ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নগরে এক বছরে মশার দ্বিগুণ লার্ভা

নগরে এক বছরে মশার দ্বিগুণ লার্ভা
×

 শৈবাল আচার্য্য, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২৬ | ০৭:৩৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

মশার কামড়ে অতিষ্ঠ নগরবাসী। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) ৪১ ওয়ার্ডেই চলছে মশার উৎপাত। পবিত্র রমজান মাসে মশার জ্বালায় মানুষ স্বস্তিতে ইফতারি ও সাহ্‌রি খেতে পারছেন না। 
কাগজেকলমে সিটি করপোরেশন মশা মারতে কোটি টাকা খরচ করেছে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, বাস্তবে দৃশ্যমান নয় সংস্থাটির মশক নিধন কার্যক্রম। গত তিন মাসে মশা মারতে বেশির ভাগ এলাকায় দেখা যায়নি চসিকের লোকজনকে; যার প্রমাণ মিলেছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) পরিচালিত এক গবেষণায়ও। গবেষণার তথ্য মতে, করপোরেশনের তদারকি না থাকায় দ্বিগুণ হয়েছে মশার লার্ভা। চট্টগ্রাম শহরে ২০২৪ সালে লার্ভার ঘনত্ব ছিল মাত্র ৩৬ শতাংশ। অথচ সেটি বছরের ব্যবধানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৫ দশমিক ২৯ শতাংশে; যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার (২০ শতাংশ) চেয়ে চারগুণ বেশি। 

সিভিল সার্জন কার্যালয় পরিচালিত জরিপে চট্টগ্রাম নগরের ২৫ এলাকাকে হট স্পট বলা হয়েছে। পাঁচটি এলাকাকে অতিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আক্রান্ত মোট রোগীর প্রায় ৬০ শতাংশই এসব এলাকার বাসিন্দা।
মশা নিয়ে একাধিক গবেষণায় নেতৃত্ব দেওয়া মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এএসএম লুৎফুল কবির শিমুল বলেন, ‘অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে গত দেড় বছরে চট্টগ্রাম শহর এলাকায় ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ বহুগুণ বেড়েছে। দিন ও রাতের বেশির ভাগ সময় মশার উৎপাতের কথা বলছেন আক্রান্ত রোগী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা। তাই ডেঙ্গুর ভয়াবহতা থেকে নগরবাসীকে রক্ষা করতে মশা মারার বিকল্প নেই। শিশু ও বয়স্কদের দিকে বাড়তি নজর রাখতে হবে। কেননা শিশুর ডেঙ্গু হলে তা কম সময়ের মধ্যে শরীরকে কাবু করে ফেলে। কোন এলাকায় কোন মশার উপদ্রব বেশি ও কোন মশা কোন ওষুধে মরবে তা শনাক্ত করে কার্যকর ওষুধ ছিটাতে হবে।’ 

১৬ মাসে শিশুসহ প্রাণ গেল ৪৮ জনের
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের গত ১৬ মাসের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ৬৮ জন। ফেব্রুয়ারির প্রথম ২৫ দিনে আক্রান্ত হয়েছেন ৮৮ জন, মৃত্যু হয়েছে একজনের। 
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১২ মাসে ডেঙ্গুতে প্রাণ গেছে শিশুসহ ২৭ জনের। একই সময়ে আক্রান্ত হয়েছের ৪ হাজার ৮৬৪ জন। মারা যাওয়াদের মধ্যে সর্বোচ্চ ১৫ জন পুরুষ, সাতজন মহিলা ও পাঁচজন শিশু। মোট আক্রান্তের মধ্যে ২ হাজার ৫২৯ জন পুরুষ, ১ হাজার ৪৩৯ জন নারী এবং ৮৯৬ জন শিশু। 
২০২৪ সালের নভেম্বরে ডেঙ্গুতে প্রাণ গেছে ১৬ জনের, আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ২৮ জন। ডিসেম্বরে আক্রান্ত হয়েছিল ৩৬০ জন, প্রাণ গেছে চারজনের। 

বছরের ব্যবধানে বেড়েছে মশার ঘনত্ব
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সর্বশেষ পরিচালিত এক গবেষণায় মশার অত্যাচার বাড়ার তথ্যপ্রমাণ মিলেছে। সর্বোচ্চ ১৩৪ দশমিক ৬২ শতাংশ মশার অস্তিত্ব মিলেছে আগ্রাবাদে। এ ছাড়াও পাহাড়তলীতে ১১০ শতাংশ, হালিশহরে ৬৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ, চট্টেশ্বরী এলাকায় ৪৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ, ও আর নিজাম এলাকায় ৪২ দশমিক ৮৬ শতাংশ এবং ঝাউতলা এলাকায় ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। এসব মান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত ঝুঁকিপূর্ণ সীমার চেয়ে বহুগুণ বেশি বলে মনে করছেন গবেষণা সংশ্লিষ্টরা। এরপরও এসব এলাকায়ও মশক নিধন কার্যক্রম চলছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। 

২৫ এলাকা ডেঙ্গুর ‘হটস্পট’
মশার কামড় থেকে নগরবাসীকে রক্ষা করতে পারছে না চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। চট্টগ্রাম নগরের ২৫ এলাকার বাসিন্দারা সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের পরিচালিত জরিপে। জরিপে এসব এলাকাকে ডেঙ্গুর অন্যতম ‘হটস্পট’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এরমধ্যে পাঁচটি এলাকাকে অতিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আক্রান্ত রোগীর প্রায় ৬০ শতাংশই এসব এলাকার বাসিন্দা। এরমধ্যে বেশ কয়েকটি আবাসিক এলাকাও রয়েছে। এ ব্যাপারে বিস্তারিত উল্লেখ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে চিঠি দিয়েছে সংস্থাটি। জরিপের তথ্যমতে, ২৫টি এলাকা হলো–বন্দর, কোতোয়ালি, কেপিজেড, হালিশহর, সদরঘাট, বাকলিয়া, বায়েজিদ, পাহাড়তলী, ডবলমুরিং, খুলশী, পাঁচলাইশ, আকবর শাহ, চকবাজার, চান্দগাঁও, পতেঙ্গা, আগ্রাবাদ, পাথরঘাটা, লালখান বাজার, আন্দরকিল্লা, কাট্টলী, দেওয়ানহাট, দুই নম্বর গেট, মুরাদপুর, চন্দনপুরা এবং মোহাম্মদপুর। এরমধ্যে বন্দর, কোতোয়ালি, কেপিজেড, হালিশহর এবং সদরঘাট এলাকাকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। 

চসিকের কোটি টাকা খরচ
মশা মারতে সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয় করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। চলতি অর্থবছরে এই খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে আরও ৯ কোটি টাকা। তবে কাগজে-কলমে এত টাকা খরচ হলেও বাস্তবে মশক নিধন কার্যক্রম দৃশ্যমান না হওয়ার অভিযোগ বেশির ভাগ বাসিন্দার। 

মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ 
চট্টগ্রাম অঞ্চলে ডেঙ্গু, জিকা ও চিকুনগুনিয়া সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র নিরূপণ এবং ভবিষ্যৎ জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর কৌশল নিয়ে সর্বশেষ একটি গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। গবেষণায় এই অঞ্চলে মশাবাহিত রোগ দ্রুত বিস্তারমান এবং এটি নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যায়, এই রোগ কেবল স্বল্পমেয়াদি জ্বরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং দীর্ঘস্থায়ী অস্থিসন্ধির ব্যথা, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে উঠছে। 
সিটি করপোরেশন এলাকার মধ্যে কোতোয়ালি, বাকলিয়া, ডবলমুরিং, আগ্রাবাদ, চকবাজার, হালিশহর ও পাঁচলাইশ এলাকায় সংক্রমণের হার তুলনামূলক বেশি। উপজেলা পর্যায়ে সীতাকুণ্ড, বোয়ালখালী ও আনোয়ারা এলাকায় বেশি সংক্রমণ মিলেছে। গত বছরের জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে পরিচালিত এই গবেষণায় মশাবাহিত রোগে আক্রান্ত এক হাজার ৭৯৭ জন রোগীর ক্লিনিক্যাল ও বায়োলজিক্যাল তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।

বাদুরতলা আরাকান হাউজিং সোসাইটির বাসিন্দা  সংগঠক যিকরু হাবিবীল ওয়াহেদ বলেন, ‘মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ মানুষ। সাহ্‌রি ও ইফতারি খেতে বসলে মশা মারতে মারতে কাহিল অবস্থা হয়।’ 
পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকার এক নম্বর সড়কের চামেলি ভবনের বাসিন্দা রোখসানা আক্তার বলেন, ‘মশার অত্যাচার এত বেশি বেড়েছে যে দিনের বেলায়ও ঘরে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। মশারি ছাড়া বাচ্চারা বসতেও পারে না। এলাকার চারপাশে দিনের পর দিন পানি জমে থাকছে। আবাসিক এলাকার এমন করুণ অবস্থা মেনে নেওয়া যায় না।’ 
মোহাম্মদপুর খতিবের হাটের বাসিন্দা পপি বেগম বলেন, ‘গত তিন মাসে মশা মারতে সিটি করপোরেশনের কাউকে ওষুধ ছিটাতে দেখিনি।’ 

চসিক বলছে ভিন্ন কথা 
চসিকের ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. সরফুল ইসলাম (মাহি) সমকালকে বলেন, ‘মশক নিধন কার্যক্রম চলমান আছে। তবে সংসদ নির্বাচনের কারণে বাড়তি জায়গায় ওষুধ ছিটাতে হওয়ায় স্বাভাবিক কাজে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটেছে। তবে সেটি এখন কাটিয়ে উঠেছি।’ 
অনেক এলাকায় মশক নিধন কার্ক্রম নেই–এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে হয়তো এমনটি হচ্ছে। তিন ধরনের ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে মশার বিস্তার রোধ করতে কাজ করছি আমরা।’ 

উদ্বিগ্ন স্বাস্থ্য প্রশাসন 
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘চট্টগ্রামে গত ১৬ মাসে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ায় রেকর্ড সংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। আমরা শুরু থেকেই মশা মারার ওপর তাগিদ দিয়ে আসছি। তারপরও মশা মারতে কাউকে দেখা না যাওয়ার অভিযোগ বেশির ভাগ এলাকার বাসিন্দাদের। বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন মহলকেও জানিয়েছি।’ 
ক্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘‘মশা নিয়ন্ত্রণে চসিক ব্যর্থ। তাদের ‘ক্লিন অ্যান্ড গ্রিন সিটি’ স্লোগান কেবল মুখেই, বাস্তবে প্রতিফলন নেই।’’ 

আরও পড়ুন

×