ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

গবেষণায় নতুন উচ্চতায় চবি

গবেষণায় নতুন উচ্চতায় চবি
×

 মেহেদী হাসান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২৬ | ০৭:২৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

গবেষণার বৈশ্বিক মানদণ্ডে নতুন উচ্চতা স্পর্শ করেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি)। ২০২৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মোট ৬১৫টি গবেষণা প্রবন্ধ আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ‘স্কোপাস-ইনডেক্সড’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এটি চবির ইতিহাসে এক বছরে সর্বোচ্চ সংখ্যক প্রকাশনার রেকর্ড। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা সংস্থা ‘অ্যালপার ডগার (এডি) সায়েন্টিফিক ইনডেক্স’-এ প্রকাশিত র‍্যাঙ্কিংয়ে বিশ্বসেরা গবেষকদের তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন চবির ১৭৪ জন শিক্ষক।

​এক দশকে উল্লম্ফন
পরিসংখ্যান বলছে, চবির গবেষণার গ্রাফ গত এক দশকে অনেক উঁচুতে উঠেছে। ২০১০ সালে যেখানে স্কোপাস-নিবন্ধিত প্রকাশনা ছিল মাত্র ৯৪টি, ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬১৫-তে। ২০১৯ সালেও এই সংখ্যা ছিল মাত্র ২১১। চবি রিসার্চ অ্যান্ড হায়ার স্টাডি সোসাইটির (সিইউআরএইচএস) তথ্যমতে, এ বছর ‘দ্য ল্যানসেট’ ও ‘নেচার কমিউনিকেশন্স’-এর মতো বিশ্বখ্যাত জার্নালেও চবির গবেষকদের প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তিনটির অধিক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০ জন শিক্ষক শীর্ষ তালিকায় স্থান পেয়েছেন।

​গবেষণায় শীর্ষে যারা
এডি সায়েন্টিফিক ইনডেক্স-২০২৪-এর বৈশ্বিক তালিকায় বাংলাদেশের ২০৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ হাজার ৩৩ জন গবেষক স্থান পেয়েছেন। এর মধ্যে চবির ১৭৪ জন শিক্ষক রয়েছেন। কৃষি, প্রকৌশল ও চিকিৎসাসহ ১২টি ক্যাটেগরিতে এই তালিকা করা হয়েছিল। সেখানে জায়গা করে নিয়েছিলেন ড. মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন (সিএসই), ড. এস এম আবু কাউছার (রসায়ন), ড. মো. আতিয়ার রহমান (প্রাণরসায়ন), ড. ননী গোপাল দাশ, ড. এসএম শরীফুজ্জামান ও ড. শাহাদাত হোসেন (মেরিন সায়েন্স), ড. মো. আবুল কাশেম (মৃত্তিকা বিজ্ঞান), ড. মো. মোশাররফ হোসেন (ফরেস্ট্রি), ড. রেজাউল আজিম (ইইই) এবং ড. এম জামাল উদ্দিন আহমেদ (রসায়ন)।
তবে সম্প্রতি প্রকাশিত তালিকায় প্রকাশনার ভিত্তিতে শীর্ষ গবেষকদের তালিকায় যৌথভাবে প্রথম হয়েছেন কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ড. মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন এবং ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের ড. মো. ইদ্রিস আলম। তালিকায় রসায়ন বিভাগের ড. এস এম আবু কাউসার দ্বিতীয় এবং ইইই বিভাগের ড. মোহাম্মদ আব্দুল আলিম তৃতীয় অবস্থানে রয়েছেন।
বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে রসায়ন, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই), ফার্মেসি, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি, বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি এবং ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস ইনস্টিটিউট গবেষণায় সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রয়েছে। অনুষদগুলোর মধ্যে এককভাবে সর্বাধিক এবং উচ্চমানের (কিউ১) গবেষণা প্রকাশ করে শীর্ষে রয়েছে জীববিজ্ঞান অনুষদ।

গবেষণায় শীর্ষে থাকলেও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন গবেষকরা। তালিকায় যৌথভাবে শীর্ষে থাকা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ড. মো. ইদ্রিস আলম সমকালকে বলেন, ‘আমি প্রথম ১০ জনের মধ্যে আছি, সেটা মূলত ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা ও ইচ্ছার কারণে। আমাদের মাঠ পর্যায়ে দুর্যোগ নিয়ে কাজ করতে হয়, যা দেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা বা ফান্ডিং সুবিধা এখনও অনেক কম।’
​তিনি আরও যোগ করেন, ‘শিক্ষকতা বা প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়ে গবেষণায় মগ্ন থাকার মতো পরিবেশ এখানে নেই। গবেষকদের প্রাপ্য সম্মানও জোটে না অনেক সময়। ৯০০ শিক্ষকের মধ্যে মাত্র হাতেগোনা কয়েকজন নিয়মিত প্রকাশনা করছেন। যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে প্রকাশনা বাধ্যতামূলক করার নিয়ম থাকত, তবে এই সংখ্যা আরও বাড়ত।’
​বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গবেষণার জন্য সরাসরি অর্থায়ন বাড়িয়েছে কর্তৃপক্ষ। প্রকাশিত গবেষণার ৫৫ শতাংশেই অর্থায়ন করেছে চবি গবেষণা ও প্রকাশনা অধিদপ্তর। আগে একটি প্রকল্পের বাজেট ৫০ হাজার টাকা থাকলেও এখন তা ক্ষেত্রভেদে আড়াই থেকে ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত করা হয়েছে। তবে গবেষকদের দাবি, নামকরা জার্নালে প্রকাশের জন্য ‘আর্টিকেল প্রসেসিং চার্জ’ পরিশোধে বিশ্ববিদ্যালয় সরাসরি এগিয়ে এলে প্রকাশনার সংখ্যা বছরে হাজারে পৌঁছানো সম্ভব।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার বলেন, ‘চবিকে কেবল পাঠদানের কেন্দ্র নয়, আমরা একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। রেকর্ড পরিমাণ এই প্রকাশনা প্রমাণ করে আমাদের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিশ্বমানের মেধার স্বাক্ষর রাখছেন।’
​বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন বলেন, ‘আমরা গবেষণায় অনুদান বৃদ্ধি এবং নিয়োগ-পদোন্নতির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন জার্নালকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছি। গবেষণায় অনুদান বৃদ্ধি, প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ সৃষ্টি এবং গবেষকদের জন্য পুরস্কার ও সম্মাননা চালু করার মাধ্যমে একটি ইতিবাচক গবেষণা সংস্কৃতি গড়ে তোলা হচ্ছে। ভালো মানের গবেষণায় যুক্ত শিক্ষকদের প্রশাসনিক দায়িত্বেও অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।’ 
তিনি আরও বলেন, গবেষণায় পিছিয়ে থাকা ‘কলা, মানববিদ্যা ও আইন অনুষদের জন্য আগামী বছর থেকে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার ব্যবস্থা করা হবে।’

উল্লেখ্য, বর্তমানে ৯টি অনুষদ ও ৪৮টি বিভাগের সমন্বয়ে চবি পরিচালিত হচ্ছে। প্রায় ২৬ হাজার ৬৭৮ জন শিক্ষার্থীর পাঠদানে নিয়োজিত রয়েছেন ১ হাজার ১০ জন শিক্ষক। ২৩০০ একরের এই পাহাড়ি ক্যাম্পাসে ৫টি গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে।

 

আরও পড়ুন

×