ঢাকা শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬

অর্থনীতি

একই সম্পত্তিতে বহুমুখী কর কতটা ন্যায্য

একই সম্পত্তিতে বহুমুখী কর কতটা ন্যায্য
×
×

ফয়সাল ইসলাম

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:১০

| প্রিন্ট সংস্করণ

একজন মানুষ জীবনের দীর্ঘ সময় পরিশ্রম করে, নিয়মিত আয়কর পরিশোধের পর সঞ্চিত অর্থে একটি জমি বা বাড়ির মালিক হন। নিবন্ধনসহ প্রযোজ্য বিভিন্ন কর ও ফি দিয়েই তিনি তা হন। আবার পরবর্তী সময়ে সেই জমিতে নিজে বা কোনো ডেভেলপারের মাধ্যমে যখন বাড়ি নির্মাণ করেন, তখনও নানাবিধ কর দিতে হয়। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, বাংলাদেশের বর্তমান করব্যবস্থা কতটা ন্যায়সংগত, যৌক্তিক ও করদাতাবান্ধব?

মূলধনি মুনাফা কর ও বাস্তব পরিশোধ ক্ষমতার সংকট
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ৫৮(৩)-এর বিধান অনুযায়ী, ভূমি মালিক উন্নয়ন চুক্তির মাধ্যমে নগদ অর্থ, ফ্ল্যাট কিংবা অন্য কোনো সুবিধা গ্রহণ করলে তা মূলধনি প্রাপ্তি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। প্রাপ্ত সুবিধার আর্থিক মূল্য থেকে সংশ্লিষ্ট ভূমির গ্রহণযোগ্য অর্জনমূল্য বাদ দিয়ে নির্ধারিত মুনাফার ওপর ১৫ শতাংশ হারে কর আরোপের বিধান রয়েছে। করটি সংশ্লিষ্ট করবছর ও পরবর্তী দুই করবছরে সমান কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ থাকলেও বাস্তব সমস্যার পূর্ণ সমাধান এতে হয় না। 

এখানে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, দীর্ঘদিন আগে কেনা জমির ঐতিহাসিক মূল্য ও বর্তমান বাজারমূল্যের পার্থক্যের কতটা প্রকৃত মুনাফা আর কতটা মূল্যস্ফীতিজনিত নামমাত্র বৃদ্ধি? অর্জনমূল্য নির্ধারণে মূল্যস্ফীতি ও প্রাসঙ্গিক ব্যয় যথাযথভাবে বিবেচিত না হলে করযোগ্য মুনাফা বাস্তব অর্থনৈতিক লাভের তুলনায় বেশি প্রতীয়মান হতে পারে।

একই প্রকল্পে একাধিক করের অর্থনৈতিক প্রভাব
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ২(৪০) অনুযায়ী, ‘ডেভেলপার’ বলতে এমন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে বোঝায়, যিনি নিজের বা অন্যের জমি উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ, প্লট তৈরি কিংবা আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প ভবন নির্মাণ, উন্নয়ন বা পুনঃউন্নয়নের মাধ্যমে সম্পত্তি বিক্রয়, হস্তান্তর, বরাদ্দ বা ইজারা দিয়ে আয় করেন বা আয়ের উদ্দেশ্যে কাজ করেন। ভূমি মালিকের সঙ্গে যৌথ উন্নয়ন চুক্তি, অপরিবর্তনযোগ্য ক্ষমতাপত্র বা অন্য কোনো ব্যবস্থায় উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনাকারীও এ সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত।

আইনের ধারা ১১৫ অনুযায়ী, ডেভেলপার কর্তৃক ভূমি মালিককে প্রদত্ত সাইনিং মানি, পণ্যমূল্য, বাড়িভাড়া বা নির্ধারিত অন্যান্য অর্থের ওপর ১৫ শতাংশ উৎসে কর কর্তনের বিধান রয়েছে। অন্যদিকে ধারা ১২৬ অনুযায়ী, ডেভেলপার পর্যায়ে নির্ধারিত কর পরিশোধ ছাড়া সংশ্লিষ্ট সম্পত্তি হস্তান্তরের দলিল নিবন্ধন সম্ভব নয়।
ভূমি মালিক ও ডেভেলপার পৃথক করসত্তা হওয়ায় তাদের করদায়কে সরাসরি আইনগত দ্বৈত কর বলা যায় না। তবে ডেভেলপারের করব্যয় প্রকল্পের মোট ব্যয়ে যুক্ত হয়ে ভূমি মালিকের প্রাপ্য অংশ, ফ্ল্যাটের মূল্য ও চূড়ান্ত ক্রেতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
পাশাপাশি নির্ধারিত সীমার বেশি নিট সম্পদের অধিকারী ব্যক্তি করদাতার আয়করের ওপর সারচার্জ প্রযোজ্য হতে পারে। এটি সরাসরি সম্পত্তির মূল্যের ওপর কর নয়; তবে নগদ অর্থের স্বল্পতা থাকা সত্ত্বেও মূলধনি মুনাফা করের সঙ্গে অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই পৃথক করহারের পাশাপাশি প্রকল্পের সম্মিলিত কার্যকর করব্যয় এবং এর প্রকৃত অর্থনৈতিক ভার কার ওপর পড়ছে, তা মূল্যায়ন জরুরি।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা
মালয়েশিয়ায় রিয়েল প্রপার্টি গেইনস ট্যাক্সের ক্ষেত্রে সম্পত্তি ধারণের মেয়াদ গুরুত্বপূর্ণ। নির্দিষ্ট শ্রেণির ব্যক্তি করদাতার জন্য ষষ্ঠ বছর বা পরবর্তী সময়ে সম্পত্তি বিক্রয়ের মুনাফায় শূন্য শতাংশ করহার প্রযোজ্য হতে পারে। অন্যদিকে সিঙ্গাপুরে সাধারণ মূলধনি লাভের ওপর পৃথক কর না থাকলেও ব্যবসায়িক প্রকৃতির সম্পত্তি লেনদেন থেকে অর্জিত মুনাফা করযোগ্য হতে পারে এবং স্বল্পমেয়াদি বিক্রয়ে বিশেষ স্ট্যাম্প শুল্ক প্রযোজ্য হয়। 

সংস্কারের পথ কোথায়?
বিদ্যমান করব্যবস্থা, সাধারণ করদাতাদের অসন্তোষ ও প্রত্যাশা এবং সামগ্রিক আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে: 
প্রথমত, বিশেষত ছয় বছর বা তার বেশি সময় ধরে ধারণকৃত জমি বা স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে মূলধনি মুনাফার ওপর করহার সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ এবং ছয় বছরের কম সময় ধরে ধারণকৃত সম্পত্তির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ নির্ধারণ করা যেতে পারে। 

দ্বিতীয়ত, ন্যূনতম ছয় বছরের অর্জিত সম্পত্তির ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি সমন্বিত অর্জনমূল্য নির্ধারণের বিধান রাখা উচিত, যাতে নামমাত্র মূল্যবৃদ্ধির পরিবর্তে প্রকৃত অর্থনৈতিক মুনাফার ওপর কর আরোপ করা যায়। এ ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি সমন্বিত অর্জনমূল্য = প্রকৃত অর্জনমূল্য × (সম্পত্তি হস্তান্তরের বছরের ভোক্তা মূল্যসূচক ÷ সম্পত্তি অর্জনের বছরের ভোক্তা মূল্যসূচক) সূত্র অনুসরণ করা যেতে পারে। 
তৃতীয়ত, উৎসে কর্তিত করের হার হ্রাস, স্বচ্ছ সমন্বয়, প্রকল্পভিত্তিক সম্মিলিত করব্যয় মূল্যায়ন এবং সম্পদ সারচার্জের প্রভাব পর্যালোচনা জরুরি। পাশাপাশি সাধারণ ব্যক্তি করদাতার জন্য পূর্বানুমানযোগ্য ও সহজ কর নিষ্পত্তি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা দরকার। 
রাষ্ট্রের উন্নয়নে রাজস্ব অপরিহার্য, তবে করনীতি হতে হবে ন্যায্য ও অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক। সফল করব্যবস্থার মানদণ্ড শুধু রাজস্ব আদায় নয়; বরং করদাতার আস্থা, বিনিয়োগের প্রসার এবং রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে ন্যায়সংগত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা।

ফয়সাল ইসলাম: ফেলো চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও আর্থিক খাত বিশ্লেষক।
[email protected]

আরও পড়ুন

×