নববর্ষ, ঔপনিবেশিক সময়চেতনা ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য
ফরহাদ মজহার
ফরহাদ মজহার
প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৪৯ | আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ | ২০:০৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষ উদযাপনকে সাধারণত একটি নির্দোষ সাংস্কৃতিক উৎসব হিসেবে উপস্থাপন করা হয়– বাঙালির অসাম্প্রদায়িকতা, ঐতিহ্য ও আনন্দের প্রতীক হিসেবে। কিন্তু এই প্রচলিত ব্যাখ্যা প্রশ্নাতীত নয়। গভীর ও ঘনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নববর্ষ উদযাপন একটি বিশেষ ধরনের সময়চেতনা, সাংস্কৃতিক নির্মাণ এবং রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ, যা ঔপনিবেশিক আধুনিকতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
প্রথমেই সময়ের ধারণার প্রশ্নটি আসে। আধুনিক নববর্ষের ধারণা মূলত সরলরৈখিক সময়চেতনার উপর দাঁড়ানো, সময় যেখানে ধারাবাহিক অগ্রগতি, একটি ‘নতুন শুরু’র প্রতিশ্রুতি। আধুনিক ‘প্রগতি’ এবং প্রগতি-বিরোধিতার বাইনারি এই ত্ররৈখিক সময়চেতনাকে একমাত্র ছহি গণ্য করে তৈয়ার করা হয়েছে। সরল রৈখিক সময়ের ধারণা ইউরোপীয় আধুনিকতার কেন্দ্রীয় উপাদান, যেখানে ইতিহাসকে ক্রমাগত উন্নয়ন বা প্রগতির পথে এগিয়ে চলা হিসেবে কল্পনা করা হয়। বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসনের ভাষায়, এই সময় ‘homogeneous, empty time’– একটি সমতল ও পরিমাপযোগ্য সময়, যা রাষ্ট্র ও জাতির প্রশাসনিক সংগঠনের জন্য প্রয়োজনীয় (Anderson, 1983, p. 24)।
কিন্তু বাংলার ঐতিহ্যে সময় বা কালবোধ মৌলিকভাবে ভিন্ন। এখানে সময় চক্রাবর্ত– ঋতুর পুনরাগমন, ফসলের চক্র, প্রকৃতির আবর্তন ইত্যাদি। ‘নববর্ষ’ এখানে কোনো নতুন সূচনা নয়, বরং পুনরাগমন। সংক্রান্তি এই পুনরাগমনের সন্ধিক্ষণ: শেষ যেখানে শুরু এবং শুরু যেখানে শেষ। বাংলার কৃষিভিত্তিক সংস্কৃতিতে ‘নববর্ষ’ নামক ইউরোপীয় সরলরৈখিক সময় ধারণার স্থান নাই।
এইখানেই নববর্ষ উদযাপনের মধ্যে বাংলায় মৌলিক দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। একদিকে বাংলার চক্রাবর্ত সময়চেতনা, অন্যদিকে আধুনিক রাষ্ট্র-নির্মিত সরলরৈখিক সময়। নববর্ষ এই দ্বিতীয়টির প্রতিনিধিত্ব করে– একটি ক্যালেন্ডারিক সূচনা, যা সময়কে ভাঙে, ভেঙে দেয়, খণ্ড খণ্ড করে এবং একটি কালবিচ্ছিন্ন নতুন ধারার সূচনা ঘোষণা করে। এই ভাঙন অস্তিত্বগত; কেবল সময়ের নয়; অভিজ্ঞতারও ভাঙন।
ঔপনিবেশিক শাসন এই সময়চেতনার রূপান্তরে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের জন্য সময়কে পরিমাপযোগ্য, নির্দিষ্ট ও প্রশাসনযোগ্য করা ছিল অপরিহার্য। এর ফলে স্থানীয় সময়চর্চাগুলো যেমন সংক্রান্তি, ঋতুচক্র, কৃষিজীবনের সময়– ক্রমশ প্রান্তিক হয়ে পড়ে। তাদের জায়গায় আসে একটি অন্য প্রকার সময়, যা ক্যালেন্ডার, ঘড়ি এবং প্রশাসনিক প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত।
এই প্রক্রিয়া কেবল প্রযুক্তিগত নয়, বরং সাংস্কৃতিক আধিপত্যের অংশ। গ্রামশির ভাষায়, শাসক শ্রেণি তাদের মূল্যবোধ ও জীবনধারাকে ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। ফলে অন্য জীবনধারাগুলো অদৃশ্য হয়ে যায় (Gramsci, 1971, p. 323)। বাংলাদেশে নববর্ষ উদযাপন এই আধিপত্যের বাস্তব উদাহরণ: একটি নির্দিষ্ট মধ্যবিত্ত শ্রেণির, শহুরে সংস্কৃতি ‘জাতীয় সংস্কৃতি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এই অধিপতি সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য কী? এটি মূলত একটি প্রদর্শনমূলক সংস্কৃতি– মঙ্গল শোভাযাত্রা, রঙিন পোশাক, লোকজ মোটিফের পুনর্নির্মাণ। এখানে ‘লোকজ’, লোকায়ত বা গণনির্মাণ গরহাজির। সংস্কৃতি এখানে জীবনযাপন বা জীবন্ত চর্চা নয়, বরং হাজির হয়েছে গণবিচ্ছিন্ন শহুরে এলিট শ্রেণির পারফরমেন্স বা সাংস্কৃতিক আধিপত্যের প্রতীক হিশাবে। প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক, কৃষির সঙ্গে সম্পর্ক, ঋতুচক্রের সঙ্গে সম্পর্ক– জীবনযাপনের এই সকল মৌলিক দিক এখানে অনুপস্থিত।
গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বুঝতে হবে– সংস্কৃতি বনাম সংস্কৃতির উপস্থাপন। বাংলার জীবনযাপন ও আবাস ব্যবস্থায় সংক্রান্তি একটি জীবন্ত চর্চা, যেখানে খাদ্য, দেহ, প্রকৃতি এবং সমাজ একত্রে কাজ করে। কিন্তু নববর্ষ একটি পারফরমেন্স বা প্রদর্শনী মাত্র। উপস্থাপনা– যেখানে জীবনের জীবন্ত চর্চাগুলোকে প্রতীকে রূপান্তর করা হয়। এই রূপান্তর একটি depoliticization– সংস্কৃতিকে তার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সজীব ও সক্রিয় জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার প্রক্রিয়া। যাতে খোদ জীবন অনুপস্থিত হয়ে যায়। যা অবশিষ্ট থাকে তা মুখোশ ও ভিড়।
এই বিচ্ছিন্নতা কেবল সাংস্কৃতিক নয়; অর্থনৈতিকও বটে। নববর্ষ এখন একটি বাজারমুখী উৎসবে পরিণত হয়েছে– পোশাক, খাদ্য, বিনোদন; সবকিছুই পণ্য। ফলে সংস্কৃতি পুঁজিতান্ত্রিক অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছে। সময় এখানে আর প্রকৃতির ছন্দ নয়; বরং ভোক্তা-চক্রের অংশ।
বাংলাদেশে কোনো প্রকার রাসায়নিক সার এবং বিষ ছাড়া প্রাণবৈচিত্র্যভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলার আন্দোলন হিশাবে আমরা যখন নয়াকৃষি গড়ে তুলি তখন সংস্কৃতি আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিশাবে হাজির হয়। সেই সময় আমরা কৃষি উৎপাদন ও প্রাণবৈচিত্র্য সুরক্ষার কর্তব্য থেকে সংক্রান্তি– বিশেষভাবে চৈত্রসংক্রান্তি পালন শুরু করি। সেটা ছিল নয়াকৃষির অবস্থান থেকে একটি মৌলিক প্রতিরোধ। নয়াকৃষি সংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে একটি বিকল্প সময়চেতনা প্রতিষ্ঠা করতে চায়। যেখানে সময় চক্রাবর্ত, সম্পর্কনির্ভর এবং জীবন্ত। এখানে কৃষি নিছক উৎপাদন প্রক্রিয়া নয়, বরং জগতের সঙ্গে সম্পর্ক চর্চা। খাদ্য কোনো ‘পণ্য’ নয়, বরং দেহ ও দেহের বাইরে হাজির প্রকৃতি বা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সঙ্গে সজ্ঞান সংযোগ সম্পর্কের সচেতন চর্চা।
চৈত্রসংক্রান্তির উদযাপন অধিপতি সংস্কৃতি ও আধুনিক জীবন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের রাজনীতি। সাংস্কৃতিক, কিন্তু একই সঙ্গে উৎপাদনমূলক। প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে নিজেদের শুধু অন্তরের দিক থেকে প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত হওয়া নয়, বরং খাদ্য ব্যবস্থা কীভাবে আমাদের প্রকৃতির সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত রাখে তাকে উপলব্ধি করা ও বোঝা। চৈত্রসংক্রান্তি কেবল একটি উৎসব নয়। এটি একটি জ্ঞানচর্চা। শাক কুড়ানো, ঋতুভিত্তিক খাদ্য, প্রকৃতির পর্যবেক্ষণ– এসবের মাধ্যমে মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে পুনরায় সম্পর্ক স্থাপন করে। ভিক্টর টার্নারের ভাষায়, এটি একটি ‘liminal moment’; একটি সন্ধিক্ষণ, যেখানে পুরোনো ও নতুন একত্রে উপস্থিত থাকে এবং নতুন সম্ভাবনার জন্ম দেয় (1969, p. 95)।
এইভাবে সংক্রান্তি নববর্ষের সরলরৈখিক সময়চেতনার বিরুদ্ধে একটি দার্শনিক ও রাজনৈতিক বিকল্প প্রস্তাব করে। সংক্রান্তি উদযাপন আমাদের সময়কে নতুনভাবে ভাবতে আহ্বান জানায়– অগ্রগতির ধারাবাহিকতা হিসেবে নয়, বরং জগতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের পুনর্গঠনের জরুরি কর্তব্য হিশাবে।
সবশেষে বলা যায়, নববর্ষ উদযাপনকে নির্দোষ সাংস্কৃতিক চর্চা হিশাবে দেখা মারাত্মক ভুল বোঝাবুঝি। নববর্ষ উদযাপন নির্দিষ্ট সময়চেতনা, শ্রেণি-সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ। এর সমালোচনা মানে বাংলার সংস্কৃতির বিরোধিতা নয়; বরং সংস্কৃতিকে তার স্মৃতি, ইতিহাস, উৎপাদন সম্পর্ক ও বাস্তব প্রেক্ষাপটে ফিরিয়ে আনা। সংক্রান্তি উদযাপন সেই ফিরিয়ে আনার রাজনৈতিক চর্চা যেখানে সময়, প্রকৃতি এবং জীবনের সম্পর্ক আবার জনগণের চোখে যেন দৃশ্যমান হয়।
নববর্ষের যে ধারণা আধুনিক বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা মূলত ‘ঘোষণামূলক সময়’– একটি দিন, যেখানে ক্যালেন্ডার ঘোষণা করে: এখন নতুন বছর শুরু। এই ঘোষণার মধ্যে এক প্রকার কর্তৃত্ব কাজ করে– রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান, সংস্কৃতি; সব মিলিয়ে সম্মিলিত নির্দেশ: ‘এখন থেকে নতুন।’ কিন্তু এই ‘নতুন’ কোথা থেকে আসে? কীভাবে নতুন? কেন নতুন? প্রকৃতির কোন পরিবর্তনের সঙ্গে এই নতুনত্ব যুক্ত? কৃষির কোন পর্যায়ের সঙ্গে? মানুষের দেহ বা জীবনের কোন বাস্তব রূপান্তরের সঙ্গে? না। এই নতুনতা নিছক প্রতীকী নির্মাণ। অন্তঃসারশূন্য। কোনো মূল্য নাই। এই কারণেই নববর্ষ উদযাপন এক প্রকার বিমূর্ত সময়ের উৎসব, যেখানে সময়কে অনুভব করা হয় না, বরং ঘোষণা করা হয়।
বিপরীতে চৈত্রসংক্রান্তি একান্তই ‘অভিজ্ঞতামূলক সময়’, যেখানে সময়কে ঘোষণা করা হয় না, বরং অনুভব করা হয়। এমন একটি মুহূর্ত, যখন প্রকৃতি নিজেই পরিবর্তনের সংকেত দেয়। গাছের পাতা ঝরে, মাটির রং বদলায়, বাতাসের গন্ধ পরিবর্তিত হয়, শরীর ক্লান্তি ও উত্তাপ অনুভব করে। এই সমস্ত পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই বোঝা যায়, একটি চক্র শেষ হচ্ছে। সংক্রান্তি তাই অনুভব ও উপলব্ধির সংগঠন, যার প্রতি দেহের প্রতিটি ইন্দ্রিয় সাড়া দেয়। এখানে সময় কোনো বাহ্যিক ক্যালেন্ডার দ্বারা নির্ধারিত নয়, বরং নির্ধারিত হয় প্রকৃতির ছন্দ দ্বারা। এই ছন্দের সঙ্গে মানুষের দেহ, খাদ্য, কাজ– সবকিছু যুক্ত। তাই চৈত্রসংক্রান্তির খাদ্যচর্চা– চৌদ্দ শাক, তিতা, টক– এসব কেবল লোকাচার নয়; এগুলো দেহকে ঋতুর পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য করার উপায়। অর্থাৎ এখানে সময় একটি জৈবিক ও পরিবেশগত অভিজ্ঞতা। এই দিক থেকে চৈত্রসংক্রান্তি একটি গভীরতর ‘বাস্তব সময়’– জীবন্ত থাকা এবং জীবন্ত উপলব্ধির চর্চা। অর্থাৎ বেঁচে থাকা সময় (lived time)।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য দেখা যায়। নববর্ষ সময়কে বিচ্ছিন্ন করে, সংক্রান্তি সময়কে সংযুক্ত করে। নববর্ষ বলে: পুরোনো শেষ, নতুন শুরু। একটি ভাঙন তৈরি হয়। সংক্রান্তি বলে: শেষের মধ্যেই শুরু, শুরুতেই শেষ– শুরু বা শেষ বলে কিছু নাই, ধারাবাহিকতা আছে। আর সেই ধারাবাহিকতাকে দেহ দিয়ে উপলব্ধি করতে হবে। এই ধারাবাহিকতা কেবল দার্শনিক নয়; কৃষির অমোঘ বাস্তবতা। ফসল কাটার মধ্যেই পরবর্তী বীজের সম্ভাবনা থাকে। মাটির বিশ্রামই পরবর্তী উৎপাদনের শর্ত। এই কারণেই নয়াকৃষির জন্য সংক্রান্তি অতিশয় মৌলিক একটি ধারণা, যা কৃষিকে একটি চক্রাবর্ত প্রক্রিয়া হিসেবে বুঝতে সাহায্য করে। এখানে কোনো স্থায়ী ‘শুরু’ নেই; আছে ধারাবাহিক রূপান্তর।
নববর্ষের আরেকটি মৌলিক বিপদ হলো, সময় এখানে সমতল হয়ে যায়: সবার জন্য একই সময়, একই সূচনা, একই উদযাপন। বাস্তবে সময় কখনোই সমতল নয়। কৃষকের সময়, শ্রমিকের সময়, শহুরে মানুষের সময়– সবই আলাদা। সংক্রান্তি এই ভিন্নতাকে স্বীকার করে। কারণ এটি স্থানিক ও পরিবেশগত। চৈত্রসংক্রান্তি বাংলাদেশের ব-দ্বীপভূমির একটি বিশেষ অভিজ্ঞতা। আমাদের বিশেষ ভূগোল, ঋতুচক্র ও কৃষিজীবনের সঙ্গে যুক্ত। ফলে স্থানীয় বা লোকায়ত জ্ঞান এখানে মুখ্য। দেশকল্পতার নির্দিষ্ট লোকায়ত বা স্থানীয় জ্ঞানচর্চাকে কোনো সর্বজনীন ক্যালেন্ডার দ্বারা প্রতিস্থাপন করা যায় না। এখানেই সংক্রান্তির রাজনৈতিক তাৎপর্য তৈরি হয়। সংক্রান্তি একান্তই ‘স্থানিক সময়চেতনা’, যা বিশ্বায়িত, একরৈখিক সময়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। দাবি করে: সময় সর্বত্র এক নয়, বহু; সময় একটি নয়, বরং সম্পর্কনির্ভর। যেখানে মানুষ ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ড পস্পর হাত ধরাধরি করে দাঁড়ায়। এই বহুত্বের ধারণা আধুনিক রাষ্ট্র ও পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের জন্য সমস্যাজনক। কারণ তারা সময়কে মানকরণ করতে চায়। যেমন কাজের সময়, বাজারের সময়, উৎপাদনের সময়, ভালোবাসার সময়, বিনোদনের সময় ইত্যাদি। এই মানকরণের ফলে মানুষ প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সংক্রান্তি এই বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে একটি পুনঃসংযোগের প্রস্তাব। এই প্রস্তাব কেবল সাংস্কৃতিক নয়; বরং জ্ঞানতাত্ত্বিক। এই জ্ঞান কেবল বই বা বিজ্ঞানের মাধ্যমে আসে না। এটি আসে অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও চর্চার মাধ্যমে। সংক্রান্তি সেই চর্চার একটি সংগঠিত রূপ।
এখানে নারীর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। শাক কুড়ানো, খাদ্য প্রস্তুত, ঋতুর পরিবর্তন বোঝা– এসবের মাধ্যমে এই জ্ঞান অর্জন ধারণ ও বংশপরম্পরায় স্মৃতি ও চর্চা জারি রাখার ক্ষেত্রে নারীর ভূমিকা প্রধান। সংক্রান্তি তাই দেহতাত্ত্বিক বা দেহে সঞ্চারিত জ্ঞানের চর্চা ইংরেজিতে যা দেহধারী জ্ঞান (embodied knowledge) হিশাবে পরিচিত।
নববর্ষ এই জ্ঞানকে অদৃশ্য করে দেয়। নববর্ষ পর্যবসিত হয় প্রদর্শনীতে, যেখানে লোকজ উপাদানগুলো উপস্থিত, কিন্তু তাদের জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি গরহাজির বা অনুপস্থিত। এ কারণে চৈত্রসংক্রান্তি কেবল নববর্ষের বিকল্প নয়, বরং নববর্ষের সমালোচনা। চৈত্রসংক্রান্তি আমাদের দেখায়– আমরা কী হারিয়েছি এবং কীভাবে তা এখনও পুনরুদ্ধার সম্ভব।
সবশেষে বলা যায়, নববর্ষ একটি ঘোষিত সময়; সংক্রান্তি একটি অভিজ্ঞতালব্ধ কালবোধ; নববর্ষ একটি প্রতীকী সূচনা; সংক্রান্তি একটি বাস্তব রূপান্তর; নববর্ষ একটি আধুনিক নির্মাণ; সংক্রান্তি একটি দীর্ঘকালীন চর্চা। এই দুইয়ের মধ্যে নির্বাচন নিছকই সাংস্কৃতিক বিবেচনা নয়; বরং দার্শনিক, রাজনৈতিক ও জীবনের প্রশ্ন।
- বিষয় :
- ফরহাদ মজহার
- পহেলা বৈশাখ
- চৈত্রসংক্রান্তি
- নববর্ষ
