ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

১৮০ বছরের পুরোনো বাতিঘর ঘিরে আনন্দ

১৮০ বছরের পুরোনো  বাতিঘর ঘিরে আনন্দ
×

ছুটির দিনে বাতিঘর সংলগ্ন সৈকতে পর্যটকদের ভিড় বাড়ে, গত শুক্রবার তোলা সমকাল

 পেকুয়া (কক্সবাজার) সংবাদদাতা

প্রকাশ: ২১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:২৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়া। আয়তন প্রায় ২১৬ বর্গকিলোমিটার। দ্বীপের পশ্চিমাংশে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত রয়েছে, যা পর্যটকদের মুগ্ধ করে। আরও আছে ১৮০ বছরের পুরোনো একটি বাতিঘর। সেই বাতিঘর ঘিরে গড়ে উঠেছে নয়নাভিরাম পর্যটনকেন্দ্র। আর তাতে দূরদূরান্তের পর্যটকদের ভিড় বাড়ছে। এতে ব্যবসায় আগ্রহ বাড়ছে দ্বীপবাসীর, স্থানীয়দের জন্য আয়ের নতুন খাত তৈরি হয়েছে, অনেকের কর্মসংস্থানও হয়েছে। 

স্থানীয়  লোকজনের মতে, চতুর্দশ শতাব্দীর শেষভাগে বঙ্গোপসাগরের বুকে কুতুবদিয়া দ্বীপের উদ্ভব ঘটে এবং পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষদিকে এখানে মানুষের বসবাস শুরু হয়। চারদিকে বঙ্গোপসাগর পরিবেষ্টিত এই দ্বীপে এখন যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম ইঞ্জিনচালিত নৌযান। পেকুয়া উপজেলার মগনামা ঘাট থেকে কুতুবদিয়ায় পৌঁছাতে পাড়ি দিতে হয় প্রায় ৩-৪ কিলোমিটার দীর্ঘ কুতুবদিয়া চ্যানেল। ইঞ্জিনচালিত নৌকায় সময় লাগে আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০ মিনিট। আর মাত্র ৭-৮ মিনিটের মধ্যে স্পিডবোটে এপার থেকে ওপার যাওয়া যায়। 
স্থানীয় লোকজন বলেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে কুতুবদিয়া দ্বীপ দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারত। কিন্তু দীর্ঘদিনের অবহেলা ও অযত্নে এই দ্বীপের পর্যটন সম্ভাবনা অনেকটাই উপেক্ষিত রয়ে গেছে। অথচ সহজ যোগাযোগব্যবস্থা, দীর্ঘ বালুকাবেলা, সারি সারি ঝাউবাগান, মৌসুমে সৈকতে লাল কাঁকড়ার বিচরণ এবং বেড়িবাঁধে সারিবদ্ধ জেলেদের নৌকা– সব মিলিয়ে কুতুবদিয়ার সৌন্দর্য কোনো অংশেই কক্সবাজারের চেয়ে কম নয়। এ ছাড়া দ্বীপটিতে অবস্থিত দেশের সবচেয়ে বড় বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র, যা বর্তমানে অচল হলেও পর্যটকদের জন্য এক বিস্ময়কর দর্শনীয় স্থাপনা হিসেবে স্বগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে।

কুতুবদিয়ার আরেকটি উল্লেখযোগ্য স্থাপনা হলো সমুদ্র-বাতিঘর। বঙ্গোপসাগরে চলাচলকারী জাহাজকে দিকনির্দেশনা দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই বাতিঘরটি দেশের একমাত্র দ্বীপভিত্তিক বাতিঘর। এর নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৮২২ সালে এবং সম্পন্ন হয় ১৮৪৬ সালে। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এই বাতিঘরটি একাধিকবার ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পরবর্তী সময়ে নতুন কাঠামোতে পুনর্নির্মাণ করা হয়। আজও এই বাতিঘর দেখতে প্রতিদিন বহু মানুষ কুতুবদিয়ায় আসেন। তবে পর্যাপ্ত পর্যটন অবকাঠামোর অভাবে দীর্ঘদিন কুতুবদিয়া পর্যটন মানচিত্রে তেমনভাবে স্থান করে নিতে পারেনি। একসময় বিদ্যুৎ না থাকাও ছিল পর্যটন বিকাশের বড় অন্তরায়। বর্তমানে বিদ্যুৎ সংযোগ থাকলেও সরকারি পর্যায়ে পরিকল্পিত উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনার অভাবে এখনও সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্রে রূপ নিতে পারেনি দ্বীপটি।
তবে দক্ষিণ ধুরুং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন আল আজাদের উদ্যোগে কুতুবদিয়া বাতিঘরকে ঘিরে গড়ে তোলা হয়েছে নতুন পর্যটন কেন্দ্র। এখানে স্থাপন করা হয়েছে রেস্তোরাঁ, জুসবার, দোলনা, সূর্যাস্ত উপভোগের জন্য চেয়ার, হ্যামকসহ নানা রঙিন সাজসজ্জা। এসব উদ্যোগ দ্বীপটির পর্যটন খাতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছে।

গত ১২ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় দক্ষিণ ধুরুং বাতিঘর পয়েন্টে উৎসবমুখর পরিবেশে উদ্বোধন হয় কুতুবদিয়ার নতুন পর্যটন স্পটের। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান প্রধান অতিথি ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ক্যথোয়াইপ্রু মারমা। বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন কুতুবদিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহবুবুল হক, উপজেলা প্রকৌশলী আবুসউদ্দিন, প্রধান শিক্ষক মোর্শেদুল আলম, প্রকৌশলী মো. ফরহাদ মিয়া ও পর্যটন স্পটটির প্রধান উদ্যেক্তা দক্ষিণ ধুরুং ইউপি চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন আল আজাদ। 

দক্ষিণ ধুরুং ইউপি চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন আল আজাদ বলেন, ‘আমরা বছরের পর বছর ধরে ভয়াবহ বাঁধ ভাঙনের শিকার হচ্ছি। দ্বীপ রক্ষায় দীর্ঘদিন সংগ্রাম করলেও এখন পর্যন্ত টেকসই বাঁধ নির্মাণ সম্ভব হয়নি। কুতুবদিয়া অত্যন্ত সম্ভাবনাময় পর্যটন এলাকা হলেও দীর্ঘদিন ধরে বিনোদন বঞ্চিত। দ্বীপটির পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে এবং স্থানীয় মানুষের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটি রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন বিনোদনমূলক ব্যবস্থার সূচনা করা হয়েছে। এতে কুতুবদিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি পর্যটন শিল্প বিকাশে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।’
কুতুবদিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ক্যাথোয়াইপ্রু মারমা বলেন, ‘দ্বীপের পর্যটন শিল্পকে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়নের জন্য পর্যটন মন্ত্রণালয়ের কাছে বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা ও চাহিদা প্রেরণ করা হবে। এরই অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসক কুতুবদিয়া পরিদর্শন করেছেন।’
কুতুবদিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহবুবুল হক বলেন, ‘পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সবসময় তৎপর রয়েছে। আমরা আশা করছি, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কুতুবদিয়া দেশের অন্যতম বৃহৎ পর্যটনমুখী এলাকায় পরিণত হবে।’

এদিকে কুতুবদিয়ায় আসা পর্যটকরাও দ্বীপটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশে মুগ্ধ। চট্টগ্রাম থেকে আসা রাশেদ মাহমুদ বলেন, ‘কুতুবদিয়ার প্রকৃতি এখনও অনেকটাই অক্ষত। এখানে সাগর, নীরবতা আর মানুষের আন্তরিকতা মন ছুঁয়ে গেছে। যদি যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বিনোদনের সুযোগ আরও বাড়ানো যায়, তাহলে এটি খুব দ্রুত জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হবে।’
ঢাকা থেকে আসা তানিয়া আক্তার বলেন, ‘ভিড় ও কোলাহলমুক্ত একটি শান্ত জায়গা খুঁজছিলাম। কুতুবদিয়া আমাকে সেই প্রশান্তি দিয়েছে। স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা রেস্তোরাঁ ও বিনোদনের উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়।’
স্থানীয়দের মতে, পরিকল্পিতভাবে পর্যটন খাতের সম্প্রসারণ ঘটানো গেলে স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হবে এবং দ্বীপবাসীর জীবনযাত্রায় আসতে পারে নতুন মাত্রা।’

আরও পড়ুন

×