ঢাকা শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬

আলুর মূল্য হ্রাস

বাম্পার ফলনেও সর্বনাশ

বাম্পার ফলনেও সর্বনাশ
×
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:১১

| প্রিন্ট সংস্করণ

মৌসুম চলিয়া গেলে সাধারণত পুরানো আলু পঞ্চাশ টাকা, নূতন আলু মৌসুমে দেড়শ টাকা পর্যন্ত কেজিতে বিক্রয় হইয়া থাকে। কিন্তু বর্তমানে কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ের অর্ধেকে নামিয়াছে আলুর দাম। বৃহস্পতিবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদন হইতে জানা যাইতেছে, আলুর মূল্য এইবার এতই কম যে কৃষকেরা হিমাগারে সংরক্ষিত আলু তুলিতেও আগ্রহ হারাইতেছেন। ইহার মধ্যে নূতন আলু বাজারে চলিয়া আসিয়াছে। অর্থাৎ পুরাতন আলুর মূল্য আরও কমিবে। ফলস্বরূপ, এইবারও হয়তো কৃষককে সড়কে আলু ফেলিতে হইবে। চলতি বৎসরে পেঁয়াজের গতি হইয়াছিল পানিতে, ক্ষেতে টমেটো পচিয়া গিয়াছে। 
দেশের উৎপাদিত সকল প্রকার কৃষিপণ্যের তালিকায় চাল ডালের পরই আলুর কৌলিন্য ছিল সর্বাগ্রে। সেই ফসলটি মৌসুম শেষে সমগ্র বছরের সংসার খরচ, ঋণ পরিশোধ–এমনকি পরের মৌসুমের চাষের পুঁজিরও জোগান দিয়া আসিতেছিল। অথচ সেই আলুর দাম লইয়াই কৃষকের এখন দুশ্চিন্তার শেষ নাই। প্রতি শীতকালের পূর্বেই আলু লইয়া কৃষকের গুরুদশা দেখিয়া প্রশ্ন জাগিতেছে, কোনো সরকার কি অঞ্চলভিত্তিক চাহিদা নিরূপণ ও তথ্যভিত্তিক উৎপাদন পরিকল্পনা লইয়া ভাবিতে পারে না? দীর্ঘ মেয়াদে সংরক্ষণ, বাজারমূল্য নির্ধারণ, বাজার ব্যবস্থাপনা লইয়া গবেষণার প্রয়োজন আমরা কোনোকালেও অনুভব করি নাই। সর্বোপরি রোদে পুড়িয়া কাদামাটি মাখিয়া ফসল উৎপাদন করা ব্যক্তিটি নগরের সৌম্যকান্তি শিক্ষিত নীতিনির্ধারকদের নিকট আগাগোড়াই পর হইয়া রহিয়াছেন। সেই সকল কৃষকের ব্যথা বুঝিবার অবকাশ নাই কাহারো। 

সমকালের প্রতিবেদন হইতে জানিতে পারিতেছি, রংপুরের বদরগঞ্জের আলুচাষি আমিনুল ইসলাম ২০১৪ সাল হইতে সাতবার এই ফসলে লোকসান গুনিয়াছেন। হিমাগারে তিনি ৩০০ বস্তা আলু রাখিয়াছেন এখন। কোথাও হিমাগারের দ্বারে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হইতেছে ৯ হইতে সাড়ে ৯ টাকায়। খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার স্বপ্ন দেখিলে বাজারব্যবস্থাপনার দিকে নজর রাখিবার বিকল্প থাকিতে পারে না। চাহিদার অতিরিক্ত ফলনের কারণে এই দেশে শুধু আলুচাষিরাই নহে, ধানসহ অন্যান্য ফসলের উৎপাদকেরাও প্রায়ই এহেন ভয়ংকর অভিজ্ঞতার সম্মুখী হন। এই বিষয়টি লইয়া নানা পর্যায়ে এযাবৎ আলোচনাও কম হয় নাই। কিন্তু সরকারের পর সরকার আসিয়াছে ও গিয়াছে, সমস্যাটিও যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রহিয়া গিয়াছে। নিঃসন্দেহে, সংখ্যায় জনসংখ্যার বৃহত্তম অংশ হইলেও কৃষকেরা সংগঠিত নহেন, ফলে সরকার তথা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের উপর সম্মিলিত চাপ সৃষ্টিও তাহাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। কিন্তু ইহা অস্বীকারের কোনো উপায় নাই যে, পুনঃপুন লোকসানের মুখে পড়িযা কৃষক যদি উৎপাদনেই উৎসাহ হারাইয়া ফেলেন তাহা হইলে সমগ্র জাতিকেই গভীর সংকট মোকাবিলা করিতে হইবে। 

চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হইলে দাম কমিয়া যায় ইহা অর্থনীতির সাধারণ সূত্র। এই সাধারণ হিসাবটুকু কৃষি পরিকল্পনায় কেন প্রতিফলিত হইতেছে না উহা বোধগম্য নহে। কোন অঞ্চলে কত আলু প্রয়োজন, কোথায় কত উৎপাদন হইতেছে, হিমাগারের ধারণক্ষমতা কত এবং বাজারে নূতন আলু আসিবার পূর্বে পুরানো আলু কীভাবে বিপণন হইবে–এই সকল তথ্য কি সরকারের হাতে থাকিবার কথা নহে? এইরূপ পরিস্থিতিতে স্থায়ী সমাধানের দিকে আগাইতে হইবে নীতিনির্ধারকদিগের। সরকারকে অঞ্চলভিত্তিক চাহিদা নিরূপণ ও তথ্যভিত্তিক উৎপাদন পরিকল্পনা লইয়া কাজ করিতে হইবে। কৃষিকে শুধু উৎপাদনের পরিসংখ্যান দিয়া বিচার করিবার সুযোগ নাই। কৃষকের আয়, উৎপাদন ব্যয় ও বাজারে ন্যায্যমূল্য পাওয়ার নিশ্চয়তাই হওয়া উচিত কৃষিনীতি মূল্যায়নের মাপকাঠি। সহজ হিসাব, চাহিদার অতিরিক্ত উৎপাদন না হওয়ায় ফসলের দাম কমিবার ঝুঁকি থাকে না। অথচ আমাদের কৃষকেরা ফলন খারাপে অনিরাপদ, ফলন ভালো হইলেও নিরাপদ নহেন।

আরও পড়ুন

×