ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সরেজমিন : চট্টগ্রাম-১০ (পাহাড়তলী-হালিশহর-ডবলমুরিং)

চার সমস্যায় নাকাল মানুষ

কিশোর গ্যাং- পানি সংকট- বেহাল রাস্তা- পাহাড় কাটা

চার সমস্যায় নাকাল মানুষ
×

 আহমেদ কুতুব

প্রকাশ: ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:১০

| প্রিন্ট সংস্করণ

শুক্রবার সকাল ১০টা। নগরীর ডিটি রোডের অলংকার মোড়। অলংকারের একপাশে হালিশহর ও অন্যদিকে পাহাড়তলী। কথা হয় অলংকার শপিং কমপ্লেক্সের নিচ তলার ব্যবসায়ী রিয়াজুল আলমের সঙ্গে। ফোনে ইরান-আমেরিকার উত্তেজনার ভিডিও দেখছিলেন। তা বন্ধ করে বলেন, ‘ব্যবসায় এক বছর ধরে লাল বাতি জ্বলছে। দোকান ভাড়া, কর্মচারীর বেতন, বিদ্যুৎ বিল তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।’ কেন জানতে চাইলে বলেন, ‘মানুষের হাতে টাকা নেই। তাই বেঁচাকেনা নেই।’ সেখান থেকে এক কিলোমিটার দূরে হালিশহরের সাগরিকা স্টেডিয়াম সড়কের রয়েছে কাস্টমস কলোনি। কলোনির মুখে আজিজ ভবনের মালিক আজিজুর রহমানের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘চীনের দুঃখ হোয়াংহো নদী আর হালিশহরের বাসিন্দা হিসেবে আমাদের দুঃখ ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট ও পানির সমস্যা। কারণ বছরের বর্ষাকালে জলাবদ্ধতায় ভোগতে হয়। আর গ্রীষ্মকালে ওয়াসার পানির সংকট চরম আকার ধারণ করে। লবণাক্ত পানি দিয়ে গোসল ও খেতে বাধ্য হই।’ সামনে নির্বাচন, নতুন এমপি প্রার্থীদের কাছে এসব সমাধানের দাবি করছেন না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গত ১৬-১৭ বছর আওয়ামী লীগের এমপি, মন্ত্রী, কাউন্সিলররা এবার করে দেব, দিচ্ছি বলে শুধুই প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছেন। এখন যারা ভোট চাইতে আসছেন তারাও এবার সমস্যা সমাধান করে দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। আদতে ভোট শেষ হওয়ার পর আদৌ কিছু হবে বলে মনে হয় না।’

সরেজমিন শুক্রবার চট্টগ্রাম-১০ (পাহাড়তলী-হালিশহর) এলাকার সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে এ জনদুর্ভোগের চিত্র পাওয়া যায়। এ সংসদীয় আসনের হালিশহরের মানুষের প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতা ও ভাঙা রাস্তাঘাট হলেও পাহাড়তলী এলাকার প্রধান সমস্যা সম্পূর্ণ ভিন্ন। পাহাড়তলী এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত, পাহাড় কাটা ও তাতে অবৈধ বসতি প্রধান সমস্যা। দিন দিন পাহাড়ে অবৈধ বসতি বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা পরিবেশগত ঝুঁকি বাগাচ্ছে। তৈরি করছে সামাজিক অস্থিরতা। বৃহত্তর পাহাড়তলীতে এক ডজনের বেশি ছোট-বড় কিশোর গ্যাং সক্রিয় থাকায় তাদের উৎপাতে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ। কিছুদিন পরপরই ঘটছে খুন-খারাবির ঘটনা। 

শুক্রবার সাড়ে ১১টার দিকে পাহাড়তলীর নিউ শহীদ লেন কলোনি মুখে কথা হয় বাসিন্দা আবু সৈয়দের সঙ্গে। তিনি জানান, পাহাড়তলী এলাকার প্রধান সমস্যা কিশোর গ্যাংয়ের অতিমাত্রায় উৎপাত। সেই সঙ্গে দিন দিন চাঁদাবাজি বাড়ছে। তাদের অত্যাচারে মানুষ অতিষ্ঠ। ভয়ে কেউ কিছু বলতে পারছে না। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে মারধর করা হয়। গত এক বছরে রাতে ছিনতাইয়ের ঘটনাও অনেক বেড়ে গেছে। শহীদ লেন থেকে এক কিলোমিটার সামনে ওয়ারল্যাস কলোনি এলাকায় কথা হয় ব্রিক ফিল্ড এলাকার বাসিন্দা নাজমুল হকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ব্রিক ফিল্ড এলাকায় সব পাহাড়। এখানে আগে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর, নেতারা পাহাড় কেটে বিক্রি করতেন। এখন বিএনপি নামধারীসহ নানা দলের মানুষ পাহাড় কেটে বিক্রি ও ঘর বাড়ি করছেন। আগে একদল পাহাড় কেটে বসতি করেছে। এখন আরেকদল পাহাড় কাটছে। রাত হতেই মাদক বিক্রি ও সেবন চলছে। পুলিশ পাহাড়ি এলাকায় যায় না।’ সরাইপাড়া এলাকার বাসিন্দা টিপু সুলতান বলেন, ‘সরাইপাড়া ও আশপাশের এলাকায় মাদকের বিস্তার বেড়েছে। রেলওয়ের সরকারি ও খাসজমি দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করছেন নতুন নতুন নেতারা।’ 

চট্টগ্রাম-১০ আসনে বিএনপির মনোনীত এমপি প্রার্থী সাঈদ আল নোমান বলেন, ‘বিএনপি গণমানুষের দল। আমার বাবা সবসময় মানুষের কল্যাণে রাজনীতি করেছেন। আমিও নির্বাচিত হলে 
পাহাড়তলী-হালিশহরের প্রতিটি সমস্যা সমাধান করবো। পানি সংকট, রাস্তাঘাটের বেহাল অবস্থা থাকবে না। পাহাড় কাটার বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে। পরিবেশ রক্ষায় কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
চট্টগ্রাম-১০ আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী অধ্যক্ষ শামসুজ্জামান হেলালী বলেন, জামায়াত বিগত সময়ে  পাহাড়তলী-হালিশহরের মানুষের সবসময় পাশে ছিল। গত দেড় বছর এলাকায় এলাকায় মানুষের সমস্যা সমাধানে কাজ করে গেছি। আমি নির্বাচিত হলে মাদক, সন্ত্রাস, কিশোর গ্যাং, পাহাড় কাটার বিরুধে কঠোর অবস্থান নেবো। মানুষকে সাথে নিয়ে সকল সমস্যা সমাধান করা হবে। আমি যখন কাউন্সিলর ছিলাম তখনও মানুষকে সাথে নিয়ে মানুষের জন্য কাজ করে গেছি। 

জানা গেছে, চট্টগ্রামের হালিশহর এলাকার প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট ও পানিবাহিত রোগ, রাস্তাঘাটের বেহাল দশা এবং উপকূলীয় হওয়ায় ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি; ছাড়াও অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাবও বড় সমস্যা। পানীয় জলের সংকট এতোটাই তীব্র হয়, ওয়াসার পানির অপ্রতুলতা ও রেশনিং করে জীবন কাটাতে হয় কয়েক লাখ মানুষকে। বিশেষত উঁচু এলাকায় এবং অপরিষ্কার পানির কারণে জন্ডিস, টাইফয়েড ও হেপাটাইটিসের মতো পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাবও ঘটেছে কয়েকবার। 
পাহাড়তলীর বাসিন্দা পরিবেশকর্মী শফিকুল ইসলাম খান জানান, উত্তর পাহাড়তলী ৮ দশমিক ৬ একরের ৩টি পাহাড়ের ৮০ ভাগই এখন কেটে সাবাড় করেন সাবেক কাউন্সিলর জসিম। তিনিসহ তার মানুষ দিনের পর দিন পাহাড় কেটে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতিসাধন করেছেন। আগামীতে নতুন সরকার আসলে পরিবেশ ও পাহাড় রক্ষা করবেন বলে প্রত্যাশা। 

আরও পড়ুন

×