ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

পান্তা: সংস্কৃতি থেকে বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতি

পান্তা: সংস্কৃতি থেকে বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতি
×

 তবিবুর রহমান

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:০১ | আপডেট: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ | ১৩:২৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

পহেলা বৈশাখ মানেই পান্তাভাতের আয়োজন। রাজধানী থেকে গ্রামে, অভিজাত রেস্তোরাঁ থেকে ফুটপাতের হোটেলে এই দিনে পান্তার কদর থাকে তুঙ্গে। এক সময় খেটে খাওয়া মানুষের সাধারণ খাবার হিসেবে পরিচিত পান্তাভাত এখন বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে শুধু সংস্কৃতিই নয়, পুষ্টিগুণেও সাদা ভাতকে ছাড়িয়ে গেছে পান্তা– এমন তথ্য উঠে এসেছে বিভিন্ন গবেষণায়।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ সাদা ভাতের চেয়ে পান্তায় পুষ্টিগুণ অনেক বেশি। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) পুষ্টি ইউনিটের বিশ্লেষণ বলছে, প্রতি ১০০ গ্রাম পান্তা ভাতে আয়রন, ক্যালসিয়াম ও পটাশিয়ামের পরিমাণ সাদা ভাতের চেয়ে বহুগুণ। গাজন প্রক্রিয়ায় তৈরির কারণে পান্তায় তৈরি হয় ল্যাকটিক অ্যাসিড, যা শরীরের জন্য উপকারী এবং খাদ্যের পুষ্টি উপাদান সহজে শোষণে সহায়তা করে। ফলে এটি শুধু পুষ্টিকর নয়, বরং কার্যকর খাবার হিসেবেও বিবেচিত।

‘পান্তা ভাতের জল, তিন পুরুষের বল’–প্রবাদটির বাস্তবতা মিলছে গবেষণা ও অভিজ্ঞতায়। কায়িক পরিশ্রম করা মানুষের জন্য পান্তা দ্রুত শক্তির জোগান দেয়। রাজধানীর মালিবাগ এলাকায় কথা হয় শ্রমিক সোবহান মিয়ার সঙ্গে। সকালে পান্তা ভাত-আলুভর্তা খেয়ে কাজে নামা এই শ্রমিকের ভাষায়, ‘শরীর ঠান্ডা থাকে, পেট ভালো থাকে, আর অনেকক্ষণ কাজ করা যায়।’ পুষ্টিবিদদের মতে, পান্তা ভাতে থাকা শর্করা দ্রুত শক্তি দেয় এবং দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখে, যা শ্রমজীবী মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

পান্তা ভাত মূলত একটি ফারমেন্টেড খাবার। এতে প্রোবায়োটিক বা উপকারী ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি থাকে, যা অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, সাধারণ ভাতের চেয়ে পান্তা ভাতে ১০ গুণ পর্যন্ত উপকারী অণুজীব থাকতে পারে। এসব অণুজীব হজম প্রক্রিয়া উন্নত করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে।
ভারতের আসাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং যুক্তরাজ্যের লিভারপুল জন মুরস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায়ও পান্তা ভাতের পুষ্টিগুণের বিষয়টি উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, পান্তা ভাত খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা ধীরে বাড়ে, যা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক হতে পারে। এছাড়া এতে লৌহ, জিঙ্ক, ম্যাগনেশিয়ামসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অণুপুষ্টি উপাদান পাওয়া গেছে।
পুষ্টিবিদ সামিয়া তাসনিম বলেন, পান্তা অপুষ্টি মোকাবিলায় একটি কার্যকর ও স্বল্পমূল্যের সমাধান হতে পারে। শিশু, নারী ও অন্তঃসত্ত্বা নারীর জন্য এটি উপকারী খাবার। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, পান্তা তৈরিতে অবশ্যই বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করতে হবে, না হলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। 

যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিজ্ঞান সাময়িকী ফুড অ্যান্ড হিউম্যানিটিতে পান্তা ভাত নিয়ে নতুন এ গবেষণার ফল প্রকাশিত হয় ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে। সেই গবেষণার পান্তায় অনেকগুলো নতুন অণুজীব পাওয়ায় কথা বলেছেন বিজ্ঞানীরা। পান্তায় প্রোবায়োটিক-সমৃদ্ধ ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে, যা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে পারে। এই গবেষণার চমকপ্রদ তথ্য হলো–পান্তা খেলে রক্তে শর্করা স্বাভাবিকের চেয়ে কম বাড়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক খালেদা ইসলাম বলেন, পান্তা ভাত নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণায় অভিনবত্ব আছে। আরও বিস্তৃত পরিসরে গবেষণা হলে বিশ্ববাসী এর গুণাগুণ সম্পর্কে জানতে পারবে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মিহির লাল সাহা বলেন, ভাতে থাকা আঁশ সাধারণ রান্না করা ভাতে পুরোপুরি অবমুক্ত হয় না। তবে গাজন প্রক্রিয়ায় অণুজীবের মাধ্যমে এসব পুষ্টি সহজলভ্য হয়ে ওঠে, যা শরীরের জন্য উপকারী।

 

আরও পড়ুন

×