দ বসিয়ে দেন। মূলত একে মানবাধিকার থেকে প্রাধিকারে নামিয়ে আনেন। যুক্তি দেন, নইলে খাবার পানি না পেয়ে অনেকে মামলা মোকদ্দমা করবে। আমরা গভীর রাত পর্যন্ত একজন নির্দলীয় সংসদ সদস্য ........কে কনভিন্স করি যে সংসদে আপত্তি জানাবেন। কিন্তু..... তাঁকে ম্যানেজ করে পাস করিয়ে নেন। আইনটি সংশোধন হলে, পানিকে মানবাধিকার হিসেবেই গণ্য করতে হবে। জাতীয় পরিষদ থাকা না থাকায় কিছুই আসে যায় না। এটা একটা তত্ত্বীয় সত্তা। আপনি যেভাবে বলেছেন, সেভাবে হলে কিছুটা মানে হবে”।

উত্তরে ধন্যবাদ জানিয়ে আমি বলেছিলাম, ‘আমি শুধু আলোচনাটা শুরু করলাম, যেহেতু হালনাগাদের উদ্যোগ এসেছে। আপনার অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা থেকে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত লিখলে আরও ভালো হবে। পানি আইন, পানি নীতিমালা, পানি বিধিমালা হালনাগাদ ও সংস্কার করা দরকার’। হায়! পানি নিয়ে একজীবন কাজ করে খায়রুল ভাই চলে গেলেন। সেই সংস্কার কি হয়েছে?
খায়রুল ভাইয়ের একবার মনে হলো, দেশের পানিসম্পদের সার্বিক সংকট ও সমাধান নিয়ে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করবেন। তিনি সম্পাদক, আমরা বেশ কয়েকজন একেক বিষয়ে লিখব। হোয়াটসঅ্যাপে ‘পানি নিয়ে ভাবনা’ নামে একটি গ্রুপও খোলা হলো। আমার ভাগে আন্তঃসীমান্ত নদী। 

খ্যাতিমান একটি প্রকাশনা সংস্থাও আগ্রহী। এক দফা সামনাসামনি মিটিংও হলো। কিন্তু সম্ভবত, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অস্থিতিশীলতায় সেই উদ্যোগে কিছু ভাটা পড়েছিল। কয়েক দিন আগে গ্রুপে আবার আলাপ উঠেছে। খায়রুল ভাইয়ের স্মরণে আমরা সেই উদ্যোগটি এগিয়ে নিতে পারি কিনা।
অবশ্যই পারি; পারতেও হবে। পানি নিয়ে চিন্তা ও তৎপরতা নদীর মতোই বহমান। হাজার বছর ধরে এগিয়ে যায়। খায়রুল ভাই ছিলেন সেই নদীর একটি ধারা; চোখের আড়াল হলেও বয়ে যেতে থাকবেন।

শেখ রোকন: লেখক ও নদী গবেষক
[email protected]

আরও পড়ুন

×