কর্ণফুলীর সাম্পানওয়ালা আঁর মন হরি নিল
৭৫ বছর বয়সী সৈয়দ মাঝি ১৫ বছর বয়সে সাম্পানের বৈঠা হাতে নিয়েছিলেন, মাঝখানে পার হয়েছে পাঁচ যুগ। বাকি জীবনটাও সাম্পান বেয়ে কাটাতে চান তিনি - সমকাল
আকরাম হোসেন রানা, কর্ণফুলী (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৫ | ০০:৪৮
‘কি গান মাঝি হুনাইল
কি বাঁশি মাঝি বাজাইল,
কর্ণফুলীর সাম্পানওয়ালা আঁর
মর হরি নিল।’
চাটগাঁইয়া গানের কিংবদন্তি সঞ্জিত আচার্য্য রচিত ও শিল্পী কান্তা নন্দীর গাওয়া ‘সাম্পানওয়ালা’ ছবির গানটি সারাদেশে তুমুল জনপ্রিয়। কর্ণফুলীর সাম্পান মাঝিদের নিয়ে কালে কালে রচিত হয়েছে কত গান, নাটক, কবিতা। সংগীতজ্ঞ মোহন লাল দাশ রচিত শেফালী ঘোষের গাওয়া ‘ওরে সাম্পানওয়াল, তুই আমারে করলি দিওয়ানা’ কিংবা ইয়াকুব আলী সরকারের অমর সৃষ্টি ‘পালে কি রঙ লাগাইল রে মাঝি/সাম্পানে কি রঙ লাগাইল/শঙ্খ খালর সাম্পাওয়ালা আমায় পাগল বানাইল।’ আর সঞ্জিত আচার্য্যের কালজয়ী গান ‘বাঁশখালী, মইষখালী...পাল উড়াইয়া দিলে সাম্পান ঘুরঘুরাই টানে/তোরা কন কন যাবি আঁর সাম্পানে’ সারাদেশে তুমুল জনপ্রিয়।
আচ্ছা, এই সাম্পানওয়ালাদের জীবন কেমন? কীভাবে কাটে তাদের দিন, তাদের সংসারেরই বা কী হাল! এসব জানতে কথা হয় কর্ণফুলীর নবীন-প্রবীণ কয়েকজন সাম্পান মাঝির সঙ্গে। মাঝিদের জীবন অনেকটা সাম্পানের মতোই, সরল। তাদের বড় কোনো স্বপ্ন নেই, তেমন কোনো চাহিদা নেই, পাওয়া-না পাওয়া নিয়ে নেই কোনো অভিযোগও।
কর্ণফুলী উপজেলা চরপাথরঘাটা ইউনিয়ন ও আশপাশের এলাকায় ২১৬টি মাঝি-পরিবার বাস করে। এসব মাঝি কর্ণফুলী নদীতে সাম্পান চালান, মানুষ পার করেন, পণ্য আনা-নেওয়া করেন। কর্ণফুলী নদী সাম্পান মাঝি কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি এসএম পেয়ার আলী বলেন, ‘মাঝিদের কাছে সাম্পান চালানোটা পেশার চেয়েও বেশি কিছু। তারা এই নদী, সাম্পানকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ভাবেন। মাঝির জীবনে এই কর্ণফুলী নদী আর সাম্পান একাকার হয়ে মিশে আছে। আমরা আমৃত্য বৈঠা বাইতে চাই।’
বৈঠা হাতে পাঁচ যুগ : সৈয়দ মাঝির ৭৫ বছরের জীবন। তার মধ্যে সাম্পান চালিয়ে কেটেছে পাঁচ যুগ, অর্থাৎ ৬০ বছর। ষাটের দশকে মাত্র ১৫ বছর বয়সে সংসারের হাল ধরতে সাম্পানের বৈঠা হাতে তুলে নিয়েছিলেন তিনি। তবে সময়ের স্রোতে সাম্পানে একটা পরিবর্তন এসেছে, আগে মাঝিরা সাম্পান বাইতেন হাতে, পাল উড়িয়ে হালিশ মেরে বাঁশখালী-মহেশখালী চলে যেতেন মাঝিরা। এখন সাম্পানে ইঞ্জিন লেগেছে। তবে মাঝিদের বিচরণ এখন সীমিত কর্ণফুলী নদীতেই, বড়জোর তাদের গন্তব্য সদরঘাট আর চাক্তাই। এখন আর কেউ সাম্পানে চড়ে বাঁশখালী-মহেশখালী বা কক্সবাজার যান না; কারণ এখন সড়ক যোগাযোগ সহজ, আছে বাস-ট্রেন।
ফিরিঙ্গিবাজার অভয়মিত্র ঘাট ও পুরোনো ব্রিজঘাটে যাত্রীদের খেয়া পারাপার করেন সৈয়দ মাঝি। কর্ণফুলী উপজেলার আজিমপাড়া গ্রামে তার জন্ম। মাঝি বলেন, ‘মাত্র পনেরো বছর বয়সে এই ঘাটে সাম্পান চালাতে এসেছিলাম। চোখের পলকে ৬০
বছর কেটে গেছে। এর মধ্যে সংসার হয়েছে। তিন সন্তান বড় হলো।’ শুরুর দিকের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি হস্তচালিত সাম্পানে যাত্রী পারাপার করতাম। ৫০ পয়সায় যাত্রী পারাপার শুরু করেছিলাম, এখন ১৫ টাকা করে ভাড়া হয়েছে। তখন কর্ণফুলী নদীতে সেতু না থাকায় প্রায় মানুষ সাম্পানে চলাচল করতেন। এখন সেই চিত্র নেই।’
সৈয়দ মাঝি বলেন, ‘ছেলে এখন চাকরি করে, মেয়েরা শ্বশুরবাড়ি। তারা সবাই আমাকে এই পেশা ছেড়ে দিতে বলে। কিন্তু সত্য হচ্ছে, ঘরে থাকলে আমি সুস্থ থাকব না, অসুস্থ হয়ে পড়ব। সাম্পান চালিয়েই সন্তানদের বড় করেছি। সহায়-সম্পদ বলতে যা হয়েছে, সবই এই সাম্পানের কল্যাণে হয়েছে। তাই এ পেশার প্রতি বড় মায়া হয়।’
৩০ বছর পর রহিমের : খোয়াজনগর গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ রহিমের বয়স ৫০ ছুঁইছুই। তিনিও সৈয়দ মাঝির মতো ১৫ বছর বয়েসে সাম্পান বাওয়া শুরু করেন। ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে সাস্পান চালান তিনি। অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে তার মনে পড়ে যায় ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়ের কথা। তিনি বলেন, ‘তখন আমি অল্পবয়সী সাস্পান মাঝি। ৩০ এপ্রিল ভোরের আলো যখন ফুটল তখন ঝড় থেমে যায়। পাশের গ্রাম ডাঙারচরে তখন হাজারো বাড়িঘর ভেসে গিয়েছিল। অসংখ্য মানুষ মারা যান। আমি সাম্পান নিয়ে গিয়ে আহতদের উদ্ধার করেছিলাম।’
রহিম মাঝির চার সন্তান। তিন কন্যা আর এক পুত্র। তাদের মধ্যে এক মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। অন্যজন মাধ্যমিকে পড়াশোনা করে। বাকি দুজন কারখানায় চাকরি করে।
৩০ বছর পর জীবন–খাতায় বড়ই গরমিল দেখছেন রহিম মাঝি। তিনি বলেন, ‘এই ঘাটে কত যাত্রীকে পারাপার করি। তাদের মধ্যে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ আছে। কেউ কেউ তো অনেক বছর ধরে নদী পারাপার হন। অনেকের জীবন চোখের সামনে বদলে গেল, কিন্তু আমার তো সেই পোকামাকড়ের ঘরবসতি। ভাগ্যের চাকা আমার ঘোরেনি। এখনো ‘দিনে এনে দিনে খাই’–কবে এ নিয়ে দুঃখ করি না।’
১২ বছর বয়েসে হাতে বৈঠা তুলে দেন পিতা : পিতা জাফর আহমেদের সাথে মাত্র আট বছর বয়েসে সাম্পানে এসেছিলেন মাঝি মোহাম্মদ ইসলাম (৬০)। চার বছর পিতার সাথে থেকে রপ্ত করে নেন সাম্পান বাওয়ার কৌশল। ১২ বছর বয়সে হাতে বৈঠা তুলে দেন পিতা। এরপর কর্ণফুলী নদীতে কেটেছে তার চার যগ। এখনও যে এই পেশায় টিকে আছেন এতেই তার শান্তি।
বললাম, ‘জীবন তো প্রায় সাম্পানেই কাটিয়ে দিলেন, অবসর নেবেন কখন?’ ইসলাম মাঝি বলেন, ‘গরিবের আবার অবসর কী? যতদিন গায়ে শক্তি থাকবে ততদিন কাজ করে যেতে হবে, নয়তো পরিবার চালাব কিভাবে?’
কথা হয় নাছির মাঝি, খায়ের মাঝি, নুর আলম মাঝি ও মহিউদ্দিন মাঝির স্ঙগে। তাদের জীবনের গল্পও অনেকটা একই রকম। তাদের জীবনটা সাম্পানের মতোই সরল, বড় কোন দুঃখ নেই, নেই বড় কোন চাহিদা।
- বিষয় :
- কর্ণফুলী
