ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

যানজট কমাতে ড্রোন

যানজট কমাতে ড্রোন
×

এস এম আজাদ হোসেন

প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:১৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকার সড়কে যানজট এখন শুধু একটি নগর-সমস্যা নয়; এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, কর্মঘণ্টা, অর্থনীতি ও মানসিক স্বস্তির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলা এক দীর্ঘস্থায়ী বাস্তবতা। কোথাও কয়েক মিনিটের অচলাবস্থা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের সড়ক, উড়াল সড়ক কিংবা উড়ালপথে। 

এই জটিল বাস্তবতায় সড়কের প্রচলিত নজরদারির পাশাপাশি এবার আকাশপথে নজরদারির কথা ভাবছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্যামেরার পর পরীক্ষামূলক ড্রোন নজরদারি যুক্ত করার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে রাজধানীর যান ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।

তবে প্রযুক্তি নিজে কোনো জাদুর কাঠি নয়। ড্রোন আকাশ থেকে যানজট দেখতে পারবে; কারণ শনাক্ত করতে পারবে; আইন ভঙ্গের দৃশ্য ধারণ করতে পারবে। কিন্তু ঢাকার যানজটের মূল কারণগুলো যদি একই থাকে; তাহলে শুধু আকাশে চোখ বাড়ালেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বরং প্রযুক্তিকে সঠিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক সময় নিচের সড়কের পাশাপাশি উড়াল সড়ক বা উড়াল পথেও যান চলাচল ধীর হয়ে যায়। তখন সড়কের ওপর থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেও প্রকৃত কারণ শনাক্ত করতে সময় লাগে।

ড্রোনের সবচেয়ে বড় সুবিধা এখানেই। নির্দিষ্ট এলাকায় আকাশ থেকে চলমান পরিস্থিতির ছবি পাওয়া গেলে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ কক্ষ দ্রুত বুঝতে পারবে কোথায় সমস্যা তৈরি হয়েছে; কোন পথে যানবাহনের চাপ বেশি এবং কোথায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। অর্থাৎ ড্রোন শুধু ছবি তোলার যন্ত্র নয়; সঠিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত হলে এটি হতে পারে ‘দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি চলমান চোখ’।
ঢাকার যানজটের একটি বড় কারণ গণপরিবহনের বিশৃঙ্খলা। নির্দিষ্ট স্থানে বাস না থামানো; যাত্রী ওঠানোর জন্য সড়কের মাঝখানে বা যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে পড়া; একই রুটের বাসগুলোর মধ্যে যাত্রী সংগ্রহের প্রতিযোগিতা– এসব দৃশ্য নগরবাসীর প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা। তাই ড্রোন আকাশ থেকে বাসের অনিয়ম দেখতে পারবে; কিন্তু বাস কেন অনিয়ম করছে– তার অর্থনৈতিক ও ব্যবস্থাপনাগত কারণ সমাধান করতে পারবে না।

ড্রোন নজরদারি চালুর ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার– নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও অধিকার। আকাশ থেকে ধারণ করা ভিডিও কোথায় সংরক্ষণ করা হবে; কতদিন রাখা হবে; কারা তা দেখতে পারবেন; কীভাবে তথ্য ব্যবহার করা হবে– এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। আইন প্রয়োগের নামে যেন নাগরিকের ব্যক্তিগত পরিসর অযথা পর্যবেক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ড্রোন পরিচালনাকারী সদস্যদের প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, তথ্য বিশ্লেষণের দক্ষতা এবং দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ প্রযুক্তির চোখ যত শক্তিশালী হবে, সেই চোখ পরিচালনাকারীর দায়িত্বও তত বেশি হবে।

ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় এআই ক্যামেরার ব্যবহার ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। নির্দিষ্ট কয়েকটি ট্রাফিক সংকেতকে প্রযুক্তির আওতায় আনার পাশাপাশি এখন ড্রোন পরীক্ষামূলক ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শুরুতে একটি ড্রোন দিয়ে কাজটি পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং পর্যায়ক্রমে এর কার্যকারিতা মূল্যায়নের কথা বলা হয়েছে।
তাড়াহুড়ো না করে প্রথমে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও যানজটপ্রবণ এলাকায় ড্রোন ব্যবহার করে দেখা যেতে পারে। কত দ্রুত তথ্য পাওয়া যায়; সিদ্ধান্ত নিতে কতটা সময় কমে; আইন ভঙ্গ শনাক্তকরণ কতটা নির্ভুল হয় এবং বাস্তবে যান চলাচল কতটা স্বাভাবিক করা সম্ভব। যদি ফল ইতিবাচক হয়, তাহলে পর্যায়ক্রমে এর পরিধি বাড়ানো যেতে পারে।
শেষ কথা হলো, ঢাকার যানজটের সমাধান একক কোনো প্রযুক্তিতে নেই। প্রয়োজন সড়ক ব্যবস্থাপনা, গণপরিবহন সংস্কার, আইন প্রয়োগ, পথচারীবান্ধব অবকাঠামো, চালকদের প্রশিক্ষণ এবং নাগরিক সচেতনতার সমন্বিত উদ্যোগ।

এস এম আজাদ হোসেন: সামাজিক কর্মী, সাবেক মহাসচিব এবং বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান, নিরাপদ সড়ক চাই 

আরও পড়ুন

×