মানুষ গড়ার কারিগরদের সুরক্ষা
মোশারফ হোসেন
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ | ১০:৪৯
শিক্ষককে বলা হয় মানুষ গড়ার কারিগর। তাই এই পেশার দায়দায়িত্বের জায়গা বেশ স্পর্শকাতর। এই পেশা শুধু দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। এটি একটি মহান ব্রত। শিক্ষক সমাজকে সদা-নিয়ত মনে রাখতে হবে– নিঃশেষে প্রাণ, যে করিবে দান, ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই। শিক্ষক সমাজ স্মরণীয়-বরণীয়; হবেন অনুকরণীয়-অনুসরণীয়। একজন আদর্শবান শিক্ষক মনে রাখেন– সজাগ দৃষ্টি দিয়ে অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীদের বোঝানোর সক্ষমতার বিষয়টি মাথায় নিয়ে ঐকান্তিক চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হয়। তাতে দুর্বলের ওপর ন্যায্যতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়।
শিক্ষক হবেন ধন-মান-জ্ঞান-ক্ষমতায় সবার শীর্ষে। শিক্ষক সমাজকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েই তাবৎ পৃথিবীর সব উন্নত দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষক সমাজের শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিশেষ যত্ন নিতে হবে। মানসিক রোগগুলোকে অবজ্ঞা-অবহেলা-তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে জাতীয় উন্নতি কোনোভাবেই সম্ভব নয়। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে সুস্থ-সবল মানসিকতাসম্পন্ন জনগোষ্ঠী খুবই প্রয়োজন। জ্ঞানভিত্তিক দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে আগামী বিশ্বদরবারে টিকে থাকতে হলে শিক্ষক সমাজের সার্বিক উন্নতি সাধনের কোনো বিকল্প নেই।
আমাদের শিক্ষকদের যে অন্তহীন সমস্যা, এর মধ্যে কীভাবে তারা যথাযথ সেবা দেবেন? তাদের যেমন প্রত্যাশিত বেতন-ভাতার ব্যবস্থা করতে হবে, তেমনি প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক, কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা ও অন্যান্য সহায়ক পেশাজীবী, চিকিৎসা পুষ্টিবিদ, স্বাস্থ্য-শিক্ষাবিষয়ক চিকিৎসক নিয়োগ দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর, অধিদপ্তরের আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয়ে সমন্বিত প্রয়াসই এহেন সমস্যা-সংকট দূর করে আশু সমাধান করতে পারে।
শিক্ষক সমাজের আর্থিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিতকরণের অংশ হিসেবে স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো, বদলি, পদোন্নতি, গবেষণার সুযোগ, আবিষ্কারে পেটেন্ট, পুরস্কার-পারিতোষিক, গবেষণা পরিচালনায় রাষ্ট্রীয় অনুদান, চাকরির স্থায়িত্ব, বৃত্তি, আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ ও প্রশিক্ষণ ফান্ড বরাদ্দ, প্রণোদনা, অবসর কল্যাণ, চাকরির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে যথাযথ বিধি ব্যবস্থা করতে হবে।
রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবসে শিক্ষক সমাজকে যথাযথ মূল্যায়নের অংশ হিসেবে প্রথম সারিতে বসার ব্যবস্থা করতে হবে সসম্মানে। শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়নে উন্নত বিশ্বের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতকল্পে ন্যায় অনুসরণ করে স্বাস্থ্য কার্ড, ক্রেডিট কার্ড, জীবন বীমা, পরিবহন বীমা, স্বাস্থ্য বীমার আওতায় আনতে হবে। সেই সঙ্গে সঞ্চয় সুরক্ষা করতে হবে। শিক্ষকদের জন্য উন্নত আবাসিক ব্যবস্থা, স্বতন্ত্র হাসপাতাল, রেশনিং, সুলভ মূল্যের সুপারশপ; ভেজালমুক্ত, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা এবং নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে ক্যান্টিন চালু ও ব্যায়ামাগার স্থাপন করতে হবে।
শিক্ষকদের মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন ছুটি এবং ভাতা চালু করতে হবে। যেসব শিক্ষক লেখালেখি তথা সৃজনশীল মহৎ কর্মকাণ্ড অর্থাৎ গ্রন্থ, পত্রিকায় জার্নাল প্রকাশনা, গান-গজল, কবিতা আবৃত্তি, চিত্রকর্ম, অভিনয় ও নান্দনিক শৈল্পিক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের উপযুক্ত অবদান অথবা কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ সঠিক মূল্যায়ন ও পদোন্নতি দিতে হবে। সামাজিক কর্মকাণ্ড যেমন গাছ লাগানো, রোভারিং, বিএনসিসির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের নানাভাবে পুরস্কার-উৎসাহ দিতে হবে রাষ্ট্রের মাধ্যমে।
মনে রাখতে হবে শিক্ষা নিছক ব্যয়ের খাত নয়। জাতীয় বৃহত্তর স্বার্থে শিক্ষক সমাজের মনস্তাত্ত্বিক সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ সময়ের দাবি। সুস্থ দেহ সুস্থ মন, কর্মব্যস্ত সুখী জীবন। শিক্ষকদের উপরিউক্ত বিষয়গুলো যথাযথ বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হলে নতুন ভোরের আলোয় আলোকিত হবে দেশ তথা বিশ্ব– এটাই প্রত্যাশা।
মোশারফ হোসেন: প্রভাষক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি ইস্পাহানী ডিগ্রি কলেজ, কেরানীগঞ্জ
[email protected]
- বিষয় :
- শিক্ষক