ঢাকা সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬

সংসদীয় দলের সভা

বিরোধী আসনে উন্নয়ন তদারক করবে বিএনপির নারী এমপিরা

বিরোধী আসনে উন্নয়ন তদারক করবে বিএনপির নারী এমপিরা
×

কামরুল হাসান

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬ | ০৮:২৫ | আপডেট: ০৭ জুন ২০২৬ | ১০:৪৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের সদস্যদের (এমপি) আসনে উন্নয়ন তদারকি এবং রাজনৈতিক সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিএনপির সংরক্ষিত আসনের নারী এমপিদের। গতকাল শনিবার জাতীয় সংসদ ভবনে বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় দলটির ৩৬ নারী এমপিকে বিরোধী দলের ৭৯টি আসনের দায়িত্ব বণ্টন করে দেওয়া হয়েছে। 

সভা সূত্র সমকালকে এ তথ্য জানিয়েছে। সভায় অংশ নেওয়া একাধিক নেতা জানান, কোনো নারী এমপিকে একটি আসনে, কাউকে দুটি এবং কয়েকজনকে সর্বোচ্চ চারটি আসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া কয়েকজনকে পুরো জেলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যেখানে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপির নেতারা এমপি হয়েছেন। বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী হয়ে জিতে আসা স্বতন্ত্র এমপি রুমিন ফারহানার আসনেও দায়িত্ব হয়েছে সরকারদলীয় নারী এমপিকে। 

সভা সূত্র জানায়, বিএনপির এমপিদের কোনো আসনের দায়িত্ব সংরক্ষিত আসনের কোনো এমপিকে দেওয়া হয়নি। চরমোনাইয়ের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলনের জেতা একমাত্র আসনেও দায়িত্ব হয়েছে। তবে বাকি ছয় স্বতন্ত্র এমপি; যারা বিএনপির সঙ্গে রয়েছেন বলে মনে করা হয়, তাদের আসনের দায়িত্ব কাউকে দেওয়া হয়নি। বিরোধী জোটের ১৩ নারী এমপিও এ রকম কোনো দায়িত্ব পাননি।  
সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসেন জামায়াতে ইসলামীর ৬৮, এনসিপির ৬, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ২, খেলাফত মজলিস ও ইসলামী আন্দোলনের একজন করে এমপি। 

এদিকে গতকাল সংসদীয় দলের সভায় সভাপতিত্ব করা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাত মন্ত্রীর কাছে তাঁদের দপ্তরের ১০০ দিনের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতে চান। এমপিদের নিজ নিজ এলাকায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হওয়া, সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করার নির্দেশনা দেন। জনকল্যাণে সরকারের গৃহীত কর্মসূচির বাস্তবায়ন এবং সরকারের মধ্যে দল হারিয়ে না যায়, সে বিষয়ে এমপিদের সহযোগিতা কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী।

সংসদ নেতা তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বিকেল ৩টায় সভা শুরু হয়। শেষ হয় সন্ধ্যা সোয়া ৬টায়। সভা পরিচালনা করেন সরকারদলীয় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়, দলের ৩৬ নারী এমপিকে বিরোধী দলের ৭৯টি আসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। স্বাগত বক্তব্য দেন বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের আসনের উন্নয়ন তদারকিতে বিএনপির নারী এমপিদের এসব এলাকার জন্য ডিও লেটার বা আধা সরকারি পত্র দিতে পারবেন বলে সভায় জানানো হয়। এ ছাড়া অন্যান্য কার্যক্রমেও নারী সংসদ সদস্যদের সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা করছে বিএনপি সরকার। তবে বিএনপির কোনো নেতা এ বিষয়ে নাম প্রকাশ করে বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

বিরোধীদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া
নবম সংসদে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো বিরোধী দল বিএনপি, জামায়াত, এলডিপি এবং বিজেপির ৩৪টি আসনে ‘উন্নয়নের’ দায়িত্ব দিয়েছিলেন সংরক্ষিত আসনের আওয়ামী লীগের নারী এমপিদের। এই উদাহরণ দিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ গতকাল রাতে সমকালকে বলেন, বিএনপি প্রমাণ করল তারাও শেখ হাসিনার পথে হাঁটছে, ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি করতে চাইছে। 

২০০৯ সালে গঠিত নবম সংসদে কক্সবাজার-২ আসনে জামায়াতের এমপি ছিলেন হামিদুর রহমান। ওই আসনে শেখ হাসিনা প্রথমে দায়িত্ব দেন সংরক্ষিত আসনের এমপি গায়িকা মমতাজ বেগমকে। পরে দায়িত্ব দেন মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী পিনু খানকে। এ তথ্য জানিয়ে হামিদুর রহমান আযাদ সমকালকে বলেন, এর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল বিরোধী দলের এমপি যাতে কোনো কাজ করতে না পারেন। একজন এমপি জনগণের ভোটে নির্বাচিত। তাঁর আসনে সংরিক্ষত আসনের নারী এমপিকে চাপিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে, নির্বাচিত এমপিকে কাজ করতে না দেওয়া। এটি অগণতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী চিন্তা। অতীতে এর ফল ভালো হয়নি, ভবিষ্যতেও ভালো হবে না। 

সরকারি দলের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও। তিনি সমকালকে বলেন, বিরোধী দলকে সরকার সব জায়গায় দমন করছে, বিরোধীদের আসনের দায়িত্ব সরকারদলীয় নারী এমপিদের দেওয়া তারই ধারবাহিকতা। বিরোধীদলীয় এমপিরা কোনো উন্নয়ন কাজ করলেও প্রচার করবে বিএনপির নারী এমপিরা করেছেন। 

নাহিদ আরও বলেন, এতে নির্বাচনী এলাকায় অনর্থক সংঘাত তৈরি হবে। শুধু বিরোধীদলীয় এমপির সঙ্গে নয়, বিএনপির যারা স্থানীয় নেতৃত্ব রয়েছে, তাদের সঙ্গেও নারী এমপিদের বিরোধ তৈরি হবে। আর সরকারের উদ্দেশ্য যদি মহৎ থাকত, তাহলে বিরোধী দলের নারী এমপিদেরও আসন বণ্টন করে দেওয়া হতো। কিন্তু তারেক রহমানের বিএনপি শেখ হাসিনার দেখানো পথেই চলছে। 

কোন আসনে কে দায়িত্বে
ঢাকা-১২, ১৫ ও ১৬ আসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিএনপির নারী এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে। তিনটি আসনই জামায়াতের। এর মধ্য ঢাকা-১৫ আসনের সংসদ সদস্য জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। ঢাকা-১২ আসনের এমপি জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন। ঢাকা-১৬ আসনে দলটির এমপি হলেন কর্নেল (অব.) আবদুল বাতেন।  

ঢাকা-১১ আসনের সংসদ সদস্য এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তাঁর আসনে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে শাম্মী আক্তারকে। পাশাপাশি তিনি সিলেট-৫ আসনের দায়িত্বও পালন করবেন। এই আসনের এমপি খেলাফত মজলিসের আবুল হাসান। 

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার আসনে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে নাদিয়া পাঠান পাপনকে। রুমিন বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র নির্বাচন করে জয়ী হন।

পাবনা-১, ৩ ও ৪ আসনের দায়িত্বে দেওয়া হয়েছে আরিফা সুলতানা রুমাকে। সাতক্ষীরা-১, ২, ৩ ও ৪ আসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বীথিকা বিনতে হোসাইনকে। তাঁর বাড়ি লক্ষ্মীপুরে। তিনি লক্ষীপুর-৪ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। 

পিরোজপুর-১ আসনে জামায়াতের সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদীর আসনে সেলিনা সুলতানা জুঁইকে, আর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংরক্ষিত আসনের এমপি সেলিমা রহমানকে বরগুনা-১ ও পটুয়াখালী-৩ আসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বরগুনা-১ আসনে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের সংসদ সদস্য মুফতি মাহমুদুল হাসান ওয়ালিউল্লাহ এবং পটুয়াখালী-৩ আসনে জামায়াতের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ রয়েছেন। 

জামায়াতের এমপি থাকা চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১, ২ ও ৩ আসনে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সানজিদা ইয়াসমিন তুলিকে। তিনি গুমের শিকার পরিবারের সংগঠন মায়ের ডাকের উদ্যোক্তা।

সেলিনা সুলতানা নিশিতাকে দেওয়া হয়েছে গাজীপুর-৪ ও সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের দায়িত্ব। ময়মনসিংহ ২ ও ৪ আসনে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে নিলোফার চৌধুরী মনিকে। শওকত আরা ঊর্মিকে মেহেরপুর-১ ও ২ আসনে, মাহমুদা হাবিবাকে রাজশাহী-১ ও ৪ আসনে, রাশেদা বেগম হীরাকে কুমিল্লা–৪ ও ১১ আসনে, জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদকে যশোর-১, ২, ৪ ও ৫ আসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। 

বিএনপির স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক শিরীন সুলতানাকে ঢাকা-৪ ও ঢাকা-৫ আসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। নিপুণ রায় চৌধুরীকে নড়াইল ও মাগুরা জেলায়, জেবা আমিন ও ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানাকে রংপুর জেলার ছয়টি আসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। নেওয়াজ হালিমা আরলিকে চুয়াডাঙ্গা, ফরিদা ইয়াসমীনকে কুষ্টিয়া-৩ আসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। রেহেনা আক্তারকে নীলফামারী, ফাহমিদা হককে খুলনায় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। 

সাত মন্ত্রীকে জবাবদিহির আওতায় আনলেন প্রধানমন্ত্রী 
বাজেট অধিবেশন শুরুর আগের দিন অনুষ্ঠিত সংসদীয় দলের সভায় সরকারের ১০০ দিনে মন্ত্রীরা কী কী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছেন, তা জানতে চান প্রধানমন্ত্রী। সাত মন্ত্রী নিজেদের দপ্তরের কর্মকাণ্ডের হিসাব দেন। পরে মন্ত্রীরা প্রধানমন্ত্রীসহ অন্য সংসদ সদস্যদেরও বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। বৈঠকে উপস্থিত সূত্র জানায়, সাত মন্ত্রণালয় হলো স্বরাষ্ট্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ; বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ; স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়; আইন, বিচার ও সংসদ এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। 

সূত্র জানায়, সভায় সংসদ সদস্যদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, স্পর্শকাতর কয়েকটি মামলায় দ্রুততম সময়ে আসামি গ্রেপ্তার এবং চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। সারাদেশে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, মাদক ও জুয়া বন্ধে সরকার আরও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলে জানান মন্ত্রী। 

দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) কার্যকর ও শক্তিশালী করতে প্রয়োজনে আইন সংশোধন করা হবে বলে জানান আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘মানবাধিকার কমিশন ও গুম কমিশন নিয়ে আমরা ইতোমধ্যে পর্যালোচনা করেছি। আমাদের পর্যালোচনায় বিদেশিরাও সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। মানবাধিকার ও গুম কমিশনকে কার্যকর কমিশনে পরিণত করা হবে। এ জন্য এ দুই কমিশন নিয়ে আমরা দ্রুতই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারব।’

সভায় শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনকে নানা প্রশ্ন করেন দলের সংসদ সদস্যরা। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের উপস্থিতি, শিক্ষকদের পেনশন, চলমান মিড ডে মিল কর্মসূচি যাতে সঠিকভাবে সারাদেশে বাস্তবায়িত হয়– এসব বিষয় মন্ত্রীর নজরে আনা হয়। মিড ডে মিলের খাবারের গুণগত মান বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন সংসদ সদস্যরা। 

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, মিড ডে মিলের বিষয়ে আগে যে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে, সে অনুযায়ী ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সামনে খাবারের মান বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।

সভায় সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে নির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে জনপ্রত্যাশা পূরণে আমাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। বাজেট প্রসঙ্গে সরকারপ্রধান বলেন, বাজেট হবে জনবান্ধন ও ব্যবসাবান্ধব। বাজেটে সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ আশ্বস্ত হবে। মানুষের ওপর নতুন করে কোনো দুর্ভোগ তৈরি করা হবে না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাজেটে উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা বিবেচনায় রাখা হবে। 

আরও পড়ুন

×