ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

হালখাতার হাঁকডাক কমছে

হালখাতার হাঁকডাক কমছে
×

 সাফা খাতুন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় 

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:০০ | আপডেট: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ | ১৩:৩১

| প্রিন্ট সংস্করণ

চৈত্রসংক্রান্তির বিদায়ঘণ্টা আর বৈশাখের আবাহন– এই দুইয়ে মিলে বাঙালির দ্বারে কড়া নাড়ছে নতুন বছর। তবে পুরান ঢাকার অলিগলিতে উৎসবের চিরাচরিত সেই জৌলুসে যেন কিছুটা ভাটা পড়েছে। বিশেষ করে নববর্ষের ঐতিহ্যবাহী অনুষঙ্গ ‘হালখাতা’ ঘিরে যে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যেত, তা এখন কেবলই নিয়ম রক্ষার আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত। ডিজিটাল যুগের প্রভাবে লাল মলাটের সেই সাবেকি আভিজাত্য এখন অনেকটাই ম্লান, যেন কোনোমতে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক নিরন্তর লড়াই।

গতকাল পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার, ইসলামপুর থেকে শুরু করে চকবাজার ও মৌলভীবাজারের গলিগুলো ঘুরে দেখা গেছে, নববর্ষ ও হালখাতা সামনে রেখে কিছু কিছু আড়ত ও গদিতে অল্প পরিসরে প্রস্তুতি চলছে। অনেক দোকানেই মালপত্র সরিয়ে ধোয়ামোছা বা রঙের কাজ সারছেন কর্মচারীরা। কোথাও কোথাও বৈশাখী প্ল্যাকার্ড, মঙ্গলঘট আর কৃত্রিম ফুলে সাজানো হয়েছে প্রবেশপথ। লাল মলাটের টালিখাতা আর ক্যালকুলেটর নিয়ে ব্যবসায়ীদের পুরোনো হিসাব মেলানোর দৃশ্যও চোখে পড়ে। কেউ কেউ হয়তো সীমিত পরিসরে আলোকসজ্জা বা মিষ্টির বায়না দিয়েছেন, কিন্তু বড় কোনো হাঁকডাক এবার বেশ অনুপস্থিত।

একাধিক ব্যবসায়ীর মতে, হালখাতা ছিল মূলত বিক্রেতা ও খদ্দেরের মধ্যকার দীর্ঘদিনের আস্থা ও  ভালোবাসার এক মিলনমেলা। একসময় মুখে মুখেই লাখ লাখ টাকার লেনদেন হতো, আর সেই বকেয়া তোলার প্রধান ভরসা ছিল এই হালখাতা। তবে সময়ের আবর্তে অনলাইন ব্যাংকিং ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের প্রসারে লেনদেনের ধরন বদলে গেছে। এখন নিমন্ত্রণপত্রে গণেশ কিংবা মসজিদের মিনারের সেই সচিত্র দাওয়াতের চলও ম্লান হয়ে আসছে। আধুনিক প্রযুক্তির দাপটে এই লোকজ উৎসবটি যেন আগের সেই সর্বজনীন জৌলুস হারিয়ে এখন অনেকটাই নিয়ম রক্ষার উৎসব।

স্বর্ণালংকারের জন্য দেশজুড়ে পরিচিত তাঁতীবাজার এলাকা। পূর্বে এই সময়ে গদিতে নতুন গালিচা বিছানো, দাওয়াত কার্ড বিতরণ আর মিষ্টির দোকানে আগাম অর্ডারের জন্য ব্যবসায়ীদের দম ফেলার সময় থাকত না। এখন সেই ব্যস্ততা অতীত। তাঁতীবাজারের স্বর্ণব্যবসায়ী শ্যামল পাল দোকানের আসবাব মোছার ফাঁকেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলছিলেন, ‘আগে তো নববর্ষের সাত দিন আগে থেকেই  উৎসবের আমেজ লেগে যেত। আমরা ক্রেতাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে কার্ড দিয়ে আসতাম। এখন ডিজিটাল যুগে মোবাইলে একটা মেসেজ পাঠিয়েই যেন দায়িত্ব শেষ। তার ওপর সবে ঈদ গেল, সবার হাতে টাকাপয়সাও  কম। তাই বড় পরিসরে হালখাতা করার ভরসা পাচ্ছি না।’ মানিকগঞ্জ জুয়েলার্সের মালিক সুব্রত রায় বলেন, ‘তাঁতীবাজারের নববর্ষ উদযাপনের সেই ঐতিহ্য আর জৌলুস এখন আর নেই। এর মূল কারণ বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দা এবং মানসিক দুশ্চিন্তা। রুটিরুজির অভাব আর ব্যবসায়িক দুরবস্থার কারণে উৎসবের সেই স্বতঃস্ফূর্ততা হারিয়ে গেছে। কেবলই নিয়ম রক্ষার খাতিরে যেন দিনটি উদযাপন করা।’
জানা যায়, মোগল সম্রাট আকবরের সময় খাজনা আদায়ের লক্ষ্য নিয়ে এই হালখাতার যাত্রা শুরু হয়েছিল। এখন ডিজিটাল ব্যাংকিং আর অত্যাধুনিক সফটওয়্যারের ভিড়ে তা এখন কোণঠাসা। কাগজের খাতার বদলে ব্যবসায়ীরা এখন কম্পিউটার বা স্মার্টফোনের নানা অ্যাপে হিসাব রাখছেন। পুরান ঢাকার বাসিন্দা জাবের আহমেদ স্মৃতিকাতর কণ্ঠে বলেন, ‘ছোটবেলায় দেখতাম, হালখাতা মানেই ছিল নতুন পোশাক পরে বাবার হাত ধরে দোকানে দোকানে ঘোরা। ফেরার সময় হাতে থাকত মিষ্টির ঠোঙা আর নতুন ক্যালেন্ডার। এখন তো ব্যবসায়ীরা স্রেফ প্রথা বজায় রাখতে কয়েক ঘণ্টার জন্য দোকান খোলে। কালের আবর্তে আমাদের সেই প্রিয় হালখাতা সংস্কৃতি যেন কীভাবে হারিয়ে যাচ্ছে।’

শাঁখারীবাজারের প্রাচীন ব্যবসায়িক গলিগুলোতেও নেই আগের সেই ব্যস্ততা। যদিও হিন্দু ধর্মাবলম্বী ব্যবসায়ীরা ধর্মীয় রীতি মেনে খাতা কিনেছেন, কিন্তু বড় কোনো অনুষ্ঠানের আমেজ চোখে পড়ে না। ব্যবসায়ীদের মতে, আধুনিক জীবনযাত্রা আর যান্ত্রিক লেনদেনের ভিড়ে উৎসবের রং হারিয়ে গেছে। এখন স্রেফ ব্যবসায়িক লাভ-ক্ষতির হিসাবটাই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শাঁখারীবাজারের ইউনিক গোল্ডের মালিক বিশ্বনাথ বলেন, নববর্ষ আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও বর্তমান সামাজিক ও বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সেই উদ্দীপনা এখন আর নেই। চারপাশের অর্থনৈতিক অনটন আর মানসিক অস্থিরতা মানুষের উৎসবের মানসিকতাকে গ্রাস করছে। ব্যবসায়িক মন্দা আর আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে পুরোনো ঐতিহ্যের সেই জাঁকজমক উৎসবমুখর দৃশ্যপট আজ কেবল স্মৃতিতেই টিকে আছে। ইসলামপুরের পাইকারি বস্ত্র ব্যবসায়ী শামিম আহমেদ জানান, ‘পুরোনো খাতাগুলো তো গুছিয়ে রেখেছি। নতুন বছরের খাতা কেনা হলেও এবার আর আলাদা করে দাওয়াতপত্র ছাপানো কিংবা আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করিনি। সব জিনিসের খরচ আকাশচুম্বী, ক্রেতাদের আগ্রহও কম। কয়েক বছর ধরে হালখাতা মানে আমাদের কাছে কেবল পুরোনো খাতা বদলে নতুন খাতায় হিসাব তোলা।’ অন্যদিকে বাংলাবাজার এলাকার ব্যবসায়ী বীরেন ঘোষ বলেন, ‘পুরো বাজারই তো ফাঁকা। এখন কার্ড পাঠিয়ে কাদের দাওয়াত দেব? তাই এবার আমরা নামমাত্র হালখাতা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। হয়তো আগামীতে অবস্থা ভালো হলে বড় আয়োজন করা যাবে।’

আরও পড়ুন

×