ঢাকা সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬

আন্তর্জাতিক

ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তি নিয়ে সতর্ক আশাবাদ রয়েছে

ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তি নিয়ে সতর্ক আশাবাদ রয়েছে
×
×

এম কে ভদ্রকুমার

প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬ | ১১:৩৯

ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তির ক্ষেত্রে হয়তো তেমন অগ্রগতি হয়নি, কিন্তু ২৭ অক্টোবর ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব এবং নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জোনাস গার স্টোরের রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে করা যৌথ ফোনকলকে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। এই দুই নর্ডিক নেতা জোর দিয়ে বলেছেন, তাদের এ উদ্যোগ ইউরোপের পক্ষ থেকে নয়, বরং শুধু রাশিয়ার প্রতিবেশী হিসেবেই নেওয়া হয়েছে। বাস্তবতা হলো, তাদের এ উদ্যোগ এসেছিল ২০ অক্টোবর অসলোতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ও মার্কিন বিশেষ দূত স্টিফেন উইটকফের সঙ্গে তাদের একান্ত বৈঠক থেকে।

স্পষ্টতই ইউরোপীয় দেশগুলো রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের পথ ফের স্থাপনের চেষ্টা করছে। আলোচনা প্রক্রিয়ায় ফিনল্যান্ড ও নরওয়ের প্রবেশ এটাই ইঙ্গিত দেয়, এমনকি ইউক্রেনের সবচেয়ে সোচ্চার সমর্থকরাও রাশিয়ার সঙ্গে সংলাপের পক্ষে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নরওয়ে কিয়েভকে প্রায় ১৭ বিলিয়ন ইউরো সহায়তা দিয়েছে, অন্যদিকে ফিনল্যান্ড দিয়েছে পাঁচ বিলিয়ন ইউরো।

২১ অক্টোবর উইটকফ ইউক্রেন বিষয়ে কিছু নতুন প্রস্তাব দিতে অসলো থেকে সেন্ট পিটার্সবার্গে আসেন। এ আলোচনার ফলস্বরূপ প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র-ইউক্রেন-রাশিয়া ত্রিপক্ষীয় আলোচনা অনুষ্ঠিত হতে চলেছে, যা প্রাথমিকভাবে নভেম্বরের শুরুতে আবুধাবিতে হওয়ার কথা। জেলেনস্কি বলেছেন, পুতিনের সঙ্গে কথা বলার পর স্টাব এবং স্টোরে তাঁকে আলোচনার বিষয়ে জানিয়েছেন এবং তিনি তাদের ‘সক্রিয় সমর্থনের’ জন্য কৃতজ্ঞ। 

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে মস্কোর ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ শুরু হওয়ার পর বরাবরই নিজেদের অবস্থান উঁচুতে রাখার চেষ্টা করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। কিন্তু রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনার ব্যাপারে দ্বিধাবিভক্তি থাকলেও তারা বুঝতে পারছে, শেষ ট্রেনটি স্টেশন ছেড়ে যাচ্ছে। শান্তি প্রস্তাবগুলোর বিষয়ে পুতিনের প্রতিক্রিয়া উইটকফের কাছ থেকে শুনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়তো অনুমান করছেন, শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার উপযুক্ত মুহূর্ত আসন্ন। মার্কিন ফার্স্ট লেডির মধ্যস্থতায় খেরসন অঞ্চলের রুশ অধিকৃত ওলেশকি শহরে একটি স্থানীয় মানবিক যুদ্ধবিরতির ফলে ক্রেমলিন এবং তাঁর স্ত্রী মেলানিয়ার মধ্যে যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাপূর্ণ কার্যকরী সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে ট্রাম্প নিশ্চয় বেশ ‘ভালো’ অনুভব করছেন। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ ইঙ্গিত দিয়েছেন ওলেশকিতে যুদ্ধবিরতি সংঘাত রেখার অন্যান্য এলাকার জন্যও মডেল হতে পারে, ‘বিশেষ করে যখন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পসহ মার্কিন আলোচকদের ইতিবাচক ও সমন্বয়মূলক অংশগ্রহণের বিষয়টি আসে।’

সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া ডিজেল চুক্তির পরবর্তী ধাপে অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থা চালুর চিন্তাভাবনা চলছে। জানা গেছে, ট্রাম্প রাশিয়ান ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের (রুশ অর্থনীতিতে যৌথ বিনিয়োগের জন্য রুশ সরকার কর্তৃক সৃষ্ট কমপক্ষে ১০ বিলিয়ন ডলারের সার্বভৌম সম্পদ তহবিল) ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কথা বিবেচনা করছেন। 

ট্রাম্প কার্যত লিন্ডসে গ্রাহাম আইনটি নিষ্ক্রিয় করে রেখেছেন, যা তাঁকে রাশিয়ার তেল-গ্যাস রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষমতা দিয়েছে। তিনি মার্কিন কৃষকদের চাহিদা মেটাতে বিপুল পরিমাণ রুশ সার আমদানির জন্য চুক্তি করার পরিকল্পনাও নাকি করছেন। ট্রাম্প সম্ভবত এই সবকিছু আলোচনায় রুশ পক্ষকে নমনীয় হতে ‘উৎসাহিত’ করার একটি কৌশল হিসেবে ভাবছেন। এটি নিঃসন্দেহে সামগ্রিক রুশ-মার্কিন সম্পর্কে স্থিতিশীলতা আনবে। এ নিয়ে পূর্বাভাস যোগ্যতাও আসবে।

দুই নর্ডিক নেতার সঙ্গে পুতিনের টেলিফোন কথোপকথনের ক্রেমলিন বিবরণীতে তিনটি মূল বিষয় তুলে ধরা হয়েছে: প্রথমত, নভেম্বরের শুরুতে আবুধাবিতে রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আসন্ন ত্রিপক্ষীয় আলোচনার মূল উদ্দেশ্য ‘বিশেষভাবে সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতি অর্জিত হলে রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিতের উপায় নিয়ে আলোচনা করা।’ দ্বিতীয়ত, পুতিন জোর দিয়ে বলেছেন, ‘একটি ন্যায়সংগত ও স্থায়ী শান্তি কেবল তখনই সম্ভব হবে যদি রুশ ফেডারেশনের স্বার্থ সম্পূর্ণরূপে এবং কোনো শর্ত ছাড়াই বিবেচনা করা হয়।’ তৃতীয়ত, পুতিন ‘ইইউ এবং ন্যাটোর সংঘাতমূলক নীতি’র তীব্র বিরোধিতা করেন, ‘যা সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করছে।’ এখানে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর উত্তেজনা বৃদ্ধির পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে।

অবশ্যই নভেম্বরের এই ত্রিপক্ষীয় আলোচনা সংঘাতের অবসান ঘটাতে পারবে না। ইইউ দেশগুলো সংঘাত নিরসনে নিজেদের অবস্থান নিয়ে বেশি মনোযোগী, কিন্তু সামাজিক দায়বদ্ধতায় মনোনিবেশ করতে চায় না। তবে ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তি নিয়ে সতর্ক আশাবাদ করাই যায়।

এম কে ভদ্রকুমার: ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক; ইন্ডিয়ান পাঞ্চলাইন থেকে ভাষান্তর সমকালের সহকারী সম্পাদক সাইফুর রহমান তপন

আরও পড়ুন

×