পুলিশি অভিযানে বিএনপি নেতাকর্মীর গা-ঢাকা
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ২০ জুলাই ২০২৩ | ১৯:৫০
বিএনপির পদযাত্রা ঘিরে দুই দিনে সহিংসতায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে হার্ডলাইনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ভিডিও ফুটেজ দেখে হামলাকারী ও লাঠিসোটা বহনকারীদের শনাক্ত করছে পুলিশ। ঢাকাসহ আট জেলায় গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ১৩টি মামলা হয়েছে। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করতে অভিযান শুরু হয়েছে। হামলাকারীদের চিহ্নিত করতে পুলিশের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে মাঠ প্রশাসনকে কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়। এরই মধ্যে ঢাকায় ৩০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যান্য জেলায় আটক করা হয়েছে ৫৯ জনকে।
বিএনপি বলছে, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে হামলার পর উল্টো তাদের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হচ্ছে। মামলায় হাজার হাজার নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, পদযাত্রায় লাঠিসোটা নিয়ে এসে অনেকে পরিস্থিতি ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। ঢাকায় বিএনপির পদযাত্রার সামনে-পেছনে পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য রাখা হয়। নির্বিঘ্নে কর্মসূচি পালনের জন্য এই আয়োজন ছিল। যারা সহিংসতায় জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। নিরপরাধ কাউকে হয়রানি করা হবে না।
এদিকে, মামলার পর অনেক এলাকার বিএনপি নেতাকর্মী গ্রেপ্তার এড়াতে গা-ঢাকা দিয়েছেন। অনেকে মোবাইল ফোন বন্ধ রেখেছেন।
দারুস সালাম থানার ওসি শেখ আমিনুল বাশার সমকালকে বলেন, বাঙলা কলেজের সামনে সংঘর্ষের ঘটনায় করা মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চলছে। অভিযুক্তরা গা-ঢাকা দিয়েছেন। বাড়িতে গিয়ে তাদের পাওয়া যাচ্ছে না। পুলিশ সদরদপ্তর সূত্র জানায়, বিএনপির দুই দিনের কর্মসূচি ঘিরে বগুড়ায় চারটি, ফেনীতে দুটি, জয়পুরহাটে একটি, খাগড়াছড়িতে একটি, লক্ষ্মীপুরে দুটি, কিশোরগঞ্জে একটি ও ঢাকায় দুটি মামলা করা হয়।
বুধবার চট্টগ্রাম ও দিনাজপুর এবং মঙ্গলবার বাকি স্থানগুলোয় সংঘর্ষ-সহিংসতার ঘটনা ঘটে। পুলিশের উচ্চপদস্থ একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, যেসব স্থানে সহিংসতা, হামলা ও আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে, তার অধিকাংশ জায়গায় সিসিটিভি ছিল। আবার বিভিন্ন সোর্স থেকে ভিডিও ফুটেজ ও স্থিরচিত্র সংগ্রহ করেছে পুলিশ। মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে হামলার সূত্রপাতের কারণ চিহ্নিত করা হচ্ছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জোর দিচ্ছে যারা লাঠিসোটা-রড নিয়ে পদযাত্রায় অংশ নিয়েছে, তাদের শনাক্ত করার ওপর।
ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক সমকালকে বলেন, যারা বাঙলা কলেজের সামনে হামলা করেছে, তাদের গ্রেপ্তার করতে অভিযান চলছে। যারা পদযাত্রায় লাঠিসোটা বহন করেছে, তাদেরও ভিডিও ফুটেজ দেখে চিহ্নিত করছি। পুলিশ সদরদপ্তরের ডিআইজি (অপারেশন) আনোয়ার হোসেন বলেন, সহিংসতায় জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জনগণ ও সরকারি সম্পদ ভাঙচুরের অধিকার কাউকে দেওয়া হয়নি।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সমকালকে বলেন, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে হামলা, গুলি করে এখন উল্টো মামলা দেওয়া হচ্ছে। এসব মামলায় হাজার হাজার নেতাকর্মীকে আসামি করা হচ্ছে। তবে এখন আর মামলায় কোনো কাজ হবে না। নেতাকর্মীর সঙ্গে সাধারণ জনগণও এখন ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনকে নস্যাৎ করতে তারা বরাবরের মতো মামলাকে হাতিয়ার বানানোর যে চেষ্টা করছে, তাতে কাজ হবে না। নেতাকর্মী রাজপথেই আছেন এবং থাকবেন।
যেসব জেলায় সহিংসতা হয়েছে, তার মধ্যে দিনাজপুরও রয়েছে। দিনাজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলতাফুজ্জামান মিতা বলেন, বিএনপি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার জন্য এটি করেছে। বাস থামিয়ে ক্যাম্পাসের ভেতরে ঢুকে আবাসিক ভবন, প্রশাসনিক ভবনসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য শান্তি বিঘ্নিত করা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে শান্তি ও সম্প্রীতি বিরাজ রয়েছে এবং স্থিতিশীলতা রয়েছে, সেখানে উস্কানি দিয়েছে।
দিনাজপুর জেলা বিএনপির সভাপতি মোফাজ্জল হোসেন দুলাল বলেন, সরকারি দলের লোকজন গাড়ি ভাঙচুর করেছে। বিষয়টির প্রতিবাদ করায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মী হামলা চালায়। আমরা জানতে পেরেছি, বিএনপি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করবে। এ জন্য দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যারা ভর্তি হয়েছিলেন, তারা অন্যত্র চিকিৎসা নিচ্ছেন। এখনও গুরুতর অবস্থায় রয়েছেন চারজন। হিংসার বশবর্তী হয়ে এ হামলা হয়েছে। ওই রাস্তা দিয়ে গাড়ি আসবে– এটাই স্বাভাবিক। যদি আমরা জানতাম, তাহলে বিকল্প রাস্তা ব্যবহার করে নেতাকর্মী দিনাজপুরে প্রবেশ করত। এমন অবস্থা হবে, আমরা কখনও চিন্তা করিনি। এটি রীতিমতো কাপুরুষের কাজ। নেতাকর্মীরা যাতে সমাবেশে না আসতে পারে– এ উদ্দেশ্যই ছিল তাদের। আমাদের পদযাত্রায় পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও থেকে ১০০ গাড়ি আসার কথা। এ হামলার কারণে অনেকে আসতে পারেনি।
লক্ষ্মীপুর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব হাছিবুর রহমান জানান, গত দু’দিনে জেলা-উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অর্ধশতাধিক নেতাকর্মীর বাড়িতে হানা দিয়েছে পুলিশ। যাদের নামে কোনো মামলা নেই, তাদের বাড়িতেও হানা দেওয়া হচ্ছে। নেতাকর্মীকে হয়রানির উদ্দেশ্যে মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। বিএনপির কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী সাংবাদিকদের বলেন, বিএনপির শান্তিপূর্ণ পদযাত্রায় আওয়ামী লীগ ও পুলিশ হামলা করে শতাধিক নেতাকর্মীকে আহত করেছে। এখন উল্টো হয়রানি করার জন্য নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে।
লক্ষ্মীপুরের পুলিশ সুপার মাহফুজ্জামান আশরাফ বলেন, বিএনপির উত্তেজিত নেতাকর্মী পথযাত্রার নামে সন্ত্রাস-নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছে। পুলিশের ওপর হামলা, সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চারটি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে দুই মামলার বাদী পুলিশ। মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। ফেনীর পুলিশ সুপার জাকির হাসান সমকালকে বলেন, বিএনপির পদযাত্রায় সংঘষের্র ঘটনার পর দুটি মামলা হয়। আসামিদের কাউকে এখনও গ্রেপ্তার করা যায়নি। ওই ঘটনার পর গোয়েন্দা নজরদারি আরও বাড়ানো হয়েছে। পরিস্থিতি বুঝে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বগুড়ার পুলিশ সুপার সুদীপ কুমার চক্রবর্ত্তী সমকালকে বলেন, সহিংসতার ঘটনায় করা চার মামলায় মোট ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। পরিস্থিতি এখন শান্ত। তবে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি।
