সংবিধান সংশোধন কমিটি
সরকার ও বিরোধী দলের দূরত্ব কমেনি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬ | ০৮:২০
| প্রিন্ট সংস্করণ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন আজ রোববার থেকে শুরু হচ্ছে। আসছে ১১ জুন আগামী অর্থবছরের বাজেট পেশ হবে। পাশাপাশি এই অধিবেশনে গঠিত হতে পারে সংসদীয় কমিটি। এ ক্ষেত্রে সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠনের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে বিশেষ কমিটি গঠনে সরকারি দল প্রথম অধিবেশনে প্রস্তাব করলেও গতকাল শনিবার পর্যন্ত তাতে সাড়া দেয়নি বিরোধী দল।
দুই পক্ষের এই বিপরীত অবস্থানের মধ্যে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এবং চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি গতকাল সমকালকে জানিয়েছেন, তারা আশাবাদী, সংবিধান সংশোধন বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দল অংশ নেবে।
তবে বিরোধীদলীয় হুইপ রফিকুল ইসলাম খান এবং এনসিপির মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ সমকালকে বলেছেন, তারা সংবিধান সংশোধন কমিটিতে অংশ নেবেন না। গণভোটের ফলাফল বাস্তবায়নে সংস্কার কমিটি হলে বিবেচনা করতে পারেন। অন্য কিছু গ্রহণযোগ্য হবে না।
এদিকে গতকাল সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সরকারি দল বিএনপির সংসদীয় দলের সভা হয়েছে। এতে সংবিধান সংশোধন কমিটি নিয়ে আলোচনা হয়নি। আজ দুপুর ১২টায় বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে হবে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি জোটের সংসদীয় দলের সভা।
অধিবেশন চলতে পারে ৯ জুলাই পর্যন্ত
আজ রোববার বিকেল ৩টায় অধিবেশন শুরুর পর দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী, শুরুতে সভাপতিমণ্ডলী মনোনয়ন ও শোক প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে। পরে থাকবে মন্ত্রীদের প্রশ্ন জিজ্ঞাসা এবং উত্তর। জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ (বিধি-৭১)-এর আওতায় প্রাপ্ত নোটিশের নিষ্পত্তি হবে। জ্বালানি পরিস্থিতি মোকাবিলায় করণীয় নির্ধারণে গত অধিবেশনে গঠিত বিশেষ কমিটির প্রতিবেদন উপস্থাপন করবেন কমিটির সভাপতি ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, আগামী ১১ জুন বাজেট প্রস্তাব করা হবে। ১৫ জুন সম্পূরক বাজেট পাসের জন্য উত্থাপন হবে। ১৬ জুন থেকে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনা হবে। তাই সকাল-বিকেল দুই বেলা সংসদের বৈঠক হতে পারে, যাতে ৩০ জুনের মধ্যে বাজেট পাস করা যায়।
সংসদের প্রথম অধিবেশন শেষ হয়েছিল গত ৩০ এপ্রিল। ওই অধিবেশনে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। সরকারি দলের পক্ষ থেকে সংবিধান সংশোধনের কথা বলা হয়। এ নিয়ে সংসদে কয়েক দিন পাল্টাপাল্টি যুক্তিতর্ক হয়।
আজ দুপুরে সংসদের কার্য-উপদেষ্টা কমিটির সভা হবে। এতে স্পিকারের সভাপতিত্বে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা থাকবেন। সভায় অধিবেশনের মেয়াদ, বাজেট প্রস্তাবের ওপর সাধারণ আলোচনার সময় চূড়ান্ত করা হবে। সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, অধিবেশন ৯ জুলাই পর্যন্ত চলতে পারে। এ ছাড়া বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনার জন্য ৪০ ঘণ্টা সময় নির্ধারণ করা হতে পারে।
সংবিধান সংশোধন-সংস্কার বিতর্ক
গত ২৯ এপ্রিল সংবিধান সংশোধনে ১৭ সদস্যের বিশেষ কমিটিতে নাম দিতে বিরোধী দলকে প্রস্তাব দেন আইনমন্ত্রী। সেদিন তিনি জানান, কমিটির সাত সদস্য হবেন বিএনপির। গণসংহতি আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ, বিজেপি ও স্বতন্ত্র এমপিদের মধ্য থেকে পাঁচ সদস্য থাকবেন। মোট ১২ সদস্যের নামের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। বিরোধী দল থেকে বাকি পাঁচ সদস্য নেওয়া হবে।
সেদিন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান সংসদে জানান, কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে তাদের ধারণাগত ভিন্নতা আছে। তারা প্রস্তাবটি নিজেরা আলোচনা করে পরে সিদ্ধান্ত জানাবেন।
চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি গতকাল বলেন, ‘সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটিতে সব দলের পাশাপাশি স্বতন্ত্র এমপিদেরও রাখা হচ্ছে। বিরোধী দল নাম দিলে সবাই মিলে সংবিধান সংশোধন করব। আমরা সবাইকে নিয়েই চলতে চাই। আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। ইচ্ছা করলে একা করতে পারি, কিন্তু করব না।’
এক প্রশ্নের জবাবে চিফ হুইপ বলেন, সংস্কারটা যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। এখন হবে সংশোধন (সংবিধান সংশোধন)। সংবিধান সংশোধনের জন্য প্রস্তাবিত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দল নাম দেবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
আইনমন্ত্রীও আশাবাদী, বিরোধী দল কমিটিতে অংশ নেবে। বিরোধী দল কমিটিতে অংশ না নিলে কী হবে এমন প্রশ্নে তিনি সমকালকে বলেন, তারা আগে সংসদের অধিবেশনে আসুক, তারপর দেখা যাবে।
অন্তর্বর্তী সরকার গত ১৩ নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারি করে। এ আদেশ ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটে ৬৮ দশমিক ৬ শতাংশ ভোটারের সম্মতি পায়। আদেশে বলা হয়েছিল, ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে নির্বাচিত এমপিদের নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে। এই পরিষদ ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংস্কার করবে। জামায়াত জোটের ৭৭ এমপি পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও বিএনপি নেয়নি।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান সমকালকে বলেন, গণভোটের ফল অনুযায়ী বিশেষ কমিটি নয়, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন হবে। সরকারি দল তা না করে, গণভোটের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। কমিটিতে অংশ নিয়ে জামায়াত একই কাজ করবে না। সরকারি দল যদি সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাব করে, বিরোধী দল এতে সাড়া দেবে।
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর জন্য ২০১০ সালে গঠিত সংসদের বিশেষ কমিটিতে যোগ দেয়নি তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপি। ১৫ সদস্যের ওই কমিটিতে জাতীয় পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টি এবং জাসদের একজন করে এমপি ছিলেন। বিএনপি থেকে তিনজন সদস্য নেওয়ার প্রস্তাব করেছিল তৎকালীন সরকারি দল আওয়ামী লীগ।
এই নজির দিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ প্রশ্ন তুলেছেন, বিএনপি তখন পাতানো কমিটিতে যায়নি, এবার বিরোধী জোট কেন যাবে? তিনি সমকালকে বলেন, তখন শেখ হাসিনার এক কথায় কমিটি রাতারাতি অবস্থান বদল করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের সুপারিশ করেছিল। বিএনপি যে একইভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সবকিছু করবে, তা প্রথম অধিবেশনে প্রয়োজনীয় অধ্যাদেশগুলো বাতিলের ক্ষেত্রে দেখা গেছে।
সংসদীয় কমিটি গঠন হবে
রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধানে উল্লেখিত চারটি সংসদীয় কমিটি ছাড়াও মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ সংখ্যানুপাতে পাবে বিরোধী দল। সংসদীয় কমিটি এবং মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত স্থায়ী মিলিয়ে কমিটির সংখ্যা ৫০। প্রথম অধিবেশনের প্রথম বৈঠকেই পাঁচটি কমিটি গঠিত হয়েছে।
চলতি অধিবেশনে বাকি ৪৫ কমিটি গঠন করা হতে পারে বলে জানা গেছে। জুলাই সনদ অনুযায়ী কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়সহ ১৩টি কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দল থেকে পাবেন। জুলাই সনদের এই প্রস্তাবে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট ছিল না।
এবারের অধিবেশনে প্রথমবারের মতো যোগ দেবেন সংরক্ষিত নারী আসনের এমপিরা। প্রথম অধিবেশনের পর তারা নির্বাচিত হওয়ায়, সেই অধিবেশনে ছিলেন না। ৫০ নারীসহ বর্তমান সংসদের সদস্য সংখ্যা দাঁড়াল ৩৪৮। খেলাপি ঋণের মামলায় চট্টগ্রাম-২ এবং চট্টগ্রাম-৪ আসনের বিএনপির প্রার্থী ভোটে এগিয়ে থাকলেও, ফলাফল স্থগিত রয়েছে।
- বিষয় :
- সংবিধান
