যুদ্ধ ও বার্বি ডল বনাম মাটির টেপা পুতুল
পাভেল পার্থ
পাভেল পার্থ
প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:২২ | আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ | ২১:৪৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
যুদ্ধ-আক্রান্ত দুনিয়ায় তেলের জন্য অপেক্ষারত এক লম্বা লাইন থেকে কুড়িয়ে পাওয়া অতি সাধারণ এক প্রশ্ন দিয়ে চলতি আলাপ শুরু হচ্ছে। বাংলাদেশের শহরের খেলনা দোকান কিংবা বাসাবাড়িতে কি মাটির টেপা পুতুল আছে? কিংবা কোনো উপলক্ষে শিশুদের কি মাটির টেপা পুতুল উপহার দেওয়া হয়? এসব প্রশ্নের উত্তর হবে–আমাদের দোকান, সংসার বা উপহারের ডালিতে টেপা পুতুল নাই। আছে দুনিয়া কাঁপানো বার্বি ডল। আছে ডিজনি প্রিন্সেস, এলসা, আনা, মোয়ানা, সিন্ডারেলা, ফ্রোজেন, মনস্টার হাই, আমেরিকান গার্ল, বেবি এলাইভ, রেইনবো হাই, লিকা চ্যান কিংবা নতুনভাবে বাজার মাতানো লাবুবু। বহুজাতিক কোম্পানির এসব পুতুলের নাম শিখতে শিশুদের বাধ্য করা হয়। টেপা পুতুলের জগৎ আমরা শিশুদের জন্য বন্ধ করে রেখেছি। এক খেলনা পুতুলের ভেতর দিয়েও শিশুদের মগজের বাণিজ্যিক বিশ্বায়ন ঘটানো হচ্ছে। শিশুদের দুনিয়া আজ প্রশ্নহীনভাবে বার্বিময়। হাজারো পানীয়কে সরিয়ে যেভাবে কোকাকোলায়ন ঘটে বা রান্নাঘর দখল করে ম্যাগি, সেভাবেই শিশুদের দুনিয়ায় ‘বার্বিআয়ন’ ঘটছে। অধিপতি বার্বি দুনিয়ার শিশুরা আজ নিদারুণভাবে বন্দি। খেলনার বাণিজ্য ও রাজনীতির ভেতর দিয়েও সহিংসতা, যুদ্ধ, দখল, জুলুমকে শিশুমনে ‘স্বাভাবিক’ করে তোলা হচ্ছে। বৈচিত্র্যকে হটিয়ে আমাদের মনস্তত্ত্বকে বাইনারি বর্ণবাদের আস্তরণে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে।
বসন্তপুরের টেপা পুতুল
পৃথিবীর বহু দেশে মাটির পুতুলের ঐতিহাসিক চল আছে। বাংলাদেশে যেমন মাটির টেপা পুতুল, ভারতে কৃষ্ণনগরের পুতুল বা বাঁকুড়ার ঘোড়া, জাপানে হাকাতা পুতুল, রাশিয়ায় ডাইমকোভো, মেক্সিকোতে তালাভেরাক্যাটরিনা, চীনে হুইশান, ইতালিতে প্রিসেপিও কিংবা গ্রিসে তানাগ্রা পুতুল। বিশ্বে সর্বাধিক বিক্রীত মাটির পুতুল চীনের হুইশান পুতুল। মাটির টেপা পুতুলের চল বাংলাদেশে কত প্রাচীন, তার কোনো গবেষণা দলিল আমার নাগালে নেই। তবে বসন্তপুর পালপাড়া থেকে জানা যায়, মহাস্থানগড় কিংবা পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারে প্রাপ্ত মাটির পুতুলের উত্তরাধিকার তাদের টেপা পুতুল। বরেন্দ্র অঞ্চলের পুরাকীর্তি এখানকার কুমারদের তৈরি। বাংলাদেশে বিভিন্ন অঞ্চলে টেপা পুতুলের গড়ন, ধরন এবং নকশাতে সুস্পষ্ট সামাজিক সম্পর্ক, শৈল্পিক ভিন্নতা ও বৈচিত্র্য বিদ্যমান। শখের হাঁড়ির জন্য সর্বপরিচিত হলেও রাজশাহীর বসন্তপুরে টেপা পুতুলও তৈরি হয়। বসন্তপুর রীতির টেপা পুতুলের মুখটি অর্ধগোলাকৃতি এবং মাটির বুটলি দিয়ে চোখ বানিয়ে তার ভেতর কাঠি দিয়ে গর্ত করে চোখের মণি দেওয়া হয়। পুতুলের কানগুলো কিছুটা বড় এবং প্রাণীদের মতো দেখতে, কানে কাম-কাঠির দাগ থাকে।
হাতে টিপে টিপে এই পুতুল বানানো হয় বলে এর নাম ‘টেপা পুতুল’। একসময় গ্রামে গ্রামে শিশুরা নিজেরাই মাটি দিয়ে পুতুল বানাত, পরিবারের প্রবীণেরাও শিশুদের বানিয়ে দিতেন। টেপা পুতুলের উদ্ভাবক কুমার পরিবারের নারীরাই। শিল্পী সুবোধের মা কিংবা ঠাকুরমা ইন্দুবালা পাল ও অষ্টমী পালের কাছে তালিম নিয়ে সুবোধের স্ত্রী বিজলী রানী পালও একজন টেপা পুতুল শিল্পী। বসন্তপুরের টেপা পুতুল কারিগরদের মৌখিক ইতিহাস থেকে জানা যায়, আগের দিনে রাজা ভরত বা বিশ্বকর্মার আদলে হাতির পিঠের উপর টেপা পুতুল বানানো হতো, কলসি কাঁখে বা মাথায় হাঁড়ি নিয়ে রাধিকার গোয়ালিনী রূপ বানানো হতো। ষষ্ঠী দেবীকে চিন্তায় রেখে বানানো হতো মায়ের কোলে শিশু টেপা পুতুল। আগের দিনে নানা প্রাকৃতিক রং দিয়ে পুতুল রং করা হতো। কলসি কাঁখে পানি আনা, মায়ের কোলে শিশু, কৃষক, জামাই-বউ, নতুন বউ, ধান ভানা, জাঁতি ঘুরানো, গরু লালনপালন, পালকি, বাউল, নথ পরা বউ, মাছ ধরা, হাতি, ঘোড়া, পাখি, মাছ, চুলে বিলি কাটা, মাছ কাটা, ঢেঁকি পাড়, সাপের খেলাসহ গ্রামীণ কৃষক সমাজের, বিশেষ করে নারীর সারাদিনের কাজের প্রতীকী ব্যঞ্জনা এবং চারধারের প্রাণ-প্রকৃতি বেশি মূর্ত হয় টেপা পুতুলে। কর্মরত পুতুলদের কাজের ভিত্তিতেই তাদের নাম রাখা হয়। গ্রামীণ পেশাজীবীরা যেসব কাজ করেন প্রতিদিন, সেসব শ্রমঘন রূপকল্পের শৈল্পিক উপস্থাপনই টেপা পুতুল। তবে বর্তমানে শহুরে শিল্পদরদি নাগরিকের চাহিদা ও বাজার অনুযায়ী টেপা পুতুলের উপস্থাপনে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। এখন পুতুল রং করা হয় না। পোড়ামাটির লাল বা কালো এক রঙের পুতুলই বেশি তৈরি হয়। এমনকি গ্রামীণ শ্রমঘন কাজের রূপকল্পের সঙ্গে আরও কিছু বিষয় যুক্ত হয়েছে, যেমন নারীর কোলে পাখি। টেপা পুতুল শুধু শখ, বিনোদন বা শিশু খেলনা নয়; এটি এক সামাজিক আনন্দ রচনার মাধ্যম। মেলা বা হাট থেকে কেনা একটি পুতুল একটি পরিবারে সবাইকে সৃজনশীল শিল্পচর্চার প্রতি দায়বদ্ধ করে তোলে। এমনকি পুতুল নানা সামাজিক আয়োজন ও কৃত্যমূলক পরিবেশনায় ব্যবহৃত হয়। ঢাকার সাভারের নয়ারহাটের ঘোড়া পীরের মাজার, দিনাজপুরের ঘোড়াপীর মাজার কিংবা গাজীপুরের কালিয়াকৈরে কেশবপাগলের মেলায় মাটির ঘোড়া ও পুতুল মানত ও উৎসর্গ করতে দেখা যায়।
নানান চাপের কারণে গ্রামীণ শিশুবেলা থেকে পুতুল বানানো হারিয়ে গেছে, পালপাড়াতেও টেপা পুতুল বানানোর চল এখন সীমিত। টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনা, বরিশাল, ফরিদপুর, বগুড়া, নওগাঁ, সোনারগাঁও, ধামরাই, সাভার বা রাজশাহীতে এখনও টেপা পুতুল টিকে আছে ক্ষয়িষ্ণু পালপাড়াগুলোতে। কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের চরপাড়া গ্রামে আরতি রানী পাল ও সুনীল কুমার পাল, ময়মনসিংহের পালবাড়ির ঊষা রানী, কিশোরগঞ্জের নিকলীর খোকন পাল বা রাজশাহীর বসন্তপুরের বিজলী পাল ও সুবোধ পালের পরিবার এখনও টেপা পুতুল জীবন্ত রাখতে লড়াই করছেন।
বার্বি ডল, যুদ্ধ ও অস্ত্র কোম্পানি
বলা হয়ে থাকে দুনিয়ার সর্বাধিক বিক্রীত পুতুল ‘বার্বি ডল’। ১৯৫৯ সালে বাজারে আসার পর থেকে ১০০ কোটির বেশি বার্বি ডল বিক্রি হয়েছে। প্রতিবছর পাঁচ কোটি ৮০ লাখের বেশি বার্বি ডল বিক্রি হয়। ১৮০টির বেশি পেশার আদলে এটি তৈরি হয়েছে। বিশ্বে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় তিনটি বার্বি ডল বিক্রি হয়। বার্বি ডল প্রস্তুতকারী কোম্পানি ম্যাট্টেলের বার্ষিক বিক্রি প্রায় ১.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪ সালে ১ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বার্বি ডল বিক্রি হয়েছে। বার্বির পর এল.ও.এল সারপ্রাইজ অন্যতম শীর্ষ খেলনা ব্র্যান্ড। ছোট বলের ভেতর লুকিয়ে রাখা পুতুল ও সারপ্রাইজ উপহারের জন্য এটি পরিচিত। ডিজনি প্রিন্সেস, এলসা, আনা, মোয়ানা, সিন্ডারেলার মতো ডিজনি পুতুলগুলোর বার্ষিক বিক্রিও কয়েক বিলিয়ন ডলার। ফ্রোজেন সিনেমার পুতুলগুলোও বাজার দখলে আছে। ম্যাট্টেলের মনস্টার হাই, আমেরিকান গার্ল, বেবি এলাইভ, রেইনবো হাই, লিকা চ্যান কিংবা সাম্প্রতিক লাবুবু পুতুলের বাজারও বেশ বড়। ব্রাটজ নামে বড় চোখের পুতুলগুলো একসময় বাজারে বার্বির প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছিল। ম্যাট্টেল মার্কিন কোম্পানি হলেও এদের খেলনা ও পুতুল তৈরি হয় চীন, ইন্দোনেশিয়া বা থাইল্যান্ডের কারখানায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ম্যাট্টেল কোম্পানি মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্য যুদ্ধাস্ত্র তৈরিতে তাদের খেলনা বানানোর দক্ষতাকে ব্যবহার করেছিল। খেলনা যুদ্ধবিমান বা সামরিকযান তৈরির জন্য ম্যাট্টেল বা হাসব্রো কোম্পানি লকহিড মার্টিন বা বোয়িংয়ের মতো অস্ত্র কোম্পানির কাছ থেকে নকশার লাইসেন্স নেয়। এসব খেলনা বিক্রির একটি লভ্যাংশ সরাসরি অস্ত্র কোম্পানিগুলোর কাছে যায়।
উনিশ শতকে খেলনা ও টাইপরাইটার নির্মাণ করলেও এখন অস্ত্র তৈরি করে রেমিংটন কোম্পানি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বহু বৃহৎ খেলনা কোম্পানি খেলনা উৎপাদন বন্ধ করে সামরিক সরঞ্জাম বানানো শুরু করে।
খেলনা ট্রেন নির্মাতা লায়োনেল ট্রেইনস কোম্পানি যুদ্ধের সময় জাহাজের কম্পাস ও নেভিগেশন সরঞ্জাম তৈরি করেছিল। লুইস মার্কস অ্যান্ড কোম্পানি বন্দুকের অংশ তৈরি করে। ডিজেআইয়ের মতো খেলনা ড্রোন কোম্পানিগুলোর ড্রোন ইউক্রেন বা ইরান যুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে। ম্যাট্টেল কোম্পানির সিইও গাজায় হামলার নিন্দা জানালেও ইসরায়েলের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। ম্যাট্টেলের শেয়ারহোল্ডার ভ্যানগার্ড ও ব্ল্যাকরক একই সঙ্গে বহু সামরিক অস্ত্র কোম্পানির বিনিয়োগকারী। লেগো কোম্পানির নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান কিরকেবিআই অধিকৃত ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে লার্নিং প্ল্যাটফর্ম ব্রেইন-পপের গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেছে। বাংলাদেশের জনগণ গাজা, ইরান কিংবা পৃথিবীতে যুদ্ধ ও গণহত্যার বিরুদ্ধে। কিন্তু যুদ্ধ ও অস্ত্র বাণিজ্য টিকে থাকে বার্বি ডলের মতো যেসব বাণিজ্যিক বিশ্বায়নের ভেতর দিয়ে, তাকে কি রাষ্ট্র বা যুদ্ধবিরোধী নাগরিক তৎপরতা প্রশ্ন করে? রাষ্ট্র কি যুদ্ধবিরোধী সামাজিক অনুপ্রেরণার সাক্ষী টেপা পুতুলের সপক্ষে দাঁড়ায়?
জলবায়ু দূষণ কে ঘটায়: বার্বি ডল নাকি টেপা পুতুল?
একটি ১৮২ গ্রাম ওজনের বার্বি ডল বানাতে প্রায় ৬৬০ গ্রাম কার্বন ডাইঅক্সাইড নির্গত হয়। প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ছয় কোটি বার্বি ডল বিক্রি হয় এবং এসব উৎপাদনে বছরে প্রায় ৩৯ হাজার টন কার্বন ডাইঅক্সাইড নির্গত হয়। আরেক হিসাবে দেখা যায়, বার্বি ডল উৎপাদন ও পরিবহনে বছরে ৩.৪ মিলিয়ন টন কার্বন ডাইঅক্সাইড নির্গত হয়।
প্রতিবছর বিশ্বে খেলনা উৎপাদন ও পরিবহনের ফলে প্রায় ১০ কোটি টন কার্বন ডাইঅক্সাইড নির্গত হয়। প্রতিটি ১ মার্কিন ডলার মূল্যের খেলনা উৎপাদনে প্রায় দেড় কেজি কার্বন নির্গত হয়। খেলনা উৎপাদনে ব্যাপকভাবে প্লাস্টিক ব্যবহৃত হয় এবং প্রতিবছর ১০-১২ লাখ টন প্লাস্টিক খেলনা বর্জ্য সরাসরি ল্যান্ডফিল বা সমুদ্রে গিয়ে দূষণ ঘটায়। খেলনা উৎপাদনে যে রং ব্যবহৃত হয়, তাতে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী ভারী ধাতু সিসা, ক্যাডমিয়াম ও থ্যালেটস থাকে।
জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক কোনো আলাপ বা নাগরিক তৎপরতায় আমরা বার্বি ডলের কার্বন দূষণ নিয়ে প্রশ্ন দেখি না। এমনকি পরিবেশবান্ধব মাটির টেপা পুতুলের জলবায়ু সুরক্ষার অবদানকেও স্বীকৃতি দিতে দেখি না। বসন্তপুরের কুমার শিল্পীদের আজ দারুণ দুর্দিন, বারনই নদীর ওপর মৃৎশিল্পের পরিবহন গড়ে উঠেছিল একসময়, আজ নদীটিকে উন্নয়নের নামে খুন করে ফেলা হয়েছে। নদীপথ হারানোর ফলে মৃৎশিল্পের পরিবহন ব্যয় ও জটিলতা বাড়ছে। তীব্র তাপদাহ, খরা এবং অনিয়মিত বর্ষণ কাজের ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক টেপা পুতুল মেলা
বিশ্বের মোট খেলনা উৎপাদনের প্রায় ৭০-৮০ ভাগ চীন একাই নিয়ন্ত্রণ করে। এমনকি বাংলাদেশও বিষাক্ত বহুজাতিক প্লাস্টিক খেলনা উৎপাদনকারী দেশ। কিন্তু টেপা পুতুলসহ বহু পরিবেশবান্ধব দেশজ খেলনার দুর্দান্ত সব সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আছে এখানে এখনও। ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী হস্তশিল্পের বাজার ছিল প্রায় ৮০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ চীন, ভারত ও মেক্সিকোর মৃৎশিল্প থেকে আসে। ভারতের ১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের খেলনা শিল্পবাজারের একটি বড় অংশ পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্ণনগর, উত্তর প্রদেশ ও রাজস্থানের মৃৎশিল্প থেকে আসে।
বাংলাদেশে মাটির টেপা পুতুল বছরে কী পরিমাণে তৈরি হয় বা বিক্রি হয়, তার কোনো পরিসংখ্যান নেই। রাষ্ট্র এখনও একে অসংগঠিত খাত হিসেবে অবহেলা করে। ‘ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি’, ‘বাংলাদেশ প্লাস্টিক দ্রব্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি, বাংলাদেশ সিরামিকস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন, ইমার্জিং ক্রেডিট রেটিং লিমিটেড, বিএফটিআই এবং বিসিকের বেশ কিছু প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশে সাত হাজার থেকে ১২ হাজার কোটি টাকার এক অভ্যন্তরীণ খেলনা বাজার আছে। এই খেলনা বাজারের দুই ভাগও যদি মাটির খেলনা পুতুল হয়, তবে এর মাধ্যমে আয় হয় বছরে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। দেশে ৭০০টিরও বেশি মৃৎশিল্পী গ্রাম বা পালপাড়ার প্রায় সাত লাখ মানুষ কোনো না কোনোভাবে মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত।
কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা এবং গ্রামীণ সংস্কৃতি বিকাশে ঐতিহাসিকভাবে অবদান রেখে চলা দেশের এক গুরুত্বপূর্ণ পেশাজীবী সমাজ কুমারদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সুরক্ষায় জাতীয় নীতিমালা, সমন্বিত পরিকল্পনা এবং বাজেট বরাদ্দ জরুরি। পরিবেশ ও জলবায়ুবান্ধব কুটির শিল্পভিত্তিক এ খাত আমাদের অর্থনীতি এবং সামাজিক সংস্কৃতির গাঁথুনি মজবুত করতে পারে। ইউরোপ ও আমেরিকায় হস্তশিল্প রপ্তানি করে বাংলাদেশ বছরে ৩০-৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করে, যার একটি ক্ষুদ্র অংশ মাটির টেপা পুতুল।
চীনের ঐতিহ্যবাহী মাটির পুতুলের বার্ষিক বাজার ৬ থেকে ৯ হাজার কোটি টাকা। ইউরোপ ও আমেরিকায় শৌখিন মাটির পুতুল ও পরিবেশবান্ধব খেলনা হস্তশিল্পের চাহিদা ১০-১৫ শতাংশ হারে বাড়ছে। বাংলাদেশে মাটির খেলনা বিক্রির অন্যতম জায়গা হলো বার্ষিক মেলাগুলো। চৈত্রসংক্রান্তি এবং বৈশাখী মেলা এর অন্যতম। কিন্তু প্রশ্নহীনভাবে দেশে মেলা যেমন কমেছে, তেমনি গ্রামীণ মেলাকে দখল করেছে করপোরেট বিশ্বায়ন। আইন করে দেশের মেলাগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টেপা পুতুলসহ দেশীয় শিল্পী-কারিগরদের স্থানীয় শিল্পকর্ম ও হস্তশিল্পের বিক্রয়, প্রদর্শনী ও প্রসার নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ চাইলেই টেপা পুতুলসহ দেশীয় খেলনার একটা আন্তর্জাতিক মেলা আয়োজনের চল তৈরি করতে পারে। যুদ্ধ কিংবা জলবায়ুর ওপর জুলুমের বিরুদ্ধে এটিও হবে এক সৃজনশীল প্রতিবাদ। বিজলী ও সুবোধ পালের ছেলে সজীব পালও টেপা পুতুলের কাজ শিখছে। সেও মনে করে টেপা পুতুলের প্রাণ আছে। এই প্রাণ গ্রামজনপদের জীবন সংস্কৃতির প্রাণ। এ প্রাণের ব্যাকরণ সুরক্ষায় রাষ্ট্র দায়িত্বশীল হবে আশা করি।
- বিষয় :
- পাভেল পার্থ
- পহেলা বৈশাখ
