স্বাধীন চাকরি কমিশন কেন জরুরি
মোছাব্বের হোসেন
মোছাব্বের হোসেন
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ | ১০:৫৯
বাংলাদেশে সরকারি চাকরি শুধু একটি চাকরি নয়; নিয়মিত আয়, সামাজিক মর্যাদা, পরিবারের স্বস্তি ও রাষ্ট্রের অংশ হয়ে কাজ করার সুযোগ। এ কারণেই সরকারি চাকরিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া কেবল প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের ওপর নাগরিকের আস্থা, তরুণদের আশা এবং গণতান্ত্রিক ন্যায্যতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
অনেক তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করার পর কয়েক বছর শুধু সরকারি চাকরির প্রস্তুতিতে ব্যয় করেন। এ প্রস্তুতিতে শুধু প্রার্থীর শ্রম নয়, পরিবারের বিপুল অর্থব্যয়ও ঘটে। ফলে সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়া তাদের কাছে শুধু একটি পরীক্ষা নয়; জীবনের বড় বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগের বিপরীতে তারা ন্যায্য, স্বচ্ছ ও সময়মতো নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রত্যাশা করতেই পারেন।
সংবিধান অনুযায়ী, সরকারি চাকরিতে নিয়োগের জন্য পরীক্ষা গ্রহণ এবং উপযুক্ত প্রার্থী বাছাই করা সরকারি কর্ম কমিশন-পিএসসির অন্যতম দায়িত্ব। কিন্তু কমিশন কি সত্যিই স্বাধীন, দ্রুত, স্বচ্ছ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত? মানুষ কি নিয়োগ ব্যবস্থাকে বিশ্বাস করে?
গত এক দশকে এ বিষয়ে সাংবাদিকতা করতে গিয়ে দেখেছি, বাংলাদেশে সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রতিযোগিতামূলক হলেও অনেক ক্ষেত্রে অগোছালো। আলাদা সরকারি কর্তৃপক্ষ নিজের মতো নিয়োগ পরীক্ষা নেয়। অনেক সময় একাধিক নিয়োগ পরীক্ষা একই দিনে বা একই সময়ে পড়ে যায়। ফলে চাকরিপ্রার্থীরা বিপাকে পড়েন– কোনটি ছেড়ে কোন পরীক্ষায় অংশ নেবেন। যে পরীক্ষাটি তাকে ছাড়তে হলো; একজন প্রার্থী হয়তো মাসের পর মাস তার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছেন, আবেদন ফি দিয়েছেন। এটি শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; নিয়োগ ব্যবস্থার সমন্বয়হীনতারও প্রমাণ। একটি স্বাধীন ও সমন্বিত চাকরি কমিশন এ সমস্যার সমাধান দিতে পারে।
আবার বিভিন্ন বিসিএস পরীক্ষার পরিসংখ্যান নিলে দেখা যাবে, বছরের পর বছর কয়েক লাখ তরুণ-তরুণী সীমিত সংখ্যক সরকারি পদের জন্য প্রতিযোগিতা করছেন। এর মধ্যে পরীক্ষার প্রক্রিয়া নিয়ে সামান্য সন্দেহও ব্যক্তিগত হতাশাকে সামাজিক ক্ষোভে পরিণত করতে পারে। তাই স্বাধীন চাকরি কমিশনের গুরুত্ব মেধার সুরক্ষায়ও। নাগরিকদের বিশ্বাস করতে হবে যে সরকারি প্রতিষ্ঠান সবার জন্য কাজ করে; শুধু ক্ষমতাবানদের জন্য নয়।
সরকারি চাকরিতে যারা নিয়োগ পান, তারাই নীতি নির্ধারণের প্রাথমিক কাজ করেন এবং তা বাস্তবায়ন করেন। তারা মাঠ প্রশাসন চালান, নাগরিক সেবা দেন, রাজস্ব আদায় করেন, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-স্থানীয় সরকারসহ নানা খাতে কাজ করেন। নিয়োগ যদি দুর্বল হয়, প্রশাসনও দুর্বল হয়। আর দলীয় লাইনে নিয়োগের ফল কী হয়, তা সবারই জানা।
রাজনৈতিক সরকার আসবে, যাবে। কিন্তু প্রশাসনকে স্থায়ী, পেশাদার ও নিরপেক্ষ থাকতে হবে। মন্ত্রী, এমপি, দলীয় নেতা, প্রভাবশালী আমলা বা অর্থশালী গোষ্ঠীর চাপ থেকে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে রক্ষা করার জন্যই স্বাধীন কমিশন প্রয়োজন।
অনেকে বলতে পারেন, নতুন কমিশন যে নিখুঁত হবে– তার নিশ্চয়তা কী। এ বিষয়ে প্রথম কথা, স্বাধীন, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক না হলে কার্যকর চাকরি কমিশন আমরা পাব না– সন্দেহ নেই। কমিশনে এমন ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে হবে, যাদের সততা, পেশাগত অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা আছে। নিয়োগ-সংক্রান্ত তথ্য আরও নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। কতজন আবেদন করলেন, কতজন পরীক্ষায় অংশ নিলেন, কতজন পাস করলেন, কতজন নিয়োগ পেলেন, কত সময় লাগল– এসব তথ্য সহজ ভাষায় প্রকাশ করা উচিত। মৌখিক পরীক্ষার নম্বর আরও স্বচ্ছ করতে হবে। লিখিত পরীক্ষায় উত্তরপত্র থাকে; নম্বর যাচাইয়ের সুযোগ থাকে। কিন্তু মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে অনেক সময় সন্দেহ তৈরি হয়। তাই মূল্যায়নের নির্দিষ্ট মানদণ্ড, একাধিক বোর্ড সদস্য, রেকর্ড সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনে পর্যালোচনার ব্যবস্থা থাকা উচিত। প্রার্থীকে সব তথ্য জানানো সম্ভব না হলেও প্রক্রিয়াটি যেন স্বেচ্ছাচারী মনে না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
একটি বিসিএস বা সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হতে যদি বছরের পর বছর লেগে যায়, সেটি তরুণদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট করে। বিজ্ঞপ্তি, প্রিলিমিনারি, লিখিত, মৌখিক পরীক্ষা ফল, সুপারিশ ও গেজেট– প্রতিটি ধাপের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকা উচিত। একটি নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল নিয়োগ ক্যালেন্ডার প্রকাশ করা যেতে পারে, যাতে প্রার্থীরা তাদের জীবন নিয়ে পরিকল্পনা করতে পারেন।
অভিযোগ ও আপিল ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে হবে। কোনো প্রার্থী যদি অনিয়ম, ভুল বা পক্ষপাতের অভিযোগ করেন, সেটি যেন শুধু আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে না থাকে। স্বাধীন, সময় সীমাবদ্ধ এবং বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে। এতে কমিশনের ওপর আস্থা বাড়বে।
সর্বোপরি, বাংলাদেশ এখন এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যখন তরুণদের আস্থা পুনর্গঠন করা অত্যন্ত জরুরি। চাকরি, শিক্ষা, ন্যায্যতা ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ নিয়ে তরুণদের মধ্যে যে উদ্বেগ আছে, সেটিকে অবহেলা করা বিপজ্জনক হবে। তরুণরা ন্যায্যতা চায়। এটি রাষ্ট্রের জন্য হুমকি নয়; বরং রাষ্ট্র সংস্কারের সুযোগ।
যখন নিয়োগ ন্যায্য হয়, তরুণরা ভবিষ্যতের ওপর বিশ্বাস রাখে। আর যখন তরুণরা ভবিষ্যতের ওপর বিশ্বাস রাখে, তখন রাষ্ট্রও শক্তিশালী হয়। বাংলাদেশের জন্য তাই স্বাধীন চাকরি কমিশন কোনো বিলাসী সংস্কার নয়। এটি ন্যায্যতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা পুনর্গঠনের জরুরি শর্ত।
সরকারকে মনে রাখতে হবে, পূর্ববর্তী কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতনের পেছনে চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। অর্থাৎ সরকারি চাকরিতে ন্যায্যতা এখন কেবল প্রশাসনিক প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রতি তরুণদের আস্থা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। তাই তরুণদের কর্মসংস্থান, সরকারি চাকরিতে ন্যায্য সুযোগ এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা হওয়া উচিত।
মোছাব্বের হোসেন: সাংবাদিক, যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মন্টনাতে সাংবাদিকতা বিভাগে অধ্যয়নরত
- বিষয় :
- সরকারি চাকরি
- চাকরি