অন্যদৃষ্টি
কাছের মানুষ, দূরের মানুষ
ইয়াসির সিলমী
প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:০৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
কারও সঙ্গে সময় কাটানোর সময় ফোনে ব্যস্ত থেকে তাঁকে উপেক্ষা করার প্রবণতাকে বলা হয় ‘ফাবিং’। কথা বলতে বলতে পর্দায় চোখ রাখা, অন্যজনের কথা শোনার মাঝখানে নোটিফিকেশন দেখা কিংবা একসঙ্গে বসেও নিজের ভার্চুয়াল জগতে ডুবে থাকা–এসব এর পরিচিত উদাহরণ।
২০২৫ সালে ফ্রন্টিয়ার্স ইন সাইকোলজি সাময়িকীতে প্রকাশিত ৫২টি গবেষণার একটি মেটা-বিশ্লেষণে প্রায় ১৯ হাজার ৭০০ অংশগ্রহণকারীর তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। এতে দেখা যায়, সঙ্গীর সামনে ফোনে ব্যস্ত থাকার সঙ্গে সম্পর্কের সন্তুষ্টি, ঘনিষ্ঠতা ও পারস্পরিক সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা কমে যাওয়ার সম্পর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে বাড়তে পারে দ্বন্দ্ব ও ঈর্ষা।
আজকের তরুণদের জীবন বিশেষভাবে এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বন্ধুর সঙ্গে দেখা না করেও নিয়মিত মিম পাঠানো যায়, জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানানো যায়, সামাজিক মাধ্যমে ছবি দেখে তার জীবনের খবরও রাখা যায়। এতে যোগাযোগের ধারাবাহিকতা থাকে। কিন্তু যোগাযোগ আর অর্থবহ কথোপকথন এক জিনিস নয়।
সামাজিক মাধ্যমে অন্যের জীবনের আনন্দময় মুহূর্তগুলো প্রায় অবিরাম সামনে আসে। কেউ বিদেশে ঘুরছেন, কেউ নতুন চাকরি পেয়েছেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ করছেন। নিজের জীবনের সঙ্গে এসব দৃশ্যের তুলনা করতে করতে কারও মনে হতে পারে, অন্যরা সবাই এগিয়ে যাচ্ছেন, শুধু তিনিই পিছিয়ে আছেন।
সামাজিক মাধ্যমে দেখা জীবন সাধারণত পুরো জীবনের প্রতিচ্ছবি নয়। মানুষ সেখানে সচরাচর আনন্দ, সাফল্য ও অর্জনের মুহূর্তগুলো বেশি তুলে ধরে। সেই নির্বাচিত দৃশ্যের সঙ্গে নিজের জীবনের ব্যর্থতা, অনিশ্চয়তা ও একাকিত্বের তুলনা করলে হতাশা বাড়তে পারে।
এই পরিস্থিতির সমাধান প্রযুক্তিকে শত্রু বানানো নয়। বরং প্রযুক্তির সঙ্গে নিজের সম্পর্কটিকে নতুন করে সাজানো। সব সময় ফোন বন্ধ রাখা সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নেই। কিন্তু কখন ফোন ব্যবহার করব আর কখন অন্য মানুষকে সময় দেব–এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ফিরিয়ে আনা জরুরি।
শুরুটা হতে পারে খাবার টেবিল থেকে। পরিবারের সবাই যদি অন্তত ২০ থেকে ৩০ মিনিট ফোন সরিয়ে রেখে খাওয়ার সময় কথা বলেন, তাহলে সেটি সম্পর্কের জন্য অর্থবহ অভ্যাস হয়ে উঠতে পারে। শুধু তরুণদের ফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে লাভ নেই; মা-বাবাকেও একই নিয়ম মানতে হবে। কারণ পরিবারে অভ্যাস গড়ে ওঠে উপদেশের চেয়ে উদাহরণ থেকে বেশি। মনে রাখতে হবে রাতের খাবারের টেবিলই হলো পারিবারিক সংসদ, যেখানে সবার সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি।
বন্ধুদের আড্ডায়ও ছোট পরিবর্তন আনা যায়। একসঙ্গে বসে প্রত্যেকে নিজের ফোনে ব্যস্ত না থেকে একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করা, দিনের কোনো মজার বা কঠিন অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া কিংবা একসঙ্গে হাঁটতে যাওয়া যেতে পারে। ঘুমানোর আগে এবং ঘুম থেকে ওঠার পর কিছু সময় ফোন থেকে দূরে থাকাও সহায়ক হতে পারে। প্রয়োজন হলে অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করা কিংবা নির্দিষ্ট অ্যাপ ব্যবহারের সময়সীমা ঠিক করে নেওয়া যায়।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, অন্যের সঙ্গে থাকার সময় নিজের মনোযোগ কোথায় আছে, তা খেয়াল করা। কেউ কথা বললে ফোন নামিয়ে রাখা, চোখ তুলে তাকানো, মাঝপথে বাধা না দিয়ে শোনা–এগুলো খুব সাধারণ আচরণ। অথচ সম্পর্কের যত্ন অনেক সময় এমন সাধারণ আচরণের মধ্যেই প্রকাশ পায়।
প্রযুক্তি আমাদের হাতে অসংখ্য মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দিয়েছে। সেই সুযোগের ভিড়ে আমরা যেন কাছের মানুষটির কথা শুনতে ভুলে না যাই। পৃথিবীর অন্য প্রান্তে কী ঘটছে, তা জানা গুরুত্বপূর্ণ। তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়, পাশের ঘরে থাকা মা আজ কেন চুপচাপ, সঙ্গী কেন মন খারাপ করে আছে কিংবা নিজের সন্তান সারাদিনের কোন অভিজ্ঞতাটি আমাদের বলতে চাইছে।
ইয়াসির সিলমী: সহকারী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ
[email protected]
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি