মানবসম্পদ
শিক্ষক নিয়োগে সংস্কারের পথরেখা
মো. সাব্বির হোসেন
প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:২১
| প্রিন্ট সংস্করণ
শিক্ষার মান শেষ পর্যন্ত শ্রেণিকক্ষেই নির্ধারিত হয়। আর শ্রেণিকক্ষের মান বহুলাংশে নির্ভর করে শিক্ষকের ওপর। তাই শিক্ষক নিয়োগ শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রশ্ন হলো, এনটিআরসিএ কি একই সঙ্গে শিক্ষক নিবন্ধন, প্রত্যয়ন এবং নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের সুপারিশ বা সবকিছু করবে, নাকি প্রতিষ্ঠানকে আধুনিকায়ন করে টিচার প্রফেশনাল স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড রেজিস্ট্রেশন অথরিটি হিসেবে পুনর্গঠন করা প্রয়োজন?
এনটিআরসিএ ২০০৫ সালে সংবিধিবদ্ধ কর্তৃপক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষক হওয়ার জন্য উপযুক্ত ব্যক্তিদের নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন করা। পরবর্তী সময়ে নিবন্ধিত প্রার্থীদের মধ্য থেকে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রবেশ পর্যায়ের শূন্য পদে নিয়োগের সুপারিশ করার দায়িত্বও এনটিআরসিএকে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠান থেকে শূন্য পদের চাহিদা নেওয়া, প্রার্থীর আবেদন গ্রহণ, মেধা ও নির্ধারিত মানদণ্ডের ভিত্তিতে প্রার্থী নির্বাচন এবং নিয়োগের জন্য সুপারিশ– পুরো প্রক্রিয়া অনেকাংশে কেন্দ্রীয় ও ডিজিটাল পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে।
এই কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা বাংলাদেশের শিক্ষক নিয়োগে একটি বড় ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ের নিয়োগে তদবির, স্বজনপ্রীতি, আর্থিক লেনদেন কিংবা পরিচালনা কমিটির অতিরিক্ত প্রভাব কমানোর ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় মেধাভিত্তিক সুপারিশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এনটিআরসিএর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সাল থেকে বিভিন্ন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক শিক্ষক নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। কাজেই সংস্কারের অর্থ বর্তমান ব্যবস্থাকে বাতিল করা নয়। বরং এর অর্জনগুলো ধরে রেখে পরবর্তী প্রজন্মের একটি উন্নত শিক্ষক নিয়োগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
এ ক্ষেত্রে উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। ইংল্যান্ডে অনেক স্কুলে শিক্ষকতার জন্য কোয়ালিফায়েড টিচার স্ট্যাটাস বা কিউটিএস গুরুত্বপূর্ণ পেশাগত যোগ্যতা। কিন্তু কিউটিএস অর্জন করলেই সরকার একজন শিক্ষককে কোনো নির্দিষ্ট স্কুলে চাকরি দেয় না। সে জন্য শিক্ষককে আলাদাভাবে চাকরির জন্য আবেদন করতে হয়।
তার মানে, সেখানে শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা নির্ধারণ এবং শিক্ষককে চাকরি দেওয়া দুটি পৃথক কাজ। আমাদের বাস্তবতায় এখনই সম্পূর্ণ নিয়োগ ক্ষমতা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ আমাদের অভিজ্ঞতায় স্থানীয় নিয়োগ ব্যবস্থায় অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। তাই আমাদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতার উপযোগী একটি হাইব্রিড মডেল। এই ব্যবস্থায় এনটিআরসিএর প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে ব্যক্তি শিক্ষক হওয়ার জন্য পেশাগতভাবে যোগ্য কিনা, তা কঠোরভাবে যাচাই করা। শুধু বহুনির্বাচনী, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় বিষয়জ্ঞান যাচাই যথেষ্ট নয়। ভালো শিক্ষককে বিষয়জ্ঞান যেমন জানতে হবে, তেমনি জানতে হবে কীভাবে একটি জটিল বিষয় সহজভাবে শিক্ষার্থীকে বোঝাতে হয়।
সফল প্রার্থীদের নিয়ে তৈরি হতে পারে ন্যাশনাল রেজিস্টার্ড টিচার পুল। অর্থাৎ নিবন্ধন হবে শিক্ষকতা পেশায় প্রবেশের লাইসেন্স বা পেশাগত স্বীকৃতি। কিন্তু তা সরাসরি কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের চাকরির নিশ্চয়তা হবে না। এরপর দ্বিতীয় ধাপে নিয়োগ। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের প্রকৃত শূন্য পদ একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করবে। নিবন্ধিত শিক্ষকরা পছন্দ অনুযায়ী জেলা, উপজেলা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রেফারেন্স দিতে পারবেন। বর্তমান ব্যবস্থার বড় শক্তি তথা কেন্দ্রীয় ডিজিটাল প্রক্রিয়া এখানেও অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। কিন্তু একটি শূন্য পদের বিপরীতে একজনকে সরাসরি সুপারিশ করার পরিবর্তে মেধাক্রম অনুযায়ী তিন থেকে পাঁচজন যোগ্য প্রার্থীর একটি শর্টলিস্ট সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে।
এরপর প্রশ্ন আসবে, প্রতিষ্ঠান কি এই পাঁচজনের মধ্যে ইচ্ছামতো একজনকে নিয়োগ করবে? উত্তর হলো– না। তাহলে আবার পুরোনো অনিয়ম ফিরে আসার ঝুঁকি থাকবে। বরং এখানে একটি ৭০:৩০ মডেল বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রার্থীর মোট স্কোরের ৭০ শতাংশ আসবে কেন্দ্রীয় মূল্যায়ন থেকে এবং বাকি ৩০ শতাংশ হবে প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে কিন্তু কেন্দ্রীয়ভাবে নির্ধারিত কাঠামোয় অনুষ্ঠিত প্রফেশনাল অ্যাসেসমেন্ট। এতে দুটি উদ্দেশ্য একসঙ্গে অর্জন সম্ভব। একদিকে কেন্দ্রীয় মেধাক্রম, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকবে; অন্যদিকে একটি স্কুল তার প্রয়োজনের উপযোগী শিক্ষক পাওয়ার সুযোগ পাবে। শুধু পরীক্ষায় ভালো করা আর ভালো শিক্ষক হওয়া যে সব সময় একই বিষয় নয়– এই বাস্তবতাও নিয়োগ ব্যবস্থায় স্বীকৃতি পাবে।
আরও বড় সংস্কার প্রয়োজন ‘নিবন্ধন’ ধারণাতেই। একজন ব্যক্তি একবার নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর সেই পেশাগত সক্ষমতার স্বীকৃতি
অনির্দিষ্টকাল একইভাবে কার্যকর থাকবে কিনা, সেটি নতুন করে ভাবা প্রয়োজন। শিক্ষকতা দ্রুত পরিবর্তনশীল পেশা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল কনটেন্ট, ব্লেন্ডেড লার্নিং ও নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি শ্রেণিকক্ষকে বদলে দিচ্ছে।
শিক্ষক নিয়োগে আমাদের মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়– কে চাকরি পেলেন। বরং প্রশ্ন হবে– আমাদের সন্তানের শ্রেণিকক্ষে সবচেয়ে যোগ্য মানুষটি শিক্ষক হিসেবে পৌঁছাতে পারলেন কিনা। এনটিআরসিএ সংস্কারের কেন্দ্রবিন্দুতে এই প্রশ্ন জরুরি।
মো. সাব্বির হোসেন: সহকারী অধ্যাপক (শিক্ষা প্রযুক্তি), বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
- বিষয় :
- মানবসম্পদ