ঢাকা সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

দুই দশকে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

দুই দশকে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
×
×

গোলাম মর্তুজা সেলিম

প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬ | ১১:৩৭

সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জনে যেমন গর্ববোধ করি, তেমনি সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে ভবিষ্যৎ নিয়েও আমার প্রত্যাশা রয়েছে। আমার বিবেচনায়, একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য শুধু কতজন শিক্ষার্থী ডিগ্রি অর্জন করলেন, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। শিক্ষার্থীরা কতটা দক্ষ হয়ে উঠছেন; তাদের গবেষণা কতটা কার্যকর হচ্ছে এবং দেশের কৃষি ও কৃষকের জীবনমান উন্নয়নে তারা কতটা অবদান রাখছেন, সেগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করে তার গবেষণার মান, নতুন জ্ঞান সৃষ্টির সক্ষমতা এবং সেই জ্ঞান বাস্তবে কাজে লাগানোর ওপর। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা ও সমন্বয়ের জন্য রয়েছে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা ব্যবস্থা। কৃষকের সমস্যা সমাধান এবং দেশের কৃষির উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে এই গবেষণা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। গবেষণার অগ্রাধিকার নির্ধারণে কৃষক ও কৃষির বাস্তব চাহিদাকে গুরুত্ব দিতে হবে। হাওরাঞ্চলে আকস্মিক বন্যায় ফসলহানি, জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা, খরা, তাপপ্রবাহ, নতুন রোগবালাই, মাটির উর্বরতা হ্রাস এবং সেচের ব্যয় বৃদ্ধি কৃষকের জীবন ও জীবিকার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় এমন গবেষণা প্রয়োজন, যার ফল মাঠ পর্যায়ে ব্যবহার করা সম্ভব। গবেষণার সাফল্য শুধু গবেষণাপত্র প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। উৎপাদন ব্যয় কমানো, ফলন ও পণ্যের গুণগত মান বাড়ানো এবং কৃষকের আয় উন্নত করাও গবেষণার সাফল্য মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হওয়া উচিত।

সিলেট অঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় হাওরকেন্দ্রিক কৃষি, আগাম বন্যা সহনশীল ধানের জাত, স্বল্পমেয়াদি ফসল, পানি ব্যবস্থাপনা, পাহাড়ি ও টিলাভূমিতে টেকসই চাষাবাদ, ফল ও সবজি উৎপাদন এবং মৎস্যসম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে। স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করে এসব ক্ষেত্রে কার্যকর সমাধান উদ্ভাবন করতে পারলে সিকৃবি আঞ্চলিক কৃষির উন্নয়নে আরও বড় অবদান রাখতে পারবে। একই সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের খরাপ্রবণ এলাকা, উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ততা এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলের কৃষি সংকট মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ে গবেষণা সহযোগিতাও বাড়ানো প্রয়োজন।

গবেষণার মান বাড়াতে পর্যাপ্ত অর্থায়ন, আধুনিক যন্ত্রপাতি, উন্নত পরীক্ষাগার, প্রয়োজনীয় উপকরণ ও দক্ষ জনবল নিশ্চিত করতে হবে। তরুণ শিক্ষকদের গবেষণায় উৎসাহিত করার পাশাপাশি স্নাতক পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের গবেষণা পদ্ধতি, তথ্য সংগ্রহ, পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ এবং বৈজ্ঞানিক ফলাফল উপস্থাপনের প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার। মাস্টার্স ও পিএইচডি পর্যায়ের গবেষণাকে জাতীয় কৃষি গবেষণার অগ্রাধিকারের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে তার সুফল আরও ব্যাপকভাবে পাওয়া সম্ভব হবে।

২০০৬ সালের ২ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা করা সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় দুই দশকে কৃষিশিক্ষা ও গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বর্তমানে সাতটি অনুষদ ও ৪৭টি বিভাগ রয়েছে। কৃষি ও সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় শিক্ষা ও গবেষণার এই বিস্তৃত পরিসর কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ভবিষ্যতে আরও এগিয়ে যেতে পারে। আগামী দিনের সিকৃবির জন্য কয়েকটি লক্ষ্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের দক্ষ ও নৈতিকতাসম্পন্ন কৃষিবিদ হিসেবে গড়ে তোলা, মানসম্মত গবেষণার পরিসর বাড়ানো, কৃষকের সমস্যা সমাধানে গবেষণার ফল কাজে লাগানো, প্রযুক্তি উদ্ভাবনের সঙ্গে কৃষি সম্প্রসারণের সংযোগ জোরদার করা এবং কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির পরিবেশ গড়ে তোলা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করতে হবে। তবে গবেষণার উৎকর্ষ যেন দেশের কৃষি ও কৃষকের প্রয়োজন থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়।

সিকৃবির সবচেয়ে বড় অর্জন হবে এমন দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা, যারা বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও গবেষণার ফলকে কৃষকের বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে পারবেন। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গত ২০ বছরের অভিজ্ঞতা আগামী দিনের অগ্রযাত্রার ভিত্তি হয়ে উঠুক।

গোলাম মর্তুজা সেলিম: সদস্য সচিব, জাতীয় কৃষক শক্তি

আরও পড়ুন

×