জন্মদিন
বর্ণপরিচয়ের রাজনীতি ও একটি ফ্যাননিয়ান পাঠ
পারভীন জলী
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:২৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
সংগীত পিপাসু বলতে যা বোঝায় ব্যক্তিগত জীবনে আমি অনেকটাই তাই। আমার সংগীত পিপাসার জগৎ মূলত বাংলা ভাষার গানকে ঘিরে। পাশ্চাত্যের সংগীত, বিশেষ করে ইংরেজি পপসংগীত কখনোই আমার নিয়মিত শ্রবণের জগতে খুব একটা জায়গা করে নিতে পারেনি। তবে মাস দেড়েক আগে আমার চেনা সংগীতজগতে বেশ বড়সড় একটি ধাক্কা আসে আমার একমাত্র সন্তান, সাড়ে ছয় বছর বয়সী ঋদ্ধি রৌদ্রদীপ্তের কাছ থেকে। এক সন্ধ্যায় হঠাৎ করেই সে মাইকেল জ্যাকসনের গান শুনতে শুরু করে। তারপর থেকে আমাদের বাসার সংগীত শোনার ধরনই যেন অনেকটা পাল্টে গেল। এমনকি রাতে ঘুমের ঘোরেও সে জ্যাকসনের গানের লাইন আওড়ে ওঠে প্রায়ই।
এক পর্যায়ে বিষয়টি আমার কাছে খানিকটা বিরক্তিকর হয়ে উঠলেও শেষ পর্যন্ত তা একটি কৌতূহলে পর্যবসিত হয়। ভাবতে শুরু করি– মৃত্যুর এত বছর পরও একজন সংগীতশিল্পী কীভাবে নিজের প্রজন্মের সীমানা অতিক্রম করে জেনারেশন আলফার একটি শিশুকেও এমনভাবে মুগ্ধ করতে পারেন?
প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে গিয়ে তাঁকে নিয়ে পড়তে গিয়েই আমি জ্যাকসনের গান শুনতে শুরু করি। আমাকে ফিরে তাকাতে হয় তাঁর আফ্রিকান-আমেরিকান পরিচয়, কৃষ্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে তাঁর অবস্থান এবং তাঁর শরীর ঘিরে নির্মিত সামাজিক ও গণমাধ্যমের দৃষ্টির দিকে। ঠিক সেখান থেকেই শুরু হয় মাইকেল জ্যাকসনের কৃষ্ণাঙ্গ শরীর, শ্বেতাঙ্গ দৃষ্টি ও বর্ণপরিচয়ের রাজনীতির গল্প।
জ্যাকসনের নিজের শরীর, বর্ণ, সৌন্দর্য, শ্বেতাঙ্গত্ব ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় গণমাধ্যমের তীব্র আলোচনা ও বিতর্কের কেন্দ্রে চলে গিয়েছিল। কেন তা হলো সেটি বুঝতে উপনিবেশবাদবিরোধী চিন্তাবিদ এবং বিপ্লবী রাজনৈতিক কর্মী ফ্রানৎস ফ্যাননের (১৯২৫-৬১) ব্যাখ্যা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ফ্যানন মনে করেন, ‘ঔপনিবেশিক ও বর্ণবাদী সমাজের কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি শুধু নিজের চোখে নিজেকে দেখেন না; তিনি এমন একটি সামাজিক জগতে বাস করেন, যেখানে তাঁর শরীরকে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যের দৃষ্টি ও অর্থ প্রদান করে।’ জ্যাকসনের ক্ষেত্রেও আমরা ‘সাদা সোসাইটি’র সেই আধিপত্যবাদী প্রবণতা দেখতে পাই। মাইকেল জ্যাকসন জগদ্বিখ্যাত পপ গায়ক হওয়া সত্ত্বেও ‘সাদা সমাজ’ তাঁকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। তাঁর গায়ের চামড়ার রং পরিবর্তনসংক্রান্ত বিষয়ে তিনি ব্যাখ্যা দেওয়ার আগেই বর্ণবাদী সমাজ তাঁকে বেশ কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি করে। মাইকেল জ্যাকসন কি কালো থাকতে চান না? তিনি কি নিজের বর্ণ প্রত্যাখ্যান করে সাদা হতে চান? মাইকেল জ্যাকসনের নিজের বক্তব্য না শুনেই তাঁর শরীর নিয়ে ‘সাদা সমাজ’ বর্ণগত অর্থ তৈরি করে ফেলে। কারণ, বর্ণবাদী রাজনীতি ক্রিয়াশীল সমাজকাঠামোতে ‘কালো চামড়ার মানুষ’-এর শরীর শুধু ব্যক্তিগত শরীর থাকে না। তাঁর চামড়ার রঙের সঙ্গে নানা ধরনের ঐতিহাসিক ধারণা ও রাজনীতি যুক্ত করা হয়। ফলে মানুষটিকে ব্যক্তি হিসেবে দেখার আগেই তাঁর ‘কালো শরীর’ সামাজিক বিচারের মূল বিষয় হয়ে ওঠে। যদিও মাইকেল জ্যাকসন ১৯৯৩ সালে অপরাহ উইনফ্রেকে প্রদত্ত সাক্ষাৎকারে নিজের ব্ল্যাক আমেরিকান পরিচয় নিয়ে গর্বের কথা বলেন। তিনি বলেন যে, তাঁর এমন একটি স্কিন ডিজঅর্ডার রয়েছে, যা ত্বকের রঞ্জকতা নষ্ট করে দিচ্ছে। তাঁর রং বদলের পেছনে পরিবর্তনের সঙ্গে ভিটিলিগো যুক্ত। ২০০৯ সালে মাইকেল জ্যাকসনের মৃত্যুর পর সম্পন্ন ময়নাতদন্তেও তাঁর ত্বকে শ্বেতী রোগ থাকার কথা নথিভুক্ত হয়।
মাইকেল জ্যাকসনের জীবন আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি করে আর তা হলো– একজন মানুষের বর্ণপরিচয়ের প্রধান কে? ব্যক্তি নিজে, নাকি তাকে পর্যবেক্ষণকারী সমাজ? ফ্যাননের আলোকে প্রশ্নটির উত্তর নিছক ব্যক্তি অথবা সমাজ–এই দ্বিবিভাজনে সীমাবদ্ধ নয়। বর্ণবাদী সমাজ ব্যক্তির ওপর পরিচয়ের অর্থ আরোপ করতে চায়; মুক্তির প্রশ্নটি তাই সেই আরোপিত পরিচয়ের শৃঙ্খল ভেঙে ব্যক্তি যেন নিজের পূর্ণ মানবিক সত্তার স্বীকৃতি অর্জন করতে পারেন, তার সঙ্গে সম্পর্কিত।
এই বৃহত্তর রাজনীতির জটিল পাঠ শেষে আমি আবার ফিরে আসি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায়–সাড়ে ছয় বছরের ঋদ্ধি রৌদ্রদীপ্তের কাছে। সে ফ্যানন জানে না, বর্ণপরিচয়ের রাজনীতি বোঝে না, ‘কৃষ্ণাঙ্গ শরীর’ কিংবা ‘শ্বেতাঙ্গ দৃষ্টি’র তত্ত্বও তার জানার কথা নয়। সে শুধু মাইকেল জ্যাকসনের গান শোনে, তাঁর নাচ দেখে, তারপর নিজের ছোট্ট শরীরে সেই অসম্ভব সব মুদ্রা অনুকরণ করার চেষ্টা করে। অথচ তাকে দেখতে দেখতে আমার মনে হয়, সম্ভবত একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় বিজয় এখানেই–সমাজ তাঁর শরীরের রং, মুখাবয়ব ও পরিচয় নিয়ে যত সীমানাই নির্মাণ করুক না কেন, তাঁর শিল্প কখনও কখনও সেই সীমানা, ভূগোল, ভাষা–এমনকি প্রজন্মের ব্যবধানও অতিক্রম করে যায়।
অধ্যাপক ড. পারভীন জলী: ইতিহাস বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
ও ট্রেজারার, নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- জন্মদিন