ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

স্থানীয় সরকার

এবার ইউপি নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে করার চ্যালেঞ্জ

এবার ইউপি নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে করার চ্যালেঞ্জ
×
×

হাসান মামুন

হাসান মামুন

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪৭ | আপডেট: ১৪ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:১৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা ইতিবাচক। সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেই নির্বাচন কমিশন (ইসি) এটা করেছে নিশ্চয়। এর আগে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী জানান, জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে জুন অবধি স্থানীয় সরকার নির্বাচন চলবে। 

মাঝে ইউপি নির্বাচনের সম্ভাব্য দিনক্ষণ নিয়ে বক্তব্য দিয়ে ইসি কিছুটা মুশকিলে পড়েছিল। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী তখন বলেছিলেন, এর দিনক্ষণ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা হয়নি। এ অবস্থায় ইসিও তার অবস্থান বদলায়। ইউপিসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার আসলে সরকারের। তার চাহিদামতো ইসির এ নির্বাচন সম্পন্ন করার কথা। 

ইসি আগে যে সময়ের মধ্যে ইউপি নির্বাচন করতে চেয়েছিল; নতুন ঘোষণা অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, সেই সময়েই নির্বাচনগুলো সারার পরিকল্পনা। নির্বাচন শুরুর সময়টা কেবল পিছিয়েছে। নভেম্বর-ডিসেম্বরে আবহাওয়া, পরীক্ষাসহ নানা কারণে নির্বাচন আয়োজন আসলেই কঠিন ছিল। এখন এটা শুরু হবে জানুয়ারির শেষদিকে। ৪৫৮৫ ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন করা মুখের কথা নয়। আগে সাত ধাপের কথা বলা হয়েছিল। এখন পাঁচ ধাপে নির্বাচনগুলো সম্পন্ন হবে। 

স্থানীয় সরকারের প্রাথমিক স্তর হলো ইউনিয়ন পরিষদ। এটাকে বলা হয় পল্লির জনসাধারণের ‘হাতের কাছের সরকার’। অনেক রকম সেবা তারা পেয়ে থাকে ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বারদের কাছ থেকে। তৃণমূলের উন্নয়নেও ইউনিয়ন পরিষদের ভূমিকা বিরাট। সুবিস্তৃত সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমেও এর ভূমিকা রয়েছে। ইউপিসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া জোরদারের নির্দেশনা রয়েছে সংবিধানে। এ বিষয়ে আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনাও বহুল আলোচিত। 

স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার কাজটি অবশ্য অবহেলিত। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সিটি করপোরেশন অবধি নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকার সংকটও মোকাবিলা করতে হচ্ছে। বোধগম্য কারণে অনেক ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বার পলাতক। ইউপি বাদে স্থানীয় সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের জনপ্রতিনিধিদের অবশ্য বাদ দেওয়া হয়েছিল। সেখানে নিয়োজিত করা হয় প্রশাসকদের। আর ইউপির শূন্য পদে প্যানেল চেয়ারম্যান কিংবা প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে কাজ চালানোর ব্যবস্থা হয়। এতে অনেক জায়গায়ই দেখা দেয় সমন্বয়হীনতা; ঘটে অচলাবস্থা। শেষতক বাড়ে জনভোগান্তি। 

এ অবস্থায় যত দ্রুত সম্ভব ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় নির্বাচন সম্পন্ন করে জনপ্রতিনিধি বসানোর দাবি ওঠে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়েই। জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি এমনকি জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানিয়ে কর্মসূচি পালন করে। বিএনপি সম্মত না হওয়ায় সরকার অবশ্য সেদিকে এগোয়নি। রাজনৈতিক বাস্তবতায় দ্রুততার সঙ্গে জাতীয় নির্বাচনে যাওয়াটাই পেয়েছিল অগ্রাধিকার। এর সঙ্গে অবশ্য জুলাই সনদকে বৈধতা দিতে গণভোটও আয়োজিত হয়। গেল ফেব্রুয়ারিতে সেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় শান্তিপূর্ণভাবে। অতঃপর নির্বাচিত সরকারের ওপর বর্তায় স্থানীয় নির্বাচন সম্পন্নের দায়িত্ব। 

এখন সরকার ও ইসিকে এই দায়িত্ব পালনের পথে এগোতে হবে। ইউপি নির্বাচন আয়োজন দিয়ে কাজটা শুরু হওয়াই ছিল স্বাভাবিক। এর পর সিটি করপোরেশন নির্বাচন অবধি যেতেও বেশি সময় নেওয়া ঠিক হবে না। এরই মধ্যে সরকার সমালোচনার মুখে পড়েছে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে দলীয় নেতাদের বসানো নিয়ে। অন্তর্বর্তী সরকার একই কাজ করেছিল; যদিও তাদের কোনো দল ছিল না। দলীয় প্রশাসকদের কেউ কেউ মানসম্মত সেবা জোগাতে পারলেও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে জনপ্রতিনিধিত্ব নিয়ে। দলীয় নেতারা দলীয় বিবেচনায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান চালাবেন বলেও শঙ্কা রয়েছে। 

এ অবস্থায় যত দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো সম্পন্ন করা যায় ততই মঙ্গল। নির্বাচনগুলো দলীয় সরকারের অধীনে হচ্ছে বলে ইসির জন্যও এটা বড় পরীক্ষা। স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে ভালো-খারাপ দুই রকম অভিজ্ঞতাই রয়েছে আমাদের। অতীতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ শাসনামলে স্থানীয় নির্বাচনে বিরোধী দলের পছন্দের প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ার উদাহরণ কিন্তু কম নেই। স্থানীয় নির্বাচনে নেতিবাচক জনমতের প্রতিফলন দেখে পরে আর সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে না যাওয়ার প্রবণতাও দেখা গেছে। এর পুনরাবৃত্তি আমরা নিশ্চয় দেখতে চাইব না। বরং দেখতে চাইব, বিএনপি সরকার সুষ্ঠুভাবে ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠানে ইসিকে সহায়তা জোগাবে এবং সেটা জনগণের কাছেও হবে দৃশ্যমান। এটা তার সাংবিধানিক দায়িত্ব বটে। গণঅভ্যুত্থানের আগে দেওয়া ৩১ দফায় তারা স্থানীয় সরকারকে জনপ্রতিনিধিত্বমূলক ও শক্তিশালী করার যে অঙ্গীকার করেছিল, সেটা বাস্তবায়নের সুযোগও এখন তাদের সামনে। এ লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান-সংক্রান্ত আইনগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাও রয়ে গেছে। অনেক আগে থেকে দফায় দফায় এ জন্য কাজও কম হয়নি। কম নেই সুপারিশ। তার কতটা কী বাস্তবায়ন হয়, সেটা দেখারও অপেক্ষায় থাকব আমরা। 

তার আগে ইউপি নির্বাচনে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটতে দিতে হবে। দলীয় মনোনয়ন ও প্রতীক ছাড়া এ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। তবে নির্বাচনে দল-মতের প্রভাব থাকবে না– তা নয়। স্থানীয় পর্যায়ে কে কোন দলের, সেটা অস্পষ্ট থাকার সুযোগ নেই। রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মীরাও যোগ দেবেন প্রচারণায়। স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে মাঠে থাকা রাজনৈতিক দলগুলো কাজও শুরু করেছে। হালে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন দলগুলোর লংমার্চ কর্মসূচির ভেতরগত উদ্দেশ্য নাকি স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো। ক্ষমতাসীন দলও চাইবে মেয়াদের শুরুর দিকে স্থানীয় নির্বাচনে জাতীয় নির্বাচনের বিজয়ের ধারা বজায় রাখতে। সে লক্ষ্য অর্জনে তারা প্রশাসনকে ব্যবহার করতে চাইলে অবশ্য সেটা নতুন বিতর্ক তৈরি করবে। 

সবচেয়ে বড় কথা, ইসিকে বিতর্কিত করা হলে গভীর রাজনৈতিক সংকট জন্ম নেবে। ইসিকেও তার আইনগত ক্ষমতা প্রয়োগের নৈতিক দৃঢ়তা দেখাতে হবে। সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে যে বর্তমান অভিজ্ঞতাহীন ইসিও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারে– তার প্রমাণ মিলেছে বিগত জাতীয় নির্বাচনে। দেশব্যাপী সেই নির্বাচন তারা সম্পন্ন করেছে এক দিনে। সাড়ে চার হাজারের বেশি ইউপির নির্বাচন করা হবে পাঁচ ধাপে। এর আয়োজন ও অনুষ্ঠান সহজতর। তা ছাড়া নিকট অতীতেই জাতীয় নির্বাচন সম্পন্নের অভিজ্ঞতা ইসির রয়েছে। এ অবস্থায় সরকারের সদিচ্ছাপূর্ণ সহায়তা পেলেই তারা সফল হতে পারবে বলে আশা। 

বিদ্যমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে অবশ্য শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজন সহজ নয়। অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকার পেরিয়ে নির্বাচিত সরকারের আমলেও আইনশৃঙ্খলার উন্নতি হয়েছে, বলা যাবে না। ইউপি নির্বাচন ঘিরে পরিস্থিতির অধিকতর অবনতিও ঘটতে পারে। সেই শঙ্কা সামনে রেখে ইউপি নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না। এর মধ্যে গণঅভ্যুত্থানে ভেঙে পড়া পুলিশকে শক্তপোক্ত করে তোলা গেলে তার হয়তো প্রয়োজন হতো না। ইউপি নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের চাইতেও সংঘাতময় হওয়ার নজির রয়েছে বলেও শঙ্কাটা বেশি। দলীয় মনোনয়নে নির্বাচন না হওয়ায় যাকে-তাকে ‘দোসর’ বানিয়ে প্রতিপক্ষ ঘায়েলের প্রবণতাও থাকবে– এটা ধরে নেওয়া যায়। এ অবস্থায় তৃণমূলে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের বিষয়টা স্থানীয় জনসাধারণের ওপরেই ছেড়ে দিতে হবে।//

হাসান মামুন: সাংবাদিক, কলাম লেখক

আরও পড়ুন

×