ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

উৎসব খুঁজে পাক নিজের শিকড়

উৎসব খুঁজে পাক নিজের শিকড়
×

মামুনুর রশীদ

মামুনুর রশীদ

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৫৭ | আপডেট: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ | ১৫:০৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের সংগীত, কাব্যে বৈশাখ বৈচিত্র্যে উপস্থিত। যদিও বৈশাখে আজকাল মানুষ তাপদাহে অস্থির, তবুও পহেলা বৈশাখ এক অনাবিল আনন্দ এনে দেয় প্রতিটি বাঙালি পরিবারে। গ্রামে গ্রামে মেলা জমে ওঠে; সকল বয়সের নারী-পুরুষের সম্মিলন ঘটে সেখানে। মানুষ সততই নিঃসঙ্গ। তারা সর্বদাই মনে মনে উৎসব খোঁজে। এমন একটি উৎসব, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষ একত্রিত হতে পারে। মেলার অর্থই সেখানে মেলবন্ধন। পরিচিত-অপরিচিত মানুষের ভিড়, খেলনা, রংবেরঙের চুড়ি, শিশুদের দোলনা এবং প্রিয় বাতাসা-কদমাসহ নানা ধরনের খাদ্যের আয়োজন থাকে সেখানে। 
কৃষিভিত্তিক সমাজে পহেলা বৈশাখ অর্থনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। হালখাতায় গত বছরের হিসাব এবং আগামী বছরের সূচনা হয় পহেলা বৈশাখে। যদিও বাংলার কৃষকের জন্য এই দিনটি খুব সুখকর নয়। তবুও জীর্ণ-পুরাতন জমা-খরচের হিসাব যতই আনন্দহীন হোক; তাদের মনে একটা আশার আলো জ্বলে ওঠে এই দিনে। 

আমাদের জীবনে, শিল্পীর আঁকা ছবিতে বা গ্রামীণ পটুয়ার ভাবনায় বিগত দিনের অভিজ্ঞতা ভাবের ছদ্মবেশে ছবি হয়ে ফুটে ওঠে। আবহমানকাল থেকে বাংলার গ্রামে গ্রামে একটি নাট্যআঙ্গিক খুব জনপ্রিয় হতে দেখা যায়। সেটি হলো সঙ। চৈত্রসংক্রান্তির বিকেল থেকে রাত হয়ে পরদিন দুপুর পর্যন্ত সঙের শিল্পীরা নানা ধরনের অদ্ভুত পোশাক-আশাক পরে তাদের ওপর নিপীড়নের ছবিগুলোকে ব্যঙ্গ করে নিজেদের দেহে ধারণ এবং নানা ধরনের গান ও নাট্যমুহূর্ত রচনা করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে এক ধরনের নাট্যমুহূর্ত নির্মাণ করে। সেখানে সুদখোর মহাজন, থানার দারোগা বাবু, ভন্ড চিকিৎসক এবং নিপীড়িত চরিত্রগুলো অবলীলায় চলে আসে। দর্শকরা ওই সব চরিত্রের সঙ্গে নিজেদের অভিজ্ঞতা মেলায় এবং আশপাশের দেখা মানুষকে চিহ্নিত করে। এখানেই শেষ নয়। তারা এসব অনুকরণ করে বৈশাখের বাকি দিনগুলোতে নিজেরাও অভিনয় করতে থাকে। বিনিময়ে ওই সঙের দল বাড়ি বাড়ি থেকে চাল-ডাল, ডিম, কিছু টাকা সংগ্রহ করে নিজেরাই একটা ভোজনের আয়োজন করে। 
মেলায় পুতুলনাচের দলগুলো খুব অল্প পয়সার বিনিময়ে সংগীত, অভিনয় ও পুতুল মিলিয়ে একটা চমৎকার নাট্য নির্মাণ করে থাকে। চারদিকে পর্দা টাঙিয়ে একটা পুতুলনাচের ঘর তৈরি করে। খুবই অল্প পয়সার টিকিট দিয়ে এই পুতুলনাট্য দর্শকরা দেখার সুযোগ পায়। বিশেষ করে শিশুরা। 

মেলাগুলো বিচিত্র। মেলায় মুড়ি-মুড়কি-কদমা-বাতাসা এবং ছাঁচে ফেলা হাতি-ঘোড়া দিয়ে তৈরি মিষ্টান্ন যেমন পাওয়া যায়; তেমনি গামছা, দা, কুড়াল, বঁটি, নানা ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য সুলভ মূল্যে কেনারও একটা ব্যবস্থা থাকে। আজকাল অবশ্য গ্রামগুলো আর সেই প্রাচীন গ্রাম নেই। নানা ধরনের নাগরিক উপাদান হাজির হয়েছে। তাই মেলায় সংগীতের আয়োজনও থাকে। 
এখন শহরে ভোরবেলায় বর্ণিল শোভাযাত্রার আয়োজন হয়। সেখানে অবশ্যই নানা ধরনের প্রতিকৃতি বহন করে সবাই। বিশেষ করে নানা ধরনের মুখোশ। এসব মুখোশ খুবই অর্থপূর্ণ। যার মধ্য দিয়ে সেই বছরের নানা ধরনের অমঙ্গলের বার্তা থাকে। এই বার্তার বিপরীতেই মঙ্গল শোভাযাত্রার সূচনা। ঢাকা শহরের রমনার বটমূলে ১৯৬৭ সালে ছায়ানটের উদ্যোগে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এই অনুষ্ঠানে এখন নারী-পুরুষ নির্বিশেষ লোখো লোকের পদচারণা। শুধু ঢাকায় নয়; এখন প্রতিটি শহরেই বর্ষবরণ অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। এক অনাবিল এবং প্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে সেই পহেলা বৈশাখ। যদিও আমাদের সকল হিসাব-নিকাশ, স্কুল-কলেজের শিক্ষাবর্ষ সবই ইংরেজি বর্ষকে অনুসরণ করা হয়। একমাত্র কৃষকের কাছে এখনও বাংলা বর্ষই প্রয়োজনীয়। তবুও মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের কাছে এই দিনটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে এক অসাম্প্রদায়িক উৎসব হিসেবে। 

আমাদের দেশের আদিবাসীদের কাছে অন্য নামে এই উৎসব তাদের জীবনেও এক বড় আনন্দের। তাদের নিত্যদিনের খাবারের বাইরে নতুন নতুন খাদ্যসম্ভার ও পানাহারের আয়োজন তাদের জীবনকে রঙিন করে তোলে। প্রকৃতির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতর হয়। পানির সঙ্গে তারা নানা ধরনের জলক্রীড়ায় মেতে ওঠে। 
দেশে যে পরিমাণে ভিন্ন ভাষার বিদ্যালয় গড়ে উঠছে, তাতে আজকের দিনের শিশু-কিশোররা পহেলা বৈশাখের আনন্দ কতটা উপভোগ করবে, সেটা এক বড় প্রশ্ন। একটি জাতি তার মাতৃভাষাকে কেন্দ্র করে তার বর্ষবরণ কতটুকু উপভোগ করবে, সেটি নিয়ে ভাবনা প্রয়োজন। তবু আমাদের জাতিকে সাংস্কৃতিকভাবে বাঁচিয়ে দেয় পহেলা বৈশাখ। যেমন উন্নত শিল্পপ্রধান দেশগুলোতেও নববর্ষ খুব বড় উৎসব। যেমন চীন দেশে অথবা ইরানে নওরোজের উদযাপন তাদের জীবনে একটা নতুন মাত্রা এনে দেয়। তবে উৎসবকে কোনো অনুশাসন বা শৃঙ্খল দিয়ে বাঁধা ঠিক নয়। তাকে স্বতঃস্ফূর্ততার সঙ্গে উদযাপন করতে দেওয়াই সভ্যতার বড় সূচক।

লেখক : মামুনুর রশীদ, নাট্যব্যক্তিত্ব 

আরও পড়ুন

×