স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনে প্রস্তুত ইসি, মাঠে গড়াচ্ছে ভোট
অমরেশ রায়
প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:১৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনে সব প্রস্তুতি গুছিয়ে এনেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আগামী নভেম্বরে ছয় বা সাত ধাপে ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ভোটের মধ্য দিয়ে শুরু হচ্ছে নির্বাচন উৎসব। এরপর ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকারের বাকি চার প্রতিষ্ঠান পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে সংস্থাটির।
ইসি সূত্র বলছে, এরই মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার প্রস্তুতিও প্রায় শেষ করেছে ইসি। ১৫ সেপ্টেম্বর তপশিল ঘোষণার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। আর নভেম্বরের শেষভাগে প্রথম ধাপের নির্বাচনের ভোট গ্রহণ করা হবে। সব ধাপের ভোট গ্রহণ আগামী বছরের শেষ নাগাদ শেষ হতে পারে।
এর আগে গত ২ আগস্ট স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের তরফে ইসিতে পাঠানো চিঠিতে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়। সরকারের এমন নির্দেশনা পেয়ে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি শুরু করে ইসি।
দেশে মোট ইউনিয়ন পরিষদ সংখ্যা চার হাজার ৫৮১টি। এর মধ্যে চলতি বছর তিন হাজার ৯৮১টি ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ শেষ বা নির্বাচন উপযোগী হবে। যেগুলোর নির্বাচন ২০২১ ও ২০২২ সালে হয়েছিল। আর বাকিগুলো ২০২৭ ও ২০২৮ সালের দিকে নির্বাচন উপযোগী হবে। ধাপে ধাপে নির্বাচন উপযোগী সব ইউনিয়নে ভোট গ্রহণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। আইনে আছে, ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের বিধান রয়েছে।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, সর্বশেষ অনুষ্ঠিত সাত ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের অনুরূপ পরিকল্পনা করছে ইসি। ২০২১ সালের ২১ জুন ও ২০ সেপ্টেম্বর দুই ভাগে বিভক্ত প্রথম ধাপের নির্বাচনে বরিশাল বিভাগের চারটি জেলা ছাড়াও রংপুর, বগুড়া, খুলনা ও বাগেরহাটের মোট ৩৬৭টি ইউনিয়নে ভোট হয়। এবারও প্রথম ধাপে এসব ইউনিয়ন দিয়েই ভোটের তপশিল সাজানোর বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে ইসির।
এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনার (ইসি) আব্দুর রহমানেল মাছউদ সমকালকে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য ইসির সব প্রস্তুতি আছে। ১৫ সেপ্টেম্বর তপশিল ও নভেম্বরে ভোট শুরুর বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই আমরা এগোচ্ছি। এ নিয়ে সরকারের সঙ্গেও যোগাযোগ হচ্ছে।
ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন কয় ধাপে হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগে যত ধাপে হয়েছে মোটামুটি সেভাবেই হবে। কোনো ইউনিয়ন পরিষদে মামলা ও সীমানা নির্ধারণ নিয়ে জটিলতা থাকলে সেগুলোতে নির্বাচন হবে না।
১৫ সেপ্টেম্বরে তপশিল ঘোষণার ইঙ্গিত দিয়ে আরেক নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ছয় বা সাত ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে ইসির।
ইসির যত প্রস্তুতি
স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে ইসির প্রস্তুতির শেষ ধাপে আইন-বিধি এবং আচরণ বিধিমালা সংস্কারের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। গত মাসেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইন এবং স্থানীয় সরকারের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা আচরণ বিধিমালার খসড়া চূড়ান্ত করে আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠিয়েছিল ইসি। সেখান থেকে অনুমোদন হয়ে এগুলো গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ভোটার তালিকাও চূড়ান্ত হয়েছে। দেশে মোট ভোটার আছেন ১২ কোটি ৮৭ লাখ ৭৭ হাজার ৬৪৩ জন। ভোটার স্থানান্তরের আবেদন দেওয়ার শেষ সময় ৭ সেপ্টেম্বর ও নিষ্পত্তির শেষ সময় ১০ সেপ্টেম্বর বেঁধে দিয়েছে ইসি। এর পরই ভোটার তালিকা মুদ্রণে যাবে।
সারাদেশে সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্রের তালিকাও আগেই তৈরি করে রেখেছে ইসি। গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের চেয়ে স্থানীয় নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা দুই থেকে তিন হাজার বেশি হতে পারে। মোট ৪২ হাজার ৭৬১টি কেন্দ্রে ১২ ফেব্রুয়ারির ভোট নেওয়া হয়। তবে এবার একসঙ্গে দুটি ভোটের জটিলতা না থাকায় গড়ে প্রতি দুই হাজার ভোটারের জন্য একটি করে কেন্দ্র রাখার পরিকল্পনা রয়েছে ইসির।
এরই মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বার্ষিক পরীক্ষাসহ অন্য পরীক্ষা নভেম্বরের আগেই অথবা দ্রুততম সময়ে শেষ করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে নির্দেশনা পাঠিয়েছে ইসি। স্কুল ভবনগুলোকে ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার এবং শিক্ষকদের নির্বাচনী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুবিধার জন্যই এমন নির্দেশনা পাঠানো হয়।
ভোটের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সংশ্লিষ্ট তিনটি বাহিনী পুলিশ, বিজিবি এবং আনসার ও ভিডিপি প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক শেষ করেছে ইসি। পুলিশপ্রধানের (আইজিপি) সঙ্গে বৈঠককালে সারাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন চেয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। এই প্রতিবেদন পাওয়ার পর আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হবে। এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সেনাবাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা নেই ইসির।
সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স ও ভোট গ্রহণ সামগ্রী আগেই মজুত রাখা হয়েছিল। স্থানীয় নির্বাচনে সেগুলোর ব্যবহার হবে। এ ছাড়া সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মালাপত্রও কিনে রেখেছে ইসি। সংসদের পর যাতে দ্রুত স্থানীয় সরকারের কিছু প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন করা যায়, সে জন্যই এসব মালাপত্র আগেই কেনা হয়েছিল। কেননা নির্বাচনী মালাপত্র কেনার প্রক্রিয়া শেষ করতে কয়েক মাস লাগে।
ইসি সূত্র বলছে, সংসদ নির্বাচনের আগে ছোট হোসিয়ান ব্যাগ ও গানি ব্যাগ প্রতিটি এক লাখ ১৫ হাজার পিস, বড় হোসিয়ান ব্যাগ ৭৫ হাজার পিস, মার্কিং সিল ১৭ লাখ ৫০ হাজার পিস এবং অফিসিয়াল সিল আট লাখ ৪০ হাজার পিসসহ অন্যান্য নির্বাচনী সামগ্রী কেনা হয়। ওইসব সামগ্রী মজুত রাখা হয়েছে স্থানীয় নির্বাচনের জন্য।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতির ব্যাপারে ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ গত সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, নভেম্বরে স্থানীয় নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্য নিয়ে ইসির প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে। যে কোনো সময় তপশিল ঘোষণা হবে।
- বিষয় :
- স্থানীয় সরকার