ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

পাহাড় ও সমতলে বৈচিত্র্যের শক্তি ও সংস্কৃতির সৌন্দর্য

পাহাড় ও সমতলে বৈচিত্র্যের শক্তি ও সংস্কৃতির সৌন্দর্য
×

সঞ্জীব দ্রং

সঞ্জীব দ্রং

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৫২ | আপডেট: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ | ১৩:৫২

| প্রিন্ট সংস্করণ

ভূপেন হাজারিকার একটি বিখ্যাত গান আছে– ‘পাহাড় এসে সমতলে বাজায় করতালি, বিহুর সাথে মিশে গেছে কখন ভাটিয়ালি’। পাহাড় ও সমতলের মানুষের মধ্যে হৃদয়ের যোগাযোগ, সম্প্রীতির বন্ধন ও সংস্কৃতির আদান-প্রদান যে কত গুরুত্বপূর্ণ, এই গানে তা ফুটে উঠেছে। সমাজে শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য মানুষে মানুষে জাতিতে জাতিতে অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার সংস্কৃতির শক্তির কথা আছে গানে। বৈচিত্র্য যে শক্তিশালী ও সুন্দর, সেই কথাটি সংগীতে গায়ক বলে গেছেন। আমাদের জন্মভূমি বাংলাদেশ বৈচিত্র্যে অতুলনীয়। এখানে মূল স্রোতধারায় সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জাতি। পাশাপাশি এখানে আবহমানকাল ধরে বসবাস করে আসছেন ৫০টির বেশি নানা জাতির মানুষ, যারা নিজেদের আদিবাসী পরিচয় দিতে ভালোবাসেন। তাদের রয়েছে নানান সাংস্কৃতিক উৎসব। এই বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐকতান নিয়ে আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। 

১.
বৈষু, বিজু, সাংগ্রাই, বিহু, বিষু উৎসবের আয়োজন চলছে পাহাড়ে। ত্রিপুরাদের বৈষু, চাকমাদের বিজু, মারমাদের সাংগ্রাইসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু পাহাড়ির নববর্ষকে বরণ ও পুরাতন বছরকে বিদায় জানানোর এ উৎসব দিনে দিনে সবার প্রাণে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। শহর থেকে অনেক পাহাড়ি পরিবার, তরুণ-তরুণী চলে গেছে বাড়িতে। তাদের অনেককে বলেছি, উৎসব আনন্দময় হোক। এই উৎসবে অনেক দিন পর প্রিয়জনের সঙ্গে তাদের দেখা হবে। কত আনন্দ। কয়েক বছর ধরে পাহাড়ে এই উৎসব ঘিরে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এবার নতুন পরিবেশ ও সম্ভাবনা নিয়ে পাহাড়ের উৎসব হচ্ছে। মনে বড় আশা, আজ পুরোনো সব ধুয়ে মুছে যাবে, সব মলিনতা, কালিমা, গ্লানি দূর হবে, নতুনের আশায় ভরে উঠবে আগামী দিন। পাহাড়ের মানুষ আবার নতুন স্বপ্ন রচনা করবে সুন্দর সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের। আজ জুমের দেশে ফুল ফুটবে, পাখি গান গাইবে। মঙ্গল হোক আজ, মঙ্গল সবার ঘরে।  
চাকমাদের একটি গান আছে উৎসবের আনন্দ নিয়ে। গানটি এ রকম, ‘কোকিল দাগে কুউক কুউক, বিজু পেক্কু দাগে বিজু বিজু, ...নসাং যোবার এ জাগান ছাড়ি, ইদু আগৎ জনমান বুরি, এ জাগাগান রইয়েদে ম-মনান জুরি।’ চাকমা এ গানের বাংলা ভাবার্থ এ রকম, ‘কত পাখি ডাকা, ফুলে-ফলে-রঙে ভরা এই ভূমি ছেড়ে আমি যাব না কোথাও’। এ গানটির মধ্যে পাহাড়-পর্বত-অরণ্য-প্রকৃতির প্রতি পাহাড়ি মানুষের মমতা ও ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে।

২.
আদিবাসীদের সংস্কৃতির মধ্যে প্রকৃতি, মানুষ ও পৃথিবী সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়। বাংলাদেশে আদিবাসীরা ভূমি, বন, প্রকৃতি, গাছপালা, সম্পদ সম্পর্কে একই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। ভূমির কাগজপত্র তৈরি করতে হবে, দলিল বানাতে হবে, এই সংস্কৃতি তাদের অজানা ছিল। এই যে আমরা আদিবাসীদের উৎসবের কথা বলছি, তার প্রায় সবটাই ভূমি, বন ও প্রকৃতিকে ঘিরে। সাঁওতালদের অনেক গানে আছে ‘ধরতির’ কথা। ধরতি অর্থাৎ ধরিত্রীর কথা। ধরিত্রী জননী।  আদিবাসীদের বিখ্যাত প্রবাদ আছে, ‘ধরিত্রীকে যত্ন করো, এটি তোমার জন্য তোমার পুর্বপুরুষের দান নয়, বরং এটি তোমার সন্তানের কাছে তোমার ঋণ।’ অর্থাৎ আদিবাসীদের কাছে এই পৃথিবীর ভূমি-মাটি-বন প্রকৃতি সব গুরুত্বপূর্ণ, জীবনের অংশ। তারা বলে, ‘তুমি যদি ভূমির যত্ন করো, ভূমিও তোমার যত্ন নেবে।’ 
পাহাড়ে নদীর জলে ফুল ভাসিয়ে তরুণ-তরুণীরা যে পূজা অর্চনা করে, তাতে মানুষ ও ধরিত্রীর মঙ্গল কামনার পাশাপাশি প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতার সংস্কৃতিও প্রকাশিত হয়। 

বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু– ভিন্ন ভিন্ন নাম। তবে উৎসবে ঘটে সবার মিলনমেলা। ফুল, শোভাযাত্রা, প্রার্থনায় চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যাসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ পুরোনো দুঃখ ভুলে নতুন বছরকে স্বাগত জানান 	সংগৃহীত

৩.
পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি আদিবাসীদের বাইরে সমতলের আদিবাসীদের মধ্যে বাংলা নববর্ষ এখন আগের মতো বড় করে পালন করা হয় না। অনেক আগে গারোসহ আদিবাসীরা চৈত্র মাসের শেষ দিনে সংক্রান্তি উৎসব পালন করত। কৃষিজীবী আদিবাসীরা সেদিন জমিতে কাজ করত না। আগে থেকেই জমির ধান দিয়ে চিড়া-মুড়ি-খই প্রস্তুত করে রাখা হতো পরিবারে। গরু ও মহিষের দুধ দিয়ে দই বানিয়ে রাখা হতো। তখন আদিবাসী সমাজে ঘরে ঘরে অনেক গরু-মহিষ ছিল। সংক্রান্তির দিন গরু-মহিষকে বিশ্রাম দেওয়া হতো। সকালবেলা ঘরের মালিক নদী বা পুকুরে নিয়ে গরু-মহিষকে স্নান করাতেন। গরু-মহিষের গায়ে রং মেখে সাজানোর অর্থ হলো ওদের প্রতি সারাবছরের পরিশ্রমের জন্য কৃতজ্ঞতা জানানো। কৃষক মনে রাখত গবাদি পশু তাদের উপকার করেছে। এ ছাড়া আদিবাসী কৃষক জমি চাষের জন্য ব্যবহৃত লাঙল, জোয়াল, অন্যান্য কৃষিকাজে ব্যবহৃত জিনিস ধুয়েমুছে পরিষ্কার করত এবং এসবের গায়েও রং মাখাত। আদিবাসী কৃষিজীবনে এক ধরনের কৃতজ্ঞতাবোধ প্রকাশিত হতো এসবের ফলে। আজও আদিবাসীরা নানা ধরনের সবজি এদিন রান্না করে, বিশেষ করে তিতা জাতীয় সবজি। এমন কিছু তিতা জাতীয় সবজি এখনও আদিবাসীরা খায়, যা অন্য সমাজের লোকেরা খায় না। এসব সবজি বনে-জঙ্গলে জন্মায়। 
হাজংরাও কৃষিজীবী সমাজ। টংক আন্দোলন ও হাতিখেদা আন্দোলনের জন্য হাজংরা বিখ্যাত। হাজংরা বর্ষবিদায় এবং বর্ষবরণ উৎসবকে ‘হংঅরানী’ বলে। তারা নতুন বছরের কল্যাণ ও সুখের জন্য প্রার্থনা করে। গ্রামে পিঠা, পায়েস, চিড়া ইত্যাদি খাওয়ার উৎসব চলে। সন্ধ্যাবেলা বাড়িতে মঙ্গলপ্রদীপ জ্বালানো হয় পুরাতনকে বিদায় জানিয়ে নতুনকে বরণ করার জন্য, মানবসমাজের মঙ্গলের জন্য। সাঁওতালসহ আদিবাসীদের এসব উৎসব আমাদের জাতীয় জীবনের অমূল্য সম্পদ। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতায় এসব সাংস্কৃতিক উৎসব বিকশিত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা খুব জরুরি। 

৪.
আদিবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে নববর্ষ পালিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রামে। এই উৎসবের সময় এখন নানা আয়োজন চলে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায়। র‍্যালি, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটক, মেলা ইত্যাদি আয়োজন করা হয়। বৈচিত্র্যপূর্ণ রঙিন এসব উৎসবে বাইরের অনেক মানুষ অংশগ্রহণ করে। চাকমা সমাজে কমপক্ষে তিন দিনব্যাপী বিজু উৎসব পালিত হয়। চাকমা সমাজে চৈত্র মাসের শেষ দুই দিনকে ফুলবিজু ও মূলবিজু বলে। উৎসবের সবচেয়ে আনন্দময় দিকটি হলো একে অন্যের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া ও আপ্যায়ন। শিশু-কিশোর-তরুণরা বয়স্কদের কাছ থেকে আশীর্বাদ প্রার্থনা করে। বাড়িতে বাড়িতে ভালো খাবার রান্না হয়। বিভিন্ন ধরনের সবজি মিশিয়ে রান্না হয় বেশি, যাকে পাচন বলা হয়। অতিথিদের আপ্যায়ন করা হয় নানান পিঠা ও খাবার দিয়ে। মারমাদের নববর্ষ বা সংগ্রাই উৎসব অনেক পরিচিত এখন। পুরাতন বছরকে বিদায় এবং নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর এ উৎসব মূলত বান্দরবান শহরের আকর্ষণীয় অনুষ্ঠান। এ সময় বান্দরবান আনন্দ উৎসবে মুখরিত হয়ে ওঠে। এই দিন মারমারা পরস্পরের প্রতি পানি ছিটিয়ে উৎসব করে যেন পুরাতন সব জীর্ণ, জরা, পাপ, কালিমা দূর হয়। থাইল্যান্ডেও এ উৎসব জনপ্রিয়। বিষুর দিনে ত্রিপুরাদের গরাইয়া নৃত্য খ্যাতি অর্জন করেছে। ত্রিপুরা শিল্পীরা তাদের ঐতিহ্যমণ্ডিত পোশাক পরে দল বেঁধে এ নৃত্য পরিবেশন করে। প্রতিটি গেরস্ত বাড়ি ঘুরে ঘুরে ত্রিপুরা শিল্পীর দল নাচ পরিবেশন করে। এর মূল উদ্দেশ্য নতুন বছর যাতে সবার জীবনে সুখ ও সমৃদ্ধি বয়ে আনে। এ ছাড়া পুরাতন বছরের দুঃখ-কষ্ট ভুলে নতুনের সম্ভাবনার কথাও শিল্পীরা জানিয়ে যায়। 

৫.
আমার কাছে একটি বই আছে। বইটির নাম ‘ল্যাঙ্গুয়েজ অব দ্য ল্যান্ড’। বইটির লেখক লেসলি রে। কোপেনহেগেন থেকে ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্ক গ্রুপ ফর ইনডিজিনাস অ্যাফেয়ার্স বইটি বের করে 

২০০৭ সালে। আর্জেন্টিনা ও চিলির মাপুচে জাতির ওপর বই। আদিবাসী মানুষের চিন্তা ও বিশ্বাস হলো, ভূমিরও মুখের ভাষা আছে, মানুষের মতো ওরা কথা বলে। পাহাড়, মাটি, জমি, বালুচর, নদী খোঁড়াখুঁড়ি করলে ভূমিও কষ্ট পায়। তারও যন্ত্রণা হয়। মানুষের অত্যাচার, সীমাহীন লোভ-লালসা, মিথ্যা, ভন্ডামি, স্বার্থপর অপরিণামদর্শী আচরণের ফলে পৃথিবী এখন বিপন্ন। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মানুষসহ প্রাণী ও প্রকৃতির জীবন বিপন্নপ্রায়। এই যে শব্দ ‘ল্যাঙ্গুয়েজ অব দ্য ল্যান্ড’, এটি এসেছে মাপুচেদের মাতৃভাষা থেকে। মাপুচে অর্থ হলো পিপল অব দ্য ল্যান্ড। অর্থাৎ ভূমির সন্তান বা জনগণ। ‘মাপু’ শব্দের অর্থ ভূমি। আর ‘চে’ শব্দের অর্থ মানুষ। যেমন বাংলাদেশে সাঁওতালি ‘হড়’ শব্দের অর্থ মানুষ, গারো ভাষায় ‘মান্দি’ শব্দের অর্থও মানুষ। অনেক পরে জানলাম, ম্রো ভাষায় ম্রো শব্দের অর্থও মানুষ। তার মানে দাঁড়াল, একটি জাতির নামের অর্থ হয় মানবের নামে। এ রকম জানা জাতি, নানা ভাষা ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্য ও সৌন্দর্য নিয়ে আমাদের ধরিত্রী। এই বৈচিত্র্য আমাদের শক্তি। বৈচিত্র্য নিয়ে আমরা যেন গর্ব ও আনন্দ করতে শিখি। আমরা যেন বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য ও শান্তি খুঁজে ফিরি। বৈচিত্র্য কোনোভাবেই সমাজ ও দেশের জন্য হুমকি নয়, বরং সৌন্দর্য ও শক্তি। আসুন আমরা সকলে এই সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে আমাদের দেশে স্বীকৃতি দিই, উদযাপন করি।

৬.
অনেক আত্মত্যাগ ও জীবনের বিনিময়ে আমরা নতুন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম। আমরা সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছিলাম সকল নাগরিকের জন্য। আমরা জানি, একটি সমাজ ও রাষ্ট্র কতখানি উন্নত, সভ্য ও গণতান্ত্রিক, তার বিচার্য বিষয় হলো সেই সমাজে ও রাষ্ট্রে সবচেয়ে জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষেরা কেমন আছেন। নতুন সরকার ক্ষমতার দায়িত্বে এসেছেন দুই মাসও হয়নি। তারা অনেক অঙ্গীকার করেছেন। বড় অঙ্গীকার হলো একটি ‘রেইন বো নেশনের’ কথা তারা বলেছেন, যেখানে রাষ্ট্র হবে ইনক্লুসিভ, অর্থাৎ অন্তর্ভুক্তিমূলক। এখানে আদিবাসী মানুষকে রাষ্ট্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জায়গা দিতে হবে। আদিবাসী জনগণ তাদের চিরায়ত, ঐতিহ্যগত ভূমি থেকে বিতাড়িত হচ্ছে। প্রাকৃতিক সম্পদ নির্বিচারে উত্তোলন করে প্রাণ-প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করা হচ্ছে। এখানে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে একটি জাতীয় আদিবাসী কমিশন গঠনের মাধ্যমে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ইত্যাদিতে বাজেট বরাদ্দ করতে হবে। বর্তমান সংবিধানে ২৩ক অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।’ আমরা এই ধারার পরিবর্তন চাই এবং আদিবাসীদের মর্যাদার সহিত স্বীকৃতি চাই। সমতলের আদিবাসীদের জন্য ভূমি কমিশন গঠন করা জরুরি। আদিবাসী জনগণ অবশ্যই এসব কাজে সরকারকে আন্তরিক সহযোগিতা করবে।

৭.
আমাদের দেশ অনেক জাতির, অনেক ভাষার ও সংস্কৃতির মানুষের দেশ। রাষ্ট্রে আদিবাসীদের ছোট ছোট অধিকার দিলে, সম্মান করলে সারাদেশই উন্নত হয়। এ নিয়ে বাঙালি জাতি তখন গর্ব করতে পারে যে অন্যান্য জাতির অধিকারের প্রতি তারা কত সহনশীল ও শ্রদ্ধাশীল। এখানে পদ্মা-মেঘনা-যমুনা নদী আছে, আবার শঙ্খ-মেননেং-সীমসাং-চেংগী-মাইনী নদী আছে। ওই যে গান আছে, ‘পাহাড় এসে সমতলে বাজায় করতালি, বিহুর সাথে মিশে গেছে কখন ভাটিয়ালি।’ এভাবেই আদিবাসী সংস্কৃতির সঙ্গে বাঙালি সংস্কৃতির সংবাহন বিন্দু গড়ে তুলতে হবে। আমরা আশা করি, এবারে রাষ্ট্র অনেক বেশি গণতান্ত্রিক ও মানবিক হবে। দেশে একটি সংবেদনশীল আদিবাসী নীতি থাকবে। সে নীতির মূল কথা হবে, আদিবাসী স্পর্শ বা ইনডিজিনাস টাচ। অসীম নম্রতা, শুদ্ধতা ও উদারতা নিয়ে লেখা হবে সেই নীতিমালার বাক্যগুলো। আমাদের সবাইকে মিলেমিশে রাষ্ট্রকে তার সঠিক জায়গায় নিয়ে যেতে হবে। আদিবাসী-বাঙালি যোগাযোগের সংবাহন বিন্দু গড়ে উঠবে। সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই– কথাগুলো সত্যি হবে। এখানে পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-সুরমার সঙ্গে সাংগু-মাইনী-বুগাই-সীমসাং নদীকে মেলানোর আয়োজন শুরু হবে, জীবনে জীবন যোগ হবে– এই হোক নতুন বছরে আমাদের আকাঙ্ক্ষা। আমাদের দেশের কল্যাণ হোক। 

ভেরিয়ার এলুইন তাঁর আদিবাসী জগৎ বইয়ে লিখেছেন, ‘পাহাড় ও সমতলের ঐক্য জাতীয় স্বার্থেও যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন পাহাড় ও অরণ্যের মানুষদের স্বার্থে। আমরা পরস্পর পরস্পরকে সমৃদ্ধ ও সম্ভাবনাময় করতে পারি। আদিবাসীদের আমরা অনেক কিছু দিতে পারি, আবার ওদেরও অনেক কিছু আছে, যা আমাদের দেবার মতো।’ 
সঞ্জীব দ্রং, কলাম লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী

আরও পড়ুন

×