ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

প্রশাসন

ঘুষ যখন অপরাধ বা লজ্জা নয়, বরং প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা

ঘুষ যখন অপরাধ বা লজ্জা নয়, বরং প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা
×
×

মোশতাক আহমেদ

মোশতাক আহমেদ

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪১ | আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:৫০

| প্রিন্ট সংস্করণ

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসাইন প্রকাশ্যে বলে দিয়েছেন তিনি কোনো মসজিদের ইমাম নন, পোশাক লাগিয়েছেন ঘুষের টাকা দিয়ে, এবং তা ঘুষ খাওয়ার জন্যই। গত ৭ অক্টোবর প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৫ অক্টোবর একটি মামলার তদন্তে গিয়ে উপজেলার রানীগাঁও বাজারে তিনি এ বক্তব্য দেন। এ এক চমকে দেওয়া স্বীকারোক্তি বটে। কোনো অসতর্ক মুহূর্তে মুখ থেকে বেরিয়ে পড়া কথাও হতে পারে তা। তবে এতে যে বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতার এক অপ্রিয় ছবি ফুটে উঠেছে, তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই।

লক্ষণীয়, তিনি এ কথা বলতে ভয় পাননি, লজ্জাও পাননি। সম্ভবত তিনি জানেন, এ কথা বলার জন্য তাঁর কোনো শাস্তি হবে না, শ্রোতারাও এটিকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেবেন। দুটি ধারণাই সমান উদ্বেগজনক। তবে এটাও মানতে হবে যে, সরকারি চাকরিতে বেতনের চেয়েও ‘উপরি’ আয় নিয়ে কৌতূহল জনপরিসরে বরাবরই ছিল। এমনকি বিয়ের বাজারে এবং সামাজিক মর্যাদা নির্ধারণেও ‘উপরি’র ওজন প্রায়ই মূল বেতন এবং ক্ষেত্রবিশেষে পদেরও চেয়ে বেশি। মাত্র ৩০-৪০ হাজার টাকা মাসিক বেতনের চাকরি করে ঢাকা শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট বা জমির মালিক হয়েছেন, এমন সরকারি কর্মচারী বহু আছেন। সন্তানের লেখাপড়ার পেছনে তাদের বেতনের চেয়েও বেশি খরচ করেন; এমন সরকারি কর্মচারীর সংখ্যাও কম নয়; অনেকেই নামি-দামি গাড়িও ব্যবহার করেন। আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী তো দূর স্থান, দুর্নীতি দমনে নিয়োজিত সরকারি একাধিক সংস্থাও এসব নিয়ে কোনো প্রশ্ন করে না। অনেকে গ্রামে গিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে লাখ লাখ টাকা দান-খয়রাত করেন। বিনা প্রশ্নে তা গৃহীত হয়, প্রচারও হয়; এমন দাতাদের জন্য সংবর্ধনার আয়োজনও করা হয়, যদিও দিন শেষে এই অপসংস্কৃতির প্রধান ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষেরাই হন।

 ঘুষখোর সরকারি কর্মীর বেতন যেমন জনগণের করের টাকা থেকে হয়, তেমনি বিনে পয়সার সেবার জন্য ‘উপরি’ দিতে গিয়ে সেই জনগণেরই পকেট খালি হয়। মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ এভাবে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার ফলে সমাজে যে ধনবৈষম্য প্রকট হয়, তাও ওই জনগণের বঞ্চনার ঘড়া পূর্ণ করে।

সব কালে, সব সরকারের আমলে এই অবৈধ আয়ের দাপট ছিল। উপরন্তু, সিকি শতকের বেশি সময় ধরে প্রকাশিত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) দুর্নীতিসংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলো দেখলে স্পষ্ট হবে, প্রতিবছর ঘুষ লেনদেনের গ্রাফ ওপরের দিকে উঠছে। বেশি দূরে না গিয়ে, ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ফসল অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের দিকে নজর দেওয়া যাক। প্রকাশিত এর এক জরিপ বলেছে, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫-এর অক্টোবর–এই এক বছরে বাংলাদেশে মোট ঘুষ লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। এই অর্থ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত জাতীয় বাজেটের ১ দশমিক ৫৮ শতাংশ ও জিডিপির শূন্য দশমিক ২৩ শতাংশ (ডেইলি স্টার, ২৫ জুন, ২০২৬)।

ঘুষ মূলত রাষ্ট্রব্যবস্থার অনিবার্য ফসল। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াগুলো এমন, সেবাদাতার পক্ষে সেবাপ্রত্যাশীকে প্যাঁচে ফেলে উপরি আদায় করা আদৌ কঠিন কিছু নয়। অন্যদিকে সহজে কাজ আদায় করতে সেবাপ্রত্যাশীও অনেক ক্ষেত্রে অনিয়মের রাস্তা খোঁজেন। এ পরিস্থিতিতে অতি বড় যুধিষ্ঠিরও উপরির প্রলোভন এড়াতে পারবেন না। এমনকি শাস্তির ভয়ও অনেক ক্ষেত্রে তাঁকে নিবৃত্ত করতে পারে না। ইলিয়াস হোসাইনের কথায় এটা স্পষ্ট যে, পুলিশের পোশাক তাঁর কাছে সেবার প্রতীক নয়, অবৈধ উপার্জনের লাইসেন্স। যিনি পদটিকে সুযোগ হিসেবে দেখেন, তিনি উপরি আয়ের জন্য অপকৌশল নিতে দ্বিধাগ্রস্ত হবেন না। এ কারণে বেতন বাড়লে ঘুষ খাওয়া কমবে, এমন যুক্তি ইতোমধ্যে অসার প্রমাণিত হয়েছে।

অনেক সময়ই সরকারের পক্ষ থেকে ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’-এর ঘোষণা শোনা যায়। পরিহাস হলো, ওই ঘোষণা যারা দেন তাদের অনেকে দুর্নীতির পাঁকে নিমজ্জিত। এ কারণে মাঝে মধ্যে দু-একজন চুনোপুঁটিকে আইনের আওতায় আনা হলেও দুর্নীতির রাঘববোয়ালরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।

খবরে দেখলাম, হবিগঞ্জের সেই আলোচিত ইলিয়াস হোসাইনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।  এমন প্রত্যাহারের খবর প্রায়ই শোনা যায়। অতীত অভিজ্ঞতা এটাও বলে যে, সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে আলোচনা থেমে গেলে যে প্রক্রিয়ায় ইলিয়াস চাকরি পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন, সেই একই প্রক্রিয়ায় নতুন কোনো স্থানে তাঁর পদায়নও হবে। তদুপরি এটাও একটা প্রশ্ন যে, ঘুষ খাওয়ার পক্ষে কথা বলে ইলিয়াস হয়তো ‘শাস্তি’ পেয়েছেন, কিন্তু ঘুষ নিয়ে ইলিয়াসকে যারা চাকরি দিয়েছেন, তাদের ব্যাপারে কী করা হলো?

আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরে যে দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতির ধারা চলছে, তারও অনিবার্য ফসল আজকের ঘুষ সংস্কৃতি। আসলে রাজনীতির আশ্রয় ছাড়া ঘুষের অপসংস্কৃতি কখনও বিকশিত হতে পারে না। সে কারণে রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনা না গেলে ঘুষও বন্ধ করা যাবে না।
তবে পরিবর্তনের শুরুটা শুধু সরকার বা প্রশাসনের ওপর থেকে হবে, এমন নয়। সমাজ যদি অবৈধ সম্পদের মালিককে সম্মান দেখানো বন্ধ করে, দান-খয়রাতের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলে, আয়ের সঙ্গে জীবনযাত্রার অসংগতি দেখলে অস্বস্তি বোধ করে, তাহলে ঘুষখোরের সামাজিক আশ্রয় এমনিতে ভেঙে পড়বে। মোট কথা, রাষ্ট্রের দায়িত্ব স্বাধীন ও কার্যকর জবাবদিহির কাঠামো গড়ে তোলা; আর আমাদের দায়িত্ব ঘুষ নিয়ে নীরবতার গহ্বর থেকে বেরিয়ে আসা।

মোশতাক আহমেদ: সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা ও কলাম লেখক।
 

আরও পড়ুন

×