প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর
সম্ভাবনা কাজে লাগাইতে হইবে
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬ | ১১:৪৪
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সদ্যসমাপ্ত জাপান সফর জনপরিসরে যেই আলোচনার জন্ম দিয়াছে তাহা প্রণিধানযোগ্য। চার দিনের সফরকালে প্রধানমন্ত্রী জাপানের প্রধানমন্ত্রী এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সংস্থাপ্রধানের সহিত বৈঠক করিয়াছেন।
উপরন্তু বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদন অনুসারে, দুই দেশের মধ্যে ছয়টি দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা দলিল স্বাক্ষরিত হইয়াছে; যেখানে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সম্পর্ক, কৃষি, কর্মসংস্থান, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয় অন্তর্ভুক্ত। তৎসহিত দুইটি প্রকল্পে সাড়ে তিন সহস্রাধিক কোটি টাকা ঋণ দিবার প্রতিশ্রুতি দিয়াছে জাপান। দুই প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় আগামী পাঁচ বৎসরে বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে বিশেষত অটোমোবাইল, অন্যান্য ম্যানুফ্যাকচারিং খাত এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে প্রায় সাড়ে ছয় বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের বিষয়ও উঠিয়াছে। বস্তুত সফরটি ঘিরিয়া জনগণের বিভিন্ন অংশের মধ্যে আলোচনা উক্ত সফরসূচি চূড়ান্ত হইবার পূর্বেই শুরু হইয়াছিল।
বিশেষত বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে বিদ্যমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের ফলস্বরূপ রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের সহিত এশিয়ার শক্তিশালী দেশগুলির সম্পর্ক ভিন্নমাত্রা লাভ করিবার সম্ভাবনা উক্ত আলোচনাকে নূতন মাত্রা দিয়াছে। বিদ্যমান তীব্র অর্থনৈতিক সংকট কাটাইয়া বর্তমান সরকার শীঘ্রই ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি গড়িয়া তুলিবার যেই স্বপ্ন দেখাইতেছে, তাহা বাস্তবায়নে বাংলাদেশের একক বৃহত্তম দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী হিসাবে জাপানের সম্ভাব্য ভূমিকাও এই ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখিয়াছে।
ইহা বলিলে অতিরঞ্জন হইবে না, আলোচ্য সফরে অন্য সকল কিছুকে অতিক্রম করিয়া আলোচনার কেন্দ্রে উঠিয়া আসিয়াছে বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় অংশীদারিত্বের অন্যতম উদ্যোগ ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ বা বিগ-বি। এই উদ্যোগের আওতায় মাতারবাড়ীকে আঞ্চলিক লজিস্টিকস হাব হিসাবে গড়িয়া তুলিবার পরিকল্পনা লইয়া কার্যত দুই দশকেরও অধিক সময় যাবৎ কাজ করিতেছে দুই দেশ, যদিও প্রধানমন্ত্রীর সফরে এই উদ্যোগের নূতন নাম হইয়াছে ‘অভিন্ন সমৃদ্ধির জন্য বিগ-বি’। শীর্ষ বৈঠকের পর প্রকাশিত যৌথ ঘোষণায় বলা হইয়াছে, এই উদ্যোগের আওতায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অবকাঠামো উন্নয়নে সমন্বিতভাবে কাজ করিবে দুই দেশ। উপরন্তু ইহার লক্ষ্য শিল্পের মূল্য সংযোজন ও সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র গড়িয়া তোলা, বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনের প্রবেশদ্বার হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধি বৃদ্ধি করা। এই পরিকল্পনা পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হইলে দেশে শুধু শিল্পায়ন এবং বিপুল কর্মসংস্থানই সৃষ্টি হইবে না; আঞ্চলিক অর্থনীতি ও রাজনীতিতেও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হইয়া উঠিতে পারে। আমরা জানি, বর্তমানে বিদ্যুৎ, নির্মাণ, তৈরি পোশাক ইত্যাদি খাতে বাংলাদেশে বড় অঙ্কের জাপানি বিনিয়োগ রহিয়াছে, যেই সকল ক্ষেত্রে জাপানের প্রায় ৩৪০টি প্রতিষ্ঠান কাজ করিতেছে এবং যাহাদের অনেকেই ব্যবসা সম্প্রসারণে আগ্রহী।
তবে এই কথাও অসংগত নহে, ইতোপূর্বে জাপানেরই দেওয়া বহু সুযোগ আমরা কাজে লাগাইতে পারি নাই। উদাহরণস্বরূপ, জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশি তরুণদের প্রবেশের বহুল আলোচিত উদ্যোগটির কথা তোলা যায়। জাপানের জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ বয়স্ক। ফলে একদিকে শ্রমিক সংকট মোচন, অন্যদিকে বয়স্কদের সেবা কার্যক্রমের জন্য বাংলাদেশি তরুণদের প্রতি জাপানের আগ্রহ ছিল। মূলত বাংলাদেশের দিক হইতে বিভিন্ন নীতিগত, কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা, সমন্বয়হীনতা ও নীতিগত ধারাবাহিকতার অভাবের কারণে জাপানের সেই আগ্রহ অদ্যাবধি রূপায়িত হয় নাই। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সমস্যা, সর্বোপরি আইনশৃঙ্খলার অবনতির ন্যায় বিষয়গুলির সমাধান কতটা জরুরি তাহা সকলেরই জানা। সর্বোপরি এই অঞ্চলে ভূ-রাজনৈতিক কারণে সক্রিয় নানা শক্তির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করিয়া চলাও গুরুত্বপূর্ণ। এই সকল বিষয় সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন থাকিয়া নীতি-কৌশল গ্রহণ না করিলে প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর যে সম্ভাবনা সৃষ্টি করিয়াছে, তাহার বাস্তবায়ন দুরূহ হইবে।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়